দেবীপক্ষমহানগররাজ্যবিদেশখেলালাইফস্টাইল
Durga Puja 2026

ছেলেমেয়ে নয়, সঙ্গী দুই সখী, দুর্গাপুরের ঘটক বাড়ির দুর্গাপুজোয় দেবীর বাহনেও চমক

তালপাতার পুঁথি দেখে নিয়মকানুন পালিত হয় ৪০০ বছরের প্রাচীন এই পুজোয়।
Sucheta Sengupta
05:25 PM Sep 08, 2026 IST
তালপাতার পুঁথি দেখে নিয়মকানুন পালিত হয় ৪০০ বছরের প্রাচীন এই পুজোয়।

যুদ্ধের সময় অমৃত পান করিয়েছিলেন দুই সখী। তাই তাদের সঙ্গে নিয়ে মা দুর্গা আসেন দুর্গাপুরের মলানদিঘির ঘটক বাড়িতে। এ বাড়িতে দেবী দুর্গার বাহনেও চমক। ঘোড়ারূপী সাদা সিংহের উপর চড়ে অবতীর্ণ হন দেবী। কোনও ছাপা বই নয়, তালপাতার পুঁথিতে পূর্বপুরুষদের হাতে লেখা মন্ত্র উচ্চারণ করেই আজও হয় দেবীর আরাধনা। এভাবেই গত ৪০০ বছর ধরে দুর্গাপুরের মলানদিঘির ঘটক বাড়িতে দুর্গাপুজো হয়ে আসছে।

পুরনো এই পুজোয় নেই লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক কিংবা গণেশ। মহিষাসুর বধের সময় দেবীকে অমৃত পান করানো দুই সখীই এখানে মায়ের নিত্যসঙ্গী। মলানদিঘির ঘটকবাড়ির দুর্গাপুজো (Durga Puja 2026) মানেই যেন ইতিহাসের পাতায় ফিরে যাওয়া। প্রায় চার শতাব্দী ধরে একই নিয়মে একই বিশ্বাসে চলে আসছে এই পুজো। সময় বদলেছে, বদলেছে প্রজন্ম। কিন্তু বদলায়নি দেবীর রূপ, পুজোর রীতি আর পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া মন্ত্র। প্রতিমার চেনা রূপ এখানে দেখা যায় না। দুর্গার পাশে থাকেন না লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ। বরং তাঁর দুই পাশে থাকেন দুই প্রিয় সখী - জয়া ও বিজয়া। মলানদিঘির ঘটক পরিবারের বিশ্বাস অনুযায়ী, মহিষাসুরকে বধ করার সময় দেবী দুর্গাকে অমৃত পান করিয়েছিলেন তাঁর দুই সখী জয়া ও বিজয়া। সেই বিশ্বাস থেকেই চারশো বছর ধরে এই দুই সখীকে সঙ্গে নিয়েই পুজো হয়ে আসছে ঘটকবাড়িতে।

Advertisement
দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

পুজোর প্রস্তুতি মলানদিঘির ঘটক পরিবারে, ছবি: সনাতন গড়াই

শুধু প্রতিমার বিন্যাসেই নয়, দেবীর বাহনেও রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। ঘটকবাড়ির প্রতিমায় মা দুর্গা অধিষ্ঠান করেন শ্বেত সিংহের উপর। আর সেই সিংহের মুখমণ্ডল সাধারণ সিংহের মতো নয়। ঘোড়ার মুখের আদলে তৈরি করা হয়েছে সিংহের মুখ। পরিবারের প্রচলিত কথায়, দুর্গম হিমালয়ে একসময় এই ধরনের মুখমণ্ডলযুক্ত সিংহ বিরাজ করত। সেই প্রাচীন বিশ্বাসেরই ছাপ দেখা যায় আজকের প্রতিমায়। মলানদিঘীর এই পুজোর ইতিহাস আরও কয়েক শতাব্দী পুরনো। অবিভক্ত বর্ধমান জেলার কাঁকসা এলাকায় একসময় বহু পণ্ডিত পরিবারের বসবাস ছিল। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিল তর্কতীর্থ বংশ। প্রায় ৪০০ বছর আগে এই বংশের পণ্ডিতরাই মাটির ঘরে জয়া-বিজয়াকে সঙ্গে নিয়ে দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু করেন। সেই সময় পুজোর অষ্টমী তিথিতে দেওয়া হত ছাগ বলি। আশপাশের গ্রামের মানুষদের জন্য আয়োজন করা হত মধ্যাহ্নভোজনেরও।

সময়ের সঙ্গে সেই প্রথার অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। প্রায় ২০০ বছর আগে বন্ধ হয়ে যায় ছাগ বলি। তার পরিবর্তে চালকুমড়ো বলির রীতি চালু হয়। তর্কতীর্থ বংশের অন্যতম পণ্ডিত ছিলেন বিশ্বনাথ তর্কতীর্থ। পরবর্তীকালে তিনি এই এলাকায় ‘ঘটক’ উপাধি লাভ করেন। এরপর থেকেই তর্কতীর্থ বংশ পরিচিতি পায় ঘটক বংশ হিসেবেও। বিশ্বনাথ তর্কতীর্থ এলাকায় একটি টোলও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই টোলে শেখানো হত বৈদিক মন্ত্র। পরবর্তী সময়ে তর্কতীর্থ বংশ ভট্টাচার্য বংশে পরিণত হলেও দুর্গাপুজোর প্রাচীন রীতিতে কোনও ছেদ পড়েনি। মাটির মন্দির বদলে পাকা মন্দির হয়েছে। কিন্তু পূর্বপুরুষদের নিয়ম আজও অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলা হয়।

এই পথেই মলানদিঘির ঘটকবাড়ি। ছবি: সনাতন গড়াই

আর এই পুজোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য পুজোর মন্ত্রের জন্য কোনও আধুনিক বইয়ের উপর নির্ভর করতে হয় না। পূর্বপুরুষদের হাতে লেখা তালপাতার পুঁথি আজও সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে পরিবারের কাছে। সেই পুঁথিতে লেখা চণ্ডীমন্ত্র পাঠ করেই সম্পন্ন হয় দেবীর আরাধনা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পুরোহিতের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়ে আসছে সেই প্রাচীন মন্ত্র। ফলে পুজোর প্রতিটি মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে যেন জড়িয়ে রয়েছে কয়েকশো বছরের পারিবারিক ইতিহাস। অষ্টমীর দিনও রয়েছে বিশেষ রীতি। শতদল পদ্মের ছবি এঁকে করা হয় বিশেষ পুজো। দেবীকে দেওয়া হয় নিরামিষ ভোগ। ছাগ বলির পরিবর্তে আজ চালকুমড়ো বলির মাধ্যমে সম্পন্ন হয় প্রাচীন বলির রীতি। তবে এই দুর্গোৎসব শুধু পুজোর চারদিনের আচার-অনুষ্ঠান নয়।

পূর্বপুরুষদের হাতে লেখা তালপাতার পুঁথি দেখে পুজোর নিয়মকানুন পালিত হয়, ছবি: সনাতন গড়াই

কর্মসূত্রে পরিবারের ছেলে-মেয়েরা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকলেও দুর্গাপুজো এলেই তাঁরা ফিরে আসেন বাড়িতে। চারদিনের জন্য একত্রিত হয় গোটা পরিবার। বাড়ির মহিলারাও পুজোর আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। রান্নাবান্না থেকে শুরু করে পুজোর যাবতীয় প্রস্তুতিতে তাঁদের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। চারদিন ধরে চলে দেবীর আরাধনা, পরিবারের মিলন আর উৎসবের আবহ।

এরপর গ্রামের পুকুরেই সম্পন্ন হয় প্রতিমা নিরঞ্জন। ঘটকবাড়ির এই দুর্গাপুজোর সঙ্গে তাই মিশে রয়েছে শুধুমাত্র ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, রয়েছে বংশের ইতিহাস, পণ্ডিতদের ঐতিহ্য, লোকবিশ্বাস এবং কয়েকশো বছরের সংস্কৃতি। সেই কারণেই দুর্গাপুজোর সময় মলানদিঘি তো বটেই, আশপাশের বহু এলাকার মানুষও ভিড় করেন এই প্রাচীন দুর্গাপুজো দেখতে। পরিবারের প্রবীণ সদস্য শক্তিশংকর ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘আমরা প্রাচীন রীতি মেনে পূর্বপুরুষদের লেখা পুঁথি দেখেই পুজো করে আসি। আর দেবীর সঙ্গে যে সিংহ থাকে সেই সিংহ হিমালয়ের অত্যন্ত শীতলতম জায়গায় দেখা যায়। এই সিংহ আবার ঘোড়ার মত দেখতে। দেবী অত্যন্ত জাগ্রত। অনেকের মনের ইচ্ছা বাসনা ও পূরণ হয়েছে। পুজো চারদিন পরিবারের সকলেই যে যেখানে থাকুক না কেন একত্রিত হন।"

Advertisement
দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Tags :
Durga Puja 2026Durgapur
Advertisement
Tags :
Durga Puja 2026Durgapur

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন