মণ্ডপে ২০৮ ছবির সঙ্গে 'মানুষ' উত্তম কুমারও, শতবর্ষে শহরের পুজোয় মহানায়ককে শ্রদ্ধা
Subhankar Patra
'তারে বলে দিও, সে যেন আসে না......।' সুরকার ও শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কালজয়ী এই গান কানে ভেসে এলেই বাঙালি শ্রোতার মনের পর্দার যাঁর ছবি ভেসে উঠে এবার জন্মশতবর্ষে কলকাতার পুজো মণ্ডপে থাকবেন সেই মহানায়ক উত্তম কুমার।
‘জেন-জি’ নিয়ে যখন রাজ্যের এত চর্চা তখনও কিন্তু বাঙালিয়ানার আইকন একজনই, বাংলা ছবির চিরকালীন কিংবদন্তী রোমান্টিক অভিনেতা। আর্দ্দির গিলে করা পাঞ্জাবি আর ঢাক্কা পাড়ের ময়ূরপুচ্ছ ধূতি পরে চলা পাঁচফুট এগারো ইঞ্চির মানুষটির জীবনের রহস্যে মোড়া নানা অজানা কাহিনী অনুভবের অপেক্ষায় এবছরের পুজোর কলকাতা। ষাট ও সত্তর দশকে প্রতিবার পুজোয় পায়ে হেঁটে এসে যে মণ্ডপের মাতৃমূর্তির সামনে বিভোর হয়ে থাকতেন, নিজের ছবির গানের সুরে আবিষ্ট হতেন সেই বালিগঞ্জ সমাজসেবী (Samaj Sebi Sangha)-তে এবছর স্বমহিমায় নিজস্ব ঘরানায় ফিরছেন মহানায়ক।
আরও পড়ুন:
তাঁর প্রত্যাবর্তন ঘিরে ইতিমধ্যেই তিলোত্তমার উৎসব সমুদ্রে পুরাতনী-নস্টালজিয়ার সুনামী আঁছড়ে পড়ার সতর্কতা জারি করে পূর্বাভাস ঘোষিত। পুজো উদ্যোক্তাদের দাবি, ‘‘উত্তম কুমার কেন আজও প্রাসঙ্গিক? কেন টলিউডে রোমান্টিকতায় তাঁর ধারে কাছে অন্য কেউ পৌঁছাতে পারছেন না? জেন-জি’র গবেষণা ও কৌতুহলের এমন প্রচুর রসদ থাকবে এই পুজোয়। শুধু অভিনেতা নয়, মণ্ডপে এলে অনুভবে আসবে মানুষ উত্তম কুমারও। হৃদয়ে উপলব্ধি হবে পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন কিংবদন্তী সেই মানুষটি।’’
মুক্তিপ্রাপ্ত ওই ২০৮টি ছায়াছবির জানা-অজানা, রহস্যে ভরা এবং সাত দশক ধরে চর্চায় থাকা মহানায়কের জীবনের নানা মুহূর্তের পাশাপাশি ‘মানুষ উত্তম কুমার’কে পাওয়া যাবে মণ্ডপে। বলছিলেন পুজোর সম্পাদক অরিজিৎ মৈত্র। সমস্ত সিনেমার পোস্টার, হুবহু সেই সময়কার হরফ অর্থাৎ ক্যালিগ্রাফি মিলিয়ে এখন মণ্ডপ গাত্রে অপূর্ব-বর্ণময় শিল্পকলা ফুটিয়ে তুলছেন গভঃ আর্ট কলেজের শিল্পীরা।
তাঁর প্রথম ছবি দৃষ্টিদান, অভিনয় করেন পার্শ্বচরিত্রে। তারপর আরও পাঁচটি ছবি ফ্লপ। সপ্তম ছবি ‘বসু পরিবার’ হিট হলেও পরের বছর, ১৯৫৩ সালে সুচিত্রা সেনের সঙ্গে প্রথম সিনেমা ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ মুক্তি পেতেই টলিউডের চিরকালীন হিট জুটি হিসাবে স্বীকৃতি মেলে। তারপর সেই যে তিনি বাঙালির হৃদয়ে রোমান্টিক নায়কের আসনে বসলেন আজও তাঁর সেই সিংহাসন কেউ ছুঁতে পারেননি।
পরে আরও ৪০ জন নায়িকার সঙ্গে অভিনয় করেন তিনি। বাংলার আরেক কিংবদন্তী, সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী ছবি ‘নায়ক’-এর শর্মিলা ঠাকুর তো কলকাতায় পা দিয়ে উত্তমের সেই মোহময়ী ব্যক্তিত্বর কথা আজও উল্লেখ করেন। জন্মশতবর্ষের টানে তাঁর তিন নায়িকা সাবিত্রী, মাধবী ও অপর্ণা সেনও আসতে পারেন মণ্ডপে। যাঁর ভাবনায় ‘মহাপুজোয় মহানায়ক’ সমাজসেবীর মণ্ডপে সেই শিল্পী বিশ্বনাথ দে বলছিলেন, ‘‘নায়ক ছাড়াও সপ্তপদী, পথে হল দেরী, দুই পৃথিবী, শিল্পী, অগ্নিশ্বর, দেওয়া নেওয়া, বনপলাশীর পদাবলীর মতো কালজয়ী নানা ছবির হৃদয়স্পর্শী সংলাপ ও অন্তরে ঠাঁই নেওয়া গানের দৃশ্য ও বিরল মুহূর্ত দেখা যাবে মণ্ডপে।’’
উত্তম অভিনীত মোট ২০৩টি বাংলা ও ৯টি হিন্দি ছবি মুক্তি পায়। এর মধ্যে ডবল ভার্সান চারটি। বাস্তব তথ্য হল, উত্তম কুমার অভিনয় করলেও নানা কারণে ১০/১২টি ছবি আজও মুক্তি পায়নি। মুক্তিপ্রাপ্ত ওই ২০৮টি ছায়াছবির জানা-অজানা, রহস্যে ভরা এবং সাত দশক ধরে চর্চায় থাকা মহানায়কের জীবনের নানা মুহূর্তের পাশাপাশি ‘মানুষ উত্তম কুমার’কে পাওয়া যাবে মণ্ডপে। বলছিলেন পুজোর সম্পাদক অরিজিৎ মৈত্র। সমস্ত সিনেমার পোস্টার, হুবহু সেই সময়কার হরফ অর্থাৎ ক্যালিগ্রাফি মিলিয়ে এখন মণ্ডপ গাত্রে অপূর্ব-বর্ণময় শিল্পকলা ফুটিয়ে তুলছেন গভঃ আর্ট কলেজের শিল্পীরা। ষাট ও সত্তর দশকের পুজোয় সমাজসেবীর যে ঘরাণার প্রতিমা দেখতে মণ্ডপে আসতেন স্বয়ং উত্তম কুমার, এবছর সেই স্টাইলের মাতৃমূর্তি গড়ছেন শিল্পী অরিঘ্ন সাহা।
পুজোর ক’দিন মহানায়কের জীবনকাহিনী ঘেরা মণ্ডপে গেলে আপনাকে স্বাগত জানাবেন, ‘গিলে করা পাঞ্জাবি ও ঢাক্কা পাড়ের ধূতি পরা পুজোকমিটির সদস্যরা। ইচ্ছে হলে বসতে পারেন মহানায়কের প্রিয় ফরাসে।’ থিম (Samaj Sebi Sangha Puja Theme 2026) নিয়ে গতবছর নভেম্বরে কাজ শুরু করে উত্তম কুমারের সঙ্গে ক্যামেরার সামনে ও পিছনে থাকা বহু প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব ছাড়াও তাঁর পুত্রবধূ মহুয়া চট্টোপাধ্যায়ের সাহায্য নিয়েছেন শিল্পী বিশ্বনাথ। মহানায়ক নিয়ে সমাজসেবীর একগুচ্ছ কর্মসূচির অন্যতম হল, তাঁর শততম জন্মদিনে একটি ব্যতিক্রমী অডিও-ভিসুয়াল প্রকাশ করছে।