পুরাণকথা নয়, বৈদিক শ্রুতির আলোতেই লুকিয়ে দেবী দুর্গার আসল পরিচয়!
Buddhadeb Halder
আকাশে-বাতাসে উমা-আগমনের আনন্দধ্বনি। কিন্তু এই আদ্যাশক্তি দেবী কি নেহাতই পৌরাণিক যুগের সৃষ্টি? নাকি তাঁর শিকড় ছড়িয়ে রয়েছে সুদূর বৈদিক সনাতন ঐতিহ্যে?
পৌরাণিক কাহিনির আবহে আমরা যাকে দশভূজা বলে জানি, বৈদিক ঋষিরা তাঁকেই দেখেছেন জগৎ-নিয়ন্ত্রী পরমব্রহ্ম রূপে। দেবী চণ্ডী পাঠের ঠিক শুরুতেই সূচিত হয় 'দেবীসূক্ত'। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ১২৫ সংখ্যক এই সূক্তে মোট আটটি মন্ত্র রয়েছে। দ্রষ্টা ঋষি হলেন মহর্ষি অম্ভৃণের কন্যা বাক্-আম্ভৃণী। ত্রিষ্টুপ ও জগতী ছন্দে গাথা এই মন্ত্রাবলীতে দেবী নিজেই নিজেকে পরমাপ্রকৃতি ও সমস্ত শক্তির উৎস বলে ঘোষণা করেছেন। সুরথ রাজা ও সমাধি বৈশ্য এই সূক্ত জপ করেই দেবীর কৃপা লাভ করেছিলেন।
আরও পড়ুন:
শুধু দেবীসূক্তই নয়। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ১২৭ নম্বর 'রাত্রি সূক্ত'-তেও রয়েছে মহাজাগতিক শক্তির আবাহন। ভরদ্বাজ-কন্যা রাত্রি অথবা কুশিক মুনির দৃষ্ট এই সূক্তের গায়ত্রী ছন্দে অশুভ শক্তির বিনাশের প্রার্থনা উজ্জ্বল। অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রাই এই বৈদিক স্তুতির মূল সুর।
শুধু দেবীসূক্তই নয়। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ১২৭ নম্বর 'রাত্রি সূক্ত'-তেও রয়েছে মহাজাগতিক শক্তির আবাহন। ভরদ্বাজ-কন্যা রাত্রি অথবা কুশিক মুনির দৃষ্ট এই সূক্তের গায়ত্রী ছন্দে অশুভ শক্তির বিনাশের প্রার্থনা উজ্জ্বল। অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রাই এই বৈদিক স্তুতির মূল সুর।
শাস্ত্রীয় বিচারে দেবী দুর্গার প্রত্যক্ষ বৈদিক প্রমাণের অভাব নেই। কৃষ্ণ যজুর্বেদের 'তৈত্তিরীয় আরণ্যক'-এর নারায়ণ উপনিষদে দেবী দুর্গার গায়ত্রী মন্ত্রে স্পষ্ট ভাষায় উচ্চারিত হয়েছে: "কাত্যায়নায় বিদ্মহে, কন্যাকুমারীং ধীমহি। তন্নো দুর্গিঃ প্রচোদয়াৎ।।" এখানে 'দুর্গি' বা দুর্গা, কাত্যায়নী ও কন্যাকুমারী রূপকে একই আদ্যাকলার প্রকাশ বলে মনে করা হয়েছে। অন্যদিকে সামবেদের 'কেনোপনিষদ্'-এ দেবগণের দর্প চূর্ণ করতে আবির্ভূত হন 'উমা হৈমবতী'। এই হৈমবতী দেবীই জ্ঞান ও শক্তির প্রতীক দুর্গা।
শ্রুতির এই শাশ্বত মন্ত্রসমূহ প্রমাণ করে যে দুর্গাপূজা কোনও পরবর্তী যুগের অলৌকিক উদ্ভাবন নয়। বৈদিক ঋষিদের গভীর ধ্যানচিন্তা ও পরমাত্মার অনুসন্ধানের পথ ধরেই আধুনিক শাক্ত সংস্কৃতির বিকাশ। বেদ ও পুরাণের এই অপূর্ব মেলবন্ধনেই সিংহবাহিনী মহিষাসুরমর্দিনী আজ বাঙালির ঘরে ঘরে জগজ্জননী রূপে পূজিতা।