সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক ভিটেয় অতিথিশালা, ১৪ বছরে থাকেননি একজনও পর্যটক! কেন?
Kishore Ghosh
বাংলাদেশের হাওড়-বাওড় বেষ্টিত জেলা কিশোরগঞ্জ। এই জেলার কটিয়াদীতে রয়েছে বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের (Satyajit Ray) পৈতৃক বাড়ি। প্রায় দেড় দশক আগে ঐতিহাসিক বাড়িটির পাশে ৭০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছিল একটি অতিথিশালা। যদিও গত ১৪ বছরে সেখানে একজনও পর্যটক রাত্রিবাস করেননি। কোন কারণে এই অবস্থা?
প্রযুক্তিবিদ, শিশুসাহিত্যিক, অঙ্কন ও সঙ্গীত শিল্পী উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ১৮৬৩ সালের ১২ মে কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার এই মসূয়া গ্রামের বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। সেই বাড়ি এখন জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। যদিও বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব দপ্তরের নিয়ন্ত্রণে থাকা বাড়িটি দেখতে বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন পর্যটকেরা আসেন। কটিয়াদীতে ভালো আবাসিক হোটেল না থাকায় দূরদূরান্তের পর্যটকেরা রাত্রিযাপন নিয়ে বিপাকে পড়তেন। বিষয়টি বিবেচনা করেই ২০১১ সালে রায়চৌধুরী ভিটার পাশে অতিথিশালা নির্মাণ শুরু করে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন।
আরও পড়ুন:
দোতলা অতিথিশালা, সীমানাপ্রাচীর ও রাস্তাঘাট উন্নয়নে প্রকল্পে ব্যয় হয় ৭০ লক্ষ টাকা। এর মধ্যে অতিথিশালা নির্মাণ ও আসবাব কেনায় খরচ হয় ৫২ লক্ষ টাকা। ২০১২ সালের মাঝামাঝি সময়ে অতিথিশালাটির উদ্বোধনও হয়। এরপর ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও কোনও পর্যটক সেখানে রাত কাটাননি। যেহেতু অতিথিশালায় আজ অবধি কোনও কর্মী নিয়োগ করা হয়নি। কেয়ারটেকার বা ম্যানেজার, রান্নার কাজের লোক কিংবা সাফাইকর্মী, কোনও পদেই কর্মী নিয়োগ করেনি কর্তৃপক্ষ। এই বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের বক্তব্য, অতিথিশালা পরিচালনার জন্য পদ সৃষ্টির বিষয়ে পর্যটন কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিক চিঠি দেওয়া হয়েছে। তাতে লাভ হয়নি।
অতিথিশালা দেখভালে কোনও তত্ত্বাবধায়ক (কেয়ার টেকার) না থাকায় মসূয়া ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ের ঝাড়ুদার সঞ্জিৎ চন্দ্র দাস সেটি দেখাশোনা করেন। অতিথিশালার ভেতরে গিয়ে দেখা যাবে, সম্প্রতি রং করা হয়েছে। নিচতলা ও দোতলায় আলাদা খাট, সোফা, তিনটি শৌচাগার ও দু'টি ডাইনিং টেবিল। আছে ড্রেসিংটেবিল, আলমারি-সহ প্রয়োজনীয় আসবাব। আইপিএস ও ইন্টারনেট সংযোগও রয়েছে।
মসূয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বকর সিদ্দিক বলেন, অতিথিশালা পরিচালনার জন্য লোকবল লাগবে, এটা সরকার জানে না, এটা হতে পারে না।
কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী আধিকারীক শামিমা আফরোজ এবং স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, উদ্বোধনের পর দীর্ঘদিন ধরে অতিথিশালাটি দিন-রাত তালাবদ্ধ থাকত। দেখাশোনার লোক না থাকায় একসময় জানালার গ্রিল ও বিদ্যুতের তার চুরি হয়ে যায়। নষ্ট হয়ে যায় আসবাব। জল সরবরাহের ব্যবস্থাও বিকল হয়ে পড়ে। ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে শৌচাগার। ভবনের পেছনে নেশাখোরদের আড্ডা বসত। সঞ্জিৎ চন্দ্র দাস জানান, ‘অতিথিশালায় যা কিছু করা হয়েছে সম্প্রতি, সবই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কটিয়াদী সফরকে কেন্দ্র করে।’
সম্প্রতি সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক ভিটা দেখতে যান কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার দুই বন্ধু সাব্বির আহমেদ ও কবির মিয়া। অতিথিশালা নিয়ে কবির বললেন, হাতের কাছে এক গ্লাস জল পাওয়া যেখানে কঠিন, সেখানে লোকে থাকবে কেন। জিনিস বানালে হয় না, যত্ন নিতে হয়। সেবা দেওয়ার মানসিকতা থাকতে হয়।’ অতিথিশালার কাছেই মসূয়া ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়। সেখানকার অফিস সহকারী আবু নাঈম আকন্দ বলেন, প্রতিদিনই দূরদূরান্তের কেউ না কেউ সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক ভিটায় আসেন। তবে ভিটা দেখতে এসে কেউ অতিথিশালায় থেকেছেন বলে তাঁর মনে পড়ে না।
মসূয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বকর সিদ্দিক বলেন, অতিথিশালা পরিচালনার জন্য লোকবল লাগবে, এটা সরকার জানে না, এটা হতে পারে না। পরবর্তী উপজেলা কমিটির সভায় বিষয়টি তুলে ধরে প্রতিকারের চেষ্টা করবেন বলে জানান। জানতে চাইলে কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামিমা আফরোজ বলেন, থাকার মানুষ আসে না বলেই এত দিন কেউ থাকেনি। তবে কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী কয়েক দিন আগে সেখানে থেকেছেন। তাঁর ভাষ্য, অতিথিশালাটি এখন মেরামত করা হয়েছে। চাইলে যে কেউ থাকতে পারবেন। যদিও কর্মী নিয়োগ না হলে তা আদৌ সম্ভব নয়, বলছে পর্যটক থেকে স্থানীয়রা।