দেবীপক্ষমহানগররাজ্যবিদেশখেলালাইফস্টাইল
Rani Rashmoni

ভক্তির সামনে মাথা নুইয়েছিল ব্রিটিশ দম্ভ! গরান কাঠের বেড়ায় ইংরেজদের জব্দ করেছিলেন রাসমণি

যিনি স্বয়ং মা ভবতারিণীর অনন্য সাধিকা, যাঁর ধমনিতে প্রবহমান প্রতিবাদ আর অদম্য সাহসের রক্ত, সেই রানি রাসমণিকে থামায় কে! শ্বেতাঙ্গদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই সেদিন গর্জে উঠেছিল জানবাজার।
Buddhadeb Halder
03:07 PM Sep 29, 2026 IST
যিনি স্বয়ং মা ভবতারিণীর অনন্য সাধিকা, যাঁর ধমনিতে প্রবহমান প্রতিবাদ আর অদম্য সাহসের রক্ত, সেই রানি রাসমণিকে থামায় কে! শ্বেতাঙ্গদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই সেদিন গর্জে উঠেছিল জানবাজার।
জানবাজারের দুর্গাপুজোর সেই না-জানা ইতিহাস বিস্মিত করবে আপনাকে!

শরতের আকাশ তখন ঢাকের কাঠি আর শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত। জানবাজারের রাজবাড়িতে আগমন ঘটেছে মহামায়ার। চারদিকে আনন্দের আমেজ, ভক্তির জোয়ার। কিন্তু বাঙালির সেই আবহমান আনন্দে আচমকাই পড়েছিল সাহেবদের চোখ। ঢাক-ঢোল বাজিয়ে শোভাযাত্রা করা চলবে না— ফতোয়া জারি করল ইংরেজ পুলিশ। কিন্তু যিনি স্বয়ং মা ভবতারিণীর অনন্য সাধিকা, যাঁর ধমনিতে প্রবহমান প্রতিবাদ আর অদম্য সাহসের রক্ত, সেই রানি রাসমণিকে (Rani Rashmoni) থামায় কে! শ্বেতাঙ্গদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই সেদিন গর্জে উঠেছিল জানবাজার।

ছবি: সংগৃহীত

১৭৯০ সালে জানবাজারের এই ঐতিহাসিক পুজোর সূচনা করেছিলেন রানির শ্বশুর প্রীতিরাম দাস। পরবর্তীতে ১৮৩৬ সালে সংসারের পাশাপাশি পুজোর ব্যাটনও নিজের হাতে তুলে নেন রাসমণি। রাজা রামমোহন রায় থেকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো তৎকালীন দিক্‌পালদের পদধূলিতে ধন্য হত এই রাজবাড়ি। এই বাড়ির পুজোর মহিমা অনন্য। একচালার প্রতিমা গঠনে থাকে শিল্প নৈপুণ্যের স্পর্শ। কোনও ছাঁচ নয়, লালু চিত্রকরের হাতের স্পর্শে রূপ পায় তপ্তকাঞ্চনবর্ণা দেবী। শোলার সাজে সজ্জিত মহামায়ার বোধন শুরু হয় প্রতিপদ থেকেই। চলে দীর্ঘ আট দিন ধরে। ষষ্ঠীতে দেবীপ্রতিমার চক্ষুদান এবং সপ্তমী থেকে নবমীর পুজোয় ভক্তি ও নিষ্ঠার অপূর্ব মিলন ঘটে।

Advertisement
দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

কিন্তু সেবার পুজোর শোভাযাত্রা ঘিরে বাধল চরম বিতর্ক। সাহেবদের নির্দেশ— শোভাযাত্রায় বাদ্যযন্ত্রের গর্জন বন্ধ করতে হবে। ব্রিটিশদের পরাক্রমের সামনে তখন বড় বড় রাজা-জমিদারদের হাঁটু কাঁপে। অথচ রানি রাসমণি ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাতুতে গড়া। তিনি স্পষ্ট বুঝিয়ে দিলেন, এ পুজো জগজ্জননীর। মায়ের আরাধনার পথে বাধা দেওয়ার এক্তিয়ার কারও নেই। সাহেবদের ফতোয়াকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দ্বিগুণ শব্দে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে শোভাযাত্রা বের করার নির্দেশ দিলেন রানি।

কিন্তু সেবার পুজোর শোভাযাত্রা ঘিরে বাধল চরম বিতর্ক। সাহেবদের নির্দেশ— শোভাযাত্রায় বাদ্যযন্ত্রের গর্জন বন্ধ করতে হবে। ব্রিটিশদের পরাক্রমের সামনে তখন বড় বড় রাজা-জমিদারদের হাঁটু কাঁপে। অথচ রানি রাসমণি ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাতুতে গড়া। তিনি স্পষ্ট বুঝিয়ে দিলেন, এ পুজো জগজ্জননীর। মায়ের আরাধনার পথে বাধা দেওয়ার এক্তিয়ার কারও নেই। সাহেবদের ফতোয়াকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দ্বিগুণ শব্দে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে শোভাযাত্রা বের করার নির্দেশ দিলেন রানি।

পরিণামে জুটল ৫০ টাকার জরিমানা। রানি নীরবে সেই জরিমানা মেটালেন। কিন্তু তা অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ ছিল না, ছিল এক মোক্ষম কৌশলের প্রথম ধাপ।

ছবি: সংগৃহীত

এর পরই আসল খেল দেখালেন জানবাজারের রানি। বাবুঘাট থেকে জানবাজার পর্যন্ত তাঁর নিজস্ব মালিকানাধীন রাস্তার মুখে তিনি বসিয়ে দিলেন বিশাল গরান কাঠের বেড়া। নথিপত্র এবং আইনি দলিলে সেই রাস্তার সার্বিক মালিকানা ছিল রানিরই। ফলে রাতারাতি বন্ধ হয়ে গেল সাহেবদের গাড়ি চলাচল। অচল হয়ে পড়ল শহরের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যপথ। রানি বুঝিয়ে দিলেন— ক্ষমতা থাকলেই ন্যায় বিচার হয় না, অধিকার ছিনিয়ে নিতে হয়। বিপাকে পড়ে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হল ব্রিটিশ প্রশাসন। স্বসম্মানে রাস্তা খুলে দেওয়ার অনুরোধ নিয়ে ছুটল পুলিশের বড়কর্তারা। ফেরত দেওয়া হল জরিমানার টাকাও।

ধর্মের সঙ্গে স্বাধিকার রক্ষার এই লড়াই আজও কলকাতার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায়। রানি রাসমণির পুজো কেবল ধূপ-ধুনো, প্রদীপ আর আরতির আচার-অনুষ্ঠান ছিল না, তা হয়ে উঠেছিল আত্মমর্যাদা ও অধিকার রক্ষার এক অপরাজেয় প্রতীক।

Advertisement
দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Tags :
Durga Puja 2026HistoryKolkata Durga PujaRani Rashmoni
Advertisement
Tags :
Durga Puja 2026HistoryKolkata Durga PujaRani Rashmoni

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন