১২ এপ্রিল প্রয়াত হন আশা ভোঁসলে। বাংলা গানের জগতে তিনি এখনও একনম্বর শিল্পী, তাঁর জনপ্রিয়তা লতা মঙ্গেশকরকেও এক্ষেত্রে ছাড়িয়ে গিয়েছে। আধুনিক গানগুলির পাশাপাশি বাংলা সিনেমার অজস্র গান, পুজোর গান, এমনকী রবীন্দ্রসংগীত অবধি একটি বৃহৎ রিপারটোয়ার তাঁকে বাঙালি জীবনে অমলিন রেখেছে। লিখছেন ভাস্কর মজুমদার।
‘আমারই জীবনে/ ওগো মোর বন্ধু/ আছে শুধু তোমারই দান/ হয়তো কখনও/ না পাওয়ার বেদনায়/হয়েছিল কিছু অভিমান...’ এখনও দৃশ্যটি মনের আয়নায় ভেসে উঠলে বেশ লজ্জিত লাগে। অথচ সেই সময়ে আমরা সম্মিলিত মজা উপভোগ করতাম। মধু পাগলির পরনে থাকত ছেঁড়া তেলচিটে নাইটি, বুকের উপর অনেকগুলো কাপড় জড়িয়ে জড়িয়ে সে ওড়না বানাত। হাতে অজস্র চুড়ি– কাঠের, কাচের, তামার, ইমিটেশনের। মাথার চুলটা ছিল ববকাটের কাদামাখা– কত দিন যে স্নান করেনি সে! আর মধু পাগলির সঙ্গে থাকত প্লাস্টিক-মোড়া অনেকগুলো পলা আর একটা লাঠি। পাড়ার সামনে মধু এলে ছেলেমেয়ে, মহিলারা ওকে খানিক ঘিরে ধরে জিজ্ঞেস করত– ‘মধু, আজ কী গাইবি?’ মধু সময় নিত না। গেয়ে উঠত– ‘একটা দেশলাই কাঠি জ্বালাও!’ এর পরের লাইনে যে তিনটে ‘আহা’ আছে সেই তিনবার ‘আহা’ বলে মধু শরীরটাকে এক অচেনা ছন্দে দোল দিত। নাচের ভঙ্গি করে গাইত– ‘তাতে আগুন পাবে/ শীতের কাছ থেকে দূরে পালাও তাতে ফাগুন পাবে/ তবু আমাকে আর পাবে না/ কারণ আমায় অবহেলা করেছ করেছ তুমি/আমায় নিয়ে খেলা করেছ..!’ কখনও আবার মধু সুর তুলত এই বলে– ‘এখনই রাতের আঁধারে/ কী খেলা হবে কে জানে/ এসেছে ভালবাসিতে কতটুকু থাকে জানে/ আমায় ছেড়ে সরে যেও না/ যেও না সরে/ চলে যেও না/ চলে গেলে এ মধুরাত ফিরে পাবে না/ হায় না হায় না...!’
যতটুকু স্মৃতিতে আছে, মনে হয়– মধুর গানের গলা সুরেলা ছিল। সুমিষ্ট ছিল। তবে এ-কথা সত্য যে, তখন মধুর গানের কদর বোঝার থেকে বেশি উপভোগ করত ওর পাগলামি। এও যে এক প্রকার হেনস্তা, তখন তা বুঝিনি। কিন্তু কী আশ্চর্য, মধুর গাওয়া সেসব গান আমাদের মধ্যে কীভাবে যেন ঢুকে পড়েছিল। অবশ্য আমরা ওই গানগুলিকে সে-সময় ভাবতাম আসলে মিতা চ্যাটার্জির গান। মধু পাগলি মিতা চ্যাটার্জির থেকে ধার নিয়েছে। কারণ, তখন পুজোয়, ফাংশনে, উৎসবে যখনই এসব গান বাজত, ক্যাসেটে যাঁর ছবি আর নাম থাকত, তিনি মিতা চ্যাটার্জি। গানগুলি যে আমাদের মধু আর মিতা চ্যাটার্জি কারওরই না– সেটা জানতে পেরেছিলাম অনেকটা পরে।
আশা ভোঁসলে
আমাদের পাশের বাড়িতে একজন দাদা থাকত, ধরা যাক, তার নাম তনু, তার কাছে এক বন্ধু আসত মপেড স্কুটার নিয়ে। সারা বিকেল তনুদা সেই বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করত, ঘন ঘন বারান্দায় আসত উদ্বেগ নিয়ে। আর যখন সেই বন্ধুর স্কুটার ওর বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াত তনুদার আনন্দ দেখে কে! তনুদা একছুট্টে বেরিয়ে সেই মপেডে চেপে কোথায় যেন চলে যেত, আর ফিরত রাত করে। মাঝে মাঝে সেই বন্ধুর সঙ্গে বাড়িতে তনুদার ঝামেলা হত শুনতাম। এক সময় তনুদার সেই বন্ধু আসা কমিয়ে দিল। তারপর একদিন থেকে আর এলই না। তনুদা বিষণ্ণ মুখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকত। বিকেল থেকে কখনও রাত হয়ে যেত অথচ তনুদা ওই বারান্দায় তখনও ঠায় দাঁড়িয়ে! ঠিক ওই সময় ওর বাড়ি থেকে ক্যাসেটের কয়েকটি গান পর পর ভেসে আসত। ‘প্যায়াসি হু ম্যায় প্যায়াসি রহনে দো’ কিংবা ‘খালি হাত শাম আয়েগি’ অথবা ‘মেরা কুছ সামান তুমহারে পাস রাখা হ্যায়’।
বেশিরভাগ বিকেলে ওই একটা ক্যাসেটই বাজত। উপলব্ধি করতাম তনুদার দুঃখিত মনের আকুতি ওই গানগুলির সঙ্গে মিলেমিশে আছে। ওই গানে তনুদার দু’-চোখ জলে ভরে উঠত আর সে বলত, ‘বারান্দা দিয়ে একদিন ঝাঁপ দেব, দেখিস!’ কেন তনুদা এমন কথা বলত, বুঝিনি তখন। এই তনুদার কাছেই জানতে পারি– গানগুলি গেয়েছেন আশা ভোঁসলে। মধু পাগলি আর মিতা চ্যাটার্জির গান আসলে আশা ভোঁসলের গান। এপ্রিলের ১২ তারিখ আশা ভোঁসলের মৃত্যুসংবাদ যখন সারা দেশ পেল, তখন মধু পাগলি আর তনুদার কথা মনে পড়ছিল খুব। আসলে ‘গায়ক’ অনেকেই হন, কিন্তু প্রত্যেকের গান অনেকগুলি জীবনের গান হয়ে ওঠার ক্ষমতা ধারণ করে না। কেবল লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে খানিক তুলনা করে, তথাকথিত বাধ্য আর অবাধ্য মেয়ের ন্যারেটিভ টেনে আশা ভোঁসলের সংগীতের পর্যালোচনা চলে না। আশার কণ্ঠ আমাদের অনেককে আরও গভীরতায় নিয়ে গিয়েছে, এখনও নিয়ে যায়। এর কারণ আশার ব্যক্তিগত জীবন ও নিখুঁত সংগীতশৈলী কোথাও যেন মারাত্মক মিল খেয়েছে। একে তো তাঁর ওরকম সুরের ধারণ, তার উপর সেই সুরের অভিব্যক্তি।
গানে গানে আশা
আশা ভোঁসলে গানের মধ্যে প্রেম, কাম, আর্তি এমনকী হাসি-কান্নাও কী অবলীলাক্রমে প্রবেশ করিয়ে দিতে পারেন, অথচ সেই প্রকাশে এতটুকু সুরের এদিক-ওদিক হয় না! এবং এতরকম গান তিনি গেয়েছেন স্বামীর কাছে মার খেয়ে, নিজের বড় দিদি লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে অলিখিত প্রতিযোগিতায়, একার হাতে একাধিক সন্তান পালন করে, দিনরাত স্টুডিওতে গান গেয়ে ফিরে বাড়িতে রান্না চাপিয়ে, ও. পি. নাইয়ারের সঙ্গে প্রেম ভেঙে যেতে, রাহুল দেব বর্মণকে বিয়ে ও রাহুলের মৃত্যুতে, রিমিক্স গানে অংশগ্রহণে, মীরা দেব বর্মণকে বৃদ্ধাশ্রমে রাখার সমালোচনায়, এক সন্তানের অকালমৃত্যু এবং আর-এক সন্তানের আত্মহননে, রিয়েলিটি শো-তে বিচারক হয়ে এবং সর্বোপরি কখনও আলুথালু না থেকে সবসময় সাজগোজের মধ্যে নিজেকে পুনঃপুন আবিষ্কার করায় (নবতিপর বয়সেও তাঁর চুল কখনও সাদা হয়েছে এমন দেখা যায়নি)! কলকাতা দূরদর্শনে সলিল চৌধুরী-কৃত সাক্ষাৎকারে আশা ভোঁসলের সেই বিখ্যাত উক্তি– ‘দাদা, আপনার হাসির ভাগ সকলে নেবে কিন্তু কেউ কান্নার দায়িত্ব নেবে না!’– বোধ হয় সারা জীবন তাঁরই জীবনদর্শন ছিল। তাই নিজের এক সদাহাস্যময়, ফ্যাশনসচেতন রূপ সবসময় জনমানসে তিনি প্রস্ফুটিত রেখেছিলেন।
বাংলা গানের ক্ষেত্রে আশা ভোঁসলে এখনও একনম্বর শিল্পী এবং তাঁর জনপ্রিয়তা এক্ষেত্রে লতা মঙ্গেশকরকেও যে ছাড়িয়ে গিয়েছে, এমন বললে অতিশয়োক্তি হয় না। বাঙালির চেতনায় লতা মঙ্গেশকরের জনপ্রিয়তা সলিল চৌধুরীর সুরে সেসব মণিমুক্ত-সম গানগুলিতে আটকে। কিন্তু গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার কিংবা স্বপন চক্রবর্তীর কথায় ও রাহুল দেব বর্মণের সুরে আশা ভোঁসলের আধুনিক গানগুলির পাশাপাশি বাংলা সিনেমার জন্য গাওয়া তঁার অজস্র গান, পুজোর গান, এমনকী রবীন্দ্রসংগীত অবধি একটা বৃহৎ রিপারটোয়ার তাঁকে বাঙালি জীবনে অমলিন রেখেছে। এখনও দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে তঁার গান বাজে, রবীন্দ্রজয়ন্তীতে তাঁর গান শোনা যায় এবং সুনিধি চৌহান যে কিছু মাস আগে কলকাতায় অনুষ্ঠান করে গেলেন, তাতে কী গাইলেন? আশার সেই বিখ্যাত গান– ‘চোখে চোখে কথা বলো/ মুখে কিছু বোলো না/ মন নিয়ে খেলা করো/ এ কী ছলনা!’এবং সেখানে নানা বয়সের দর্শক-শ্রোতা প্রায় মুখস্থ করার ভঙ্গিতে সেদিন সেই গান গেয়ে উঠেছিল।
লতা-আশা
হিন্দি সিনেমায় আশা একটা বিশেষ ঘরানা তৈরি করেছিলেন ‘ভ্যাম্প’ নারীদের ঘিরে। সাত-আটের দশকে বহু সিনেমায় ভ্যাম্প (বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হেলেন অভিনীত) যেন একটা আলাদা চরিত্র হিসাবে গড়ে উঠত কেবল আশা ভোঁসলের কোনও একটি গান অবলম্বন করে। বাধাহীনা, ব্রাত্য নারীর আকাঙ্ক্ষা, আত্মবিশ্বাস ও যৌনতা– সেসব গানে ধরা থাকত, যা এখন প্রায় এক বিশিষ্ট ইতিহাসের অংশ। কিন্তু আশা ভোঁসলে অজান্তে আর-একটি মূক শ্রেণিকে ভাষা প্রদান করেছিলেন তঁার গানের মাধ্যমে– তাঁরা হলেন ভারতের সমকামী-রূপান্তরকামী মানুষ। আশা নিজেকে কখনও যৌনসংখ্যালঘু মানুষের ‘অ্যালি’ (মিত্র) হিসাবে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেননি, কিন্তু তাঁর ‘আইয়ে ম্যাহেরবাঁ’, ‘পিয়া তু অব তো আজা’, ‘দম মারো দম’, ‘জাওয়ানি জানেমন’, এমনকী ‘ইন আখোঁ কি মস্তি কে’ অবলীলায় সমকামী পুরুষের, রূপান্তরকামী-নারীদের মনের কথা বলে ফেলেছে। যখন ভারতের যৌনসংখ্যালঘু মানুষ স্বস্তির শ্বাসটুকু নিতে পারতেন না, তখন আশা ভোঁসলের গান তাঁদের নিষিদ্ধতাকে নিপাতনের সিদ্ধি দিয়েছে। ‘দুনিয়ানে হামকো দিয়া ক্যায়া/ দুনিয়াসে হমনে লিয়া ক্যায়া/ হম সবকি পরভা করে কিঁউ/ সবনে হামারা কিয়া ক্যায়া’ কিংবা ‘থাকো সাথে আর রাখো হাতে দুটো হাত/ চোখে রেখে চোখ কথা হোক সারা রাত/ ও ক্ষতি কি সময়কে ভুলে গেলে আজ রাতে/ জানো যদি এ মন কি চায়’ অথবা ‘ইস আনজুমান মে আপ কো আনা হ্যায় বার বার/ দিওয়ারো দরকো গরসে পহেচান লিজিয়ে/ দিল চিজ় ক্যা হ্যায় আপ মেরি জান লিজিয়ে’– এসব কথা ও সুরের যে বেদনাবিধুরতা, তাতে দেশের যৌনসংখ্যালঘু সমকামী-রূপান্তরকামী মানুষের ভাগ ও অধিকার রয়েছে।
দেশ-বিদেশ জোড়া প্রচণ্ডরকম জনপ্রিয়তার পাশাপাশি আশা ভোঁসলে ‘ভারতরত্ন’ আর সংগীত নাটক অকাদেমি পুরস্কার-ফেলোশিপ বাদে এক সংগীতশিল্পীর আকাঙ্ক্ষিত সমস্ত সম্মান পেয়েছেন। জাতীয় পুরস্কার, ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার, পদ্ম পুরস্কার, দাদা সাহেব ফালকে, গ্র্যামিতে মনোনয়ন থেকে শুরু করে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক গান অসংখ্য ভাষায় গাওয়ার ‘গিনেস বুক’ বিশ্ব রেকর্ড পর্যন্ত তঁার ঝুলিতে। সত্তরাধিক বছরের সাংগীতিক জীবনে প্রতিটি প্রজন্মের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা তিনি আদায় করে নিয়েছেন। কিন্তু তঁার গান যে-কাজটা পেরেছে, সেই নিষিদ্ধতার সাধন ও ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত হয়ে ওঠা– অন্তত ভারতে তেমন কারও গান সে-কাজ এমনভাবে করে উঠতে পারেনি।
আশা ভোঁসলের চলে যাওয়া অপূরণীয় ক্ষতি, তা সত্যি তবে কণ্ঠ তো সারা জীবন সঙ্গ দেয় না, কখনও তা বন্ধ হয়। কিন্তু আশা ভোঁসলের গানের ব্যঞ্জনা মানুষকে জীবনের দিকে, জিতের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। মধুপাগলি রাস্তায় বাসচাপা পড়ে মারা গিয়েছিল ঠিকই, তা’ বলে তনুদা বারান্দা দিয়ে কখনও ঝাঁপ দেয়নি। সে অন্য এক বন্ধুর সঙ্গে অনেক বছর পর নতুন এক জীবন শুরু করেছিল। ‘ও তোমারই চলার পথে/ দিয়ে যেতে চাই আমি/ একটু আমার ভালবাসা/ তাই নিয়ে তুমি/ আমায় করো ঋণী/ এটুকু আশা...’।
