গিলে খাচ্ছে গঙ্গা, শিউলি-কাশফুলে ভরা সামশেরগঞ্জে পুজো যেন শুধুই বিষাদের
Sayani Sen
আকাশে মায়ের আগমনি সুর। ভোরের শিশিরে শিউলি ফুলের ঘ্রাণ, নীল আকাশে সাদা মেঘের আনাগোনা আর নদীর চরে কাশফুলের দোলা জানান দিচ্ছে - মা আসছেন। শহর থেকে গ্রাম, সর্বত্র এখন উৎসবের প্রস্তুতি। কোথাও বাঁশ বাঁধা হচ্ছে মণ্ডপের, কোথাও কুমোরটুলিতে প্রতিমায় পড়ছে রঙের শেষ টান। কিন্তু এই আগমনির সুরের মধ্যেই বিষাদের করুণ রাগ বাজছে মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জের উত্তর চাচণ্ডে। গঙ্গাতীরের এই গ্রামে শিউলি ফুটলেও তার গন্ধে আনন্দ নেই, কাশফুল দুললেও চোখে জল।
চাচণ্ড গ্রাম পঞ্চায়েতের উত্তর চাচণ্ড গ্রামের গঙ্গা তীরে প্রায় সাত বছর আগে গ্রামের মানুষ নিজের হাতে গড়ে তুলেছিলেন একটি কালী মন্দির। ইটের পর ইট গেঁথে, চাঁদা তুলে তৈরি সেই মন্দির ছিল শুধু ইট-পাথরের কাঠামো নয়, ছিল গোটা গ্রামের প্রাণ। সেখানেই হত দুর্গাপুজোর পরিকল্পনা। কালীপুজোর রাত জাগা। সন্ধ্যায় শঙ্খ-ঘণ্টার শব্দে মিলিত হত গোটা পাড়া। শিশুদের ছুটোছুটি, মায়েদের আড্ডা - সবকিছুর কেন্দ্র ছিল সেই মন্দির চত্বর। আজ সেই চত্বরে শুধুই গঙ্গার স্রোত। ভয়াবহ ভাঙনে বছর খানেক আগেই মন্দিরটির অধিকাংশ অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। যে বেদিতে প্রদীপ জ্বলত, আজ সেখানে জল ঘূর্ণি খায়। মন্দিরের সঙ্গে সঙ্গে নদী কেড়ে নিয়েছে গ্রামের মানুষের স্মৃতি, বিশ্বাস আর একসঙ্গে থাকার ঠিকানা।
আরও পড়ুন:
শুধু মন্দির নয়, গঙ্গা ধীরে ধীরে গিলে খাচ্ছে গোটা পাড়াটাই। একের পর এক বাড়ি, রাস্তা, চাষের জমি তলিয়ে যাচ্ছে। এই গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ দিনমজুর, ভিনরাজ্যে কাজ করা পরিযায়ী শ্রমিক এবং বিড়ি শ্রমিক। অনেকেই ভিটে হারিয়ে অন্যের জমিতে ত্রিপল টাঙিয়ে বসবাস করছেন। রাতে ঘুমানোর আগে একটাই আতঙ্ক তাড়া করে, সকালে উঠে এই ত্রিপলটুকুও থাকবে তো? সবচেয়ে অসহায় শিশুরা। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছুটতে ছুটতে তাদের পড়াশোনা আজ বন্ধের মুখে।
গ্রামবাসীদের অভিযোগ, বছরের পর বছর শুধু বালির বস্তা ফেলে দায় সারা হচ্ছে। বর্ষা এলেই সেই বস্তা ভেসে যায়। তাঁদের দাবি, স্থায়ীভাবে বোল্ডার ও কংক্রিটের বাঁধ তৈরি করা হোক। পুজো আসছে। মা দুর্গা আসছেন। কিন্তু উত্তর চাচণ্ডের মানুষের এবারের প্রার্থনা অন্যরকম। নতুন জামা নয়, আলোর মণ্ডপ নয়, তাঁরা শুধু চান মাথা গোঁজার একটু নিরাপদ জমি। তাঁদের একটাই আকুতি - "মা, আমাদের ঘরটা যেন আর না ভাঙে।"