পুকুরে ফেলা ডিম থেকে মোরগ ছানা! 'চুচু'র পছন্দের কেক-চাউমিন-পোলাওয়ে জন্মদিন পালন
Jaba Sen
বাড়ির পাশের মজা পুকুরে ভাসছিল পাঁচটি ডিম। খেলার ছলে ছোট্ট শিশু নিশাত শবনম সেগুলি বাড়িতে নিয়ে আসে। ডিমগুলো ভাঙতে গিয়ে একটির ভেতর থেকে পাওয়া যায় জীবিত ছানা। তখনও তার চোখ ফোটেনি। বাড়ির লোকজন ছানাটির যত্ন নিতে শুরু করেন। কিছুদিন পর সে ‘চু চু’ শব্দ করতে থাকে। সেই থেকে তার নাম হয়ে যায় চুচু। পরে দেখা যায়, ছানাটি আসলে মোরগ। তবে চুচু অন্য মোরগের মতো নয়। বাড়ির কেউ নাম ধরে ডাকলেই সে সাড়া দেয়, ছুটে আসে। মানুষের সঙ্গে তার এমন সখ্য যে পরিবারের সদস্যের মতোই হয়ে গিয়েছে সে। এ ঘটনা দেশের উত্তরের বিভাগীয় শহর রাজশাহীতে।
রবিবার চুচুর বয়স এক বছর পূর্ণ হয়েছে। তাই তার জন্মদিনের আয়োজন করেছিল রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বিড়ালদহ গ্রামের আবদুল হাদির পরিবার। কাটা হয়েছে কেক। কেকের টুকরা বেশ মজা করেই খেয়েছে চুচু। জানা যায়, নিশাত এখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। তার বড় বোন সুজানা শবনম সম্প্রতি স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। চুচুর দেখভালের মূল দায়িত্ব তাঁরই। চুচুর জন্য বাড়িতে কাঠের ছোট্ট একটি ঘরও বানানো হয়েছে। চাউমিন, চাল ও কেক তার পছন্দ। সাদা ভাত অবশ্য খেতে চায় না। পোলাও আবার বেশ আগ্রহ নিয়ে খায়। বাড়ির লোকজন ‘চুচু’ বলে ডাক দিতেই বাড়ির পেছন থেকে ‘কঁক কঁক’ শব্দ করে সাড়া দেয় সে। এরপর সুজানা ডাকতেই ছুটে এসে তাঁর পায়ের কাছে ঘুরতে থাকে। হাত বাড়িয়ে তাকে কোলে তুলে নিলেও চুচু কোনও আপত্তি করে না। মাথার ঝুঁটিতে হাত বুলিয়ে আদর করতেই সে মাথা নিচু করে থাকে, যেন আদর উপভোগ করছে।
আরও পড়ুন:
সুজানা জানান, ডিম ভেঙে জীবিত ছানাটি পাওয়ার পর দ্রুত তার মুখে জল দেওয়া হয়। চোখ না ফোটা পর্যন্ত তুলার মধ্যে রেখে চুচুর যত্ন নেন তাঁরা। পরে জল মিশিয়ে ফিড খাওয়াতে শুরু করেন। নিজের হাতে খাওয়ানোর কারণেই চুচুর সঙ্গে তাঁদের সখ্য গড়ে ওঠে। শুরুতে চুচু তাঁদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াত। এমনকি বিছানায় তাঁদের পাশেই ঘুমাত। পরে বয়স বাড়লে তার জন্য কাঠের ঘর বানিয়ে দেওয়া হয়। রাতে সেই ঘরে সে ঘুমায়। ডাক দিলেই ভেতর থেকে সাড়া দেয়।
চুচুর সঙ্গে ‘মোরগলড়াইও’ খেলেন বাড়ির লোকজন। মুখের সামনে পা এগিয়ে দিলেই সে ঘাড়ের পালক ফুলিয়ে আক্রমণ করতে আসে। সুজানার কাকা মেহেরুল্লাহ চুচুর সঙ্গে এভাবে খেলেন। মোরগে-মোরগে লড়াইয়ের সময় যেমন উত্তেজনা হয়, খেলার সময় চুচুও তেমনই খেপে ওঠে। চুচুর এই স্বভাবের কথা আশপাশের লোকজনও জানেন। জন্মদিনের অনুষ্ঠানে তাই স্বজনদের আনাগোনা ছিল।
চুচুর জন্মদিনে আনা হয়েছিল কেক, ফল ও মিষ্টি। কেক কাটার সময় চুচুকে ঘরে এনে বসানো হয় সুজানার কোলে। সবাই একসঙ্গে বলেন, ‘হ্যাপি বার্থডে, চুচু’। এরপর চুচুকে কোলে বসিয়ে কেক কাটেন সুজানা। কেকের টুকরা চুচুর মুখের কাছে নিতেই সে ঝুঁটি ঝাঁকিয়ে বেশ আগ্রহ নিয়ে খেতে শুরু করল। সেই দৃশ্য দেখে সবাই করতালি দিলেন।
সুজানার কাকি নূরজাহান বেগম জানান, তাঁর মুরগি ১২টি ডিম দিয়েছিল। সাতটি ডিম থেকে সময়মতো ছানা হয়। বাকি পাঁচটি ডিমের জন্য মুরগিটিকে আরও দুই দিন বসিয়ে রাখা হয়েছিল। এরপরও ছানা না হওয়ায় নূরজাহান ডিমগুলো বাড়ির পাশের পুকুরে ফেলে দেন। এ সম্পর্কে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক জালাল উদ্দিন সরদার বলেন, একটি মুরগির ক্ষেত্রে ছানা ফোটানোর জন্য ১২টি ডিম অনেক বেশি। মুরগি যদি ছোট হয়, সে ক্ষেত্রে চার-পাঁচটি ডিম কম তাপ পেয়েছে। ফলে নির্ধারিত ২১ দিনের মধ্যে ওই ডিম ফুটে ছানা বের হয়নি। হয়তো ডিমগুলো ভালোই ছিল। এ জন্য ছানা বাঁচতেই পারে।
নূরজাহান বলেন, নিশাত ডিমগুলো তুলে এনে ভেঙে ছানাটি পায়। কিছুটা বড় হলে সুজানা তাঁকে মোরগটি দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি আর নেননি। তিনি বলেন, ‘ওরা কষ্ট করে ছানাটা বড় করেছে। তাই ওদের বললাম, তোমরা ওটা দিয়ে পিকনিক কইরো, না হয় যা খুশি তা-ই করো।’ তবে সেই ‘পিকনিক’ আর হয়নি। পুকুরে ফেলে দেওয়া ডিমের সেই ছানা এখন তাঁদের পরিবারেরই একজন। সুজানা বলেন, ‘চুচু যত দিন বাঁচবে, এ বাড়িতেই থাকবে। এত আদরের মোরগকে জবাই করে খেতে পারবে না, বিক্রিও করব না। চুচু এখন আমাদের পরিবারের একজন সদস্য।'