দেবীপক্ষমহানগররাজ্যবিদেশখেলালাইফস্টাইল
Birbhum Durga Puja

বন্দুকের আওয়াজেই শুরু সন্ধিপুজো, বীরভূমের এই গ্রামে বৈষ্ণব মতেই হয় মায়ের আবাহন

Durga Puja 2026: দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে এই পরিবারের ঐতিহ্য বহন করে আসছেন উত্তরসূরি গোরাচাঁদ মুখোপাধ্যায়।
Kousik Sinha
05:21 PM Sep 28, 2026 IST
Durga Puja 2026: দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে এই পরিবারের ঐতিহ্য বহন করে আসছেন উত্তরসূরি গোরাচাঁদ মুখোপাধ্যায়।
বীরভূমের এই গ্রামে বৈষ্ণব মতেই হয় মায়ের আবাহন। ছবি - সুশান্ত পাল।

বন্দুক থেকে শূন্যে ছোড়া হয় গুলি। আর সেই আওয়াজ কানে আসার পরই শুরু হয়ে যায় মহাষ্টমীর সন্ধিপুজো। বীরভূমের কুন্ডলা গ্রামের এই পুজোর তিন শতক পেরিয়ে যেতে চলেছে। আশপাশের ৮ থেকে ১০টি গ্রামের পুজোমণ্ডপেও পৌঁছে যায় গুলির শব্দ। এই অভিনব রীতিই আজও ধরে রেখেছে ময়ূরেশ্বরের কুন্ডলা গ্রামের জমিদারবাড়ির সাবেকি দুর্গাপুজো। 

দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে এই পরিবারের ঐতিহ্য বহন করে আসছেন উত্তরসূরি গোরাচাঁদ মুখোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, প্রতি বছর তিনি গুলি চালালেও করলেও বিষয়টি তাঁর কাছে শুধুমাত্র একটি রীতি নয়। বরং গভীর বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি মুহূর্ত।

জানা যায়, প্রায় ৩০০ বছর আগে জমিদার পরিবারের পূর্বপুরুষ হাঁটুরাম প্রভুরাম কুন্ডলা গ্রামে শারদীয়া দুর্গাপুজোর সূচনা করেছিলেন। সেই সময় থেকেই বংশপরম্পরায় চলে আসছে এই পুজো। সময়ের সঙ্গে বদলেছে সমাজ, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা, হারিয়ে গিয়েছে বহু পুরনো সংস্কৃতি। কিন্তু জমিদারবাড়ির দুর্গাপুজোয় আজও অটুট রয়েছে সাবেকি রীতিনীতি।

Advertisement
দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

জমিদার আমলের তৈরি দুর্গামন্দিরটি এখনও সেই পুরনো ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে। গ্রামের বহু জমিদারবাড়ির দালান আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কোথাও স্রেফ অর্ধভগ্ন পরিকাঠামো টিকে রয়েছে। কিন্তু সেই সময়ের তৈরি দুর্গামন্দিরে আজও একচালা কাঠামোর উপর সাবেকি প্রতিমায় পুজো হয়ে আসছে। একই চালচিত্রের মধ্যে মা দুর্গার সঙ্গে রয়েছেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ। এই পুজো সম্পূর্ণ বৈষ্ণব মতে অনুষ্ঠিত হয়। পুজোর চার দিন পরিবারের সদস্যরা নিরামিষ আহার গ্রহণ করেন। জমিদার আমলে দুর্গাপুজোর চার দিনজুড়ে যাত্রাপালা, গান এবং নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হত। সময়ের সঙ্গে সেই আয়োজন কার্যত হারিয়ে গেলেও পুরনো পুজোর রীতিনীতি এখনও ধরে রেখেছে উত্তরসূরিরা।

আর এই পুজোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণের কথা আগেই বলা হয়েছে, মহাষ্টমীর সন্ধিপুজো। পুজো শুরুর ঠিক আগে জমিদারবাড়ির মন্দির প্রাঙ্গণে শূন্যে বন্দুক থেকে ছোড়া হয় গুলি। সেই আওয়াজই সন্ধিপুজো শুরুর সংকেত! শুধু জমিদারবাড়ির পুজোতেই নয়, আশপাশের একাধিক গ্রামের পুজোমণ্ডপেও এই শব্দ পৌঁছনোর পর সন্ধিপুজো শুরু করার রীতি রয়েছে। তবে অতীতে এই রীতি ছিল আরও জাঁকজমকপূর্ণ। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পুরনো দিনে সন্ধিপুজোর আগে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ রাউন্ড পর্যন্ত বন্দুক থেকে ছোড়া হত গুলি। সময়ের সঙ্গে সেই সংখ্যা কমে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে মাত্র একবারে! অর্থাৎ একবারই গুলি চালানো হয়। তবে সংখ্যা কমলেও ঐতিহ্যের গুরুত্ব একটুও কমেনি। অষ্টমীর সেই শুভক্ষণে বন্দুকের আওয়াজ শোনার জন্য এখনও কুন্ডলা গ্রামে ভিড় জমান আশপাশের বহু মানুষ।

বাড়ির মন্দিরেই তৈরি হচ্ছে প্রতিমা। ছবি - সুশান্ত পাল

দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে এই পরিবারের ঐতিহ্য বহন করে আসছেন উত্তরসূরি গোরাচাঁদ মুখোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, প্রতি বছর তিনি গুলি চালালেও করলেও বিষয়টি তাঁর কাছে শুধুমাত্র একটি রীতি নয়। বরং গভীর বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি মুহূর্ত। তাঁর দাবি, “প্রত্যেক বছর আমি বন্দুকে ফায়ার করি ঠিকই, কিন্তু এই ফায়ার আমি নিজে থেকে করি না। স্বয়ং মা দুর্গাই আমাকে দিয়ে করিয়ে নেন। কীভাবে বন্দুক থেকে ফায়ার হয়, আমি নিজেও বুঝতে পারি না।”

কুন্ডলা গ্রামে মূলত ছোটমা, মেজোমা এবং বড়মা— এই তিনটি দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয়। তিনটি পুজোর মধ্যেই রয়েছে পারস্পরিক যোগসূত্র। তবে ঐতিহ্যবাহী বন্দুকের ফায়ারের রীতি পালন করা হয় বড়মার মন্দির প্রাঙ্গণেই। এই পুজোর আরও একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, মূল দুর্গাপুজোয় পশুবলি প্রথা নেই। সম্পূর্ণ বৈষ্ণবমতে পুজো হওয়ায় অষ্টমীর পুজোতেও বলিদান হয় না। তবে নবমীর দিন সর্বমঙ্গলা তলায় পৃথকভাবে বলির রীতি রয়েছে। পুজো উদ্যোক্তা তথা জমিদার পরিবারের বংশধর গৌতম মুখোপাধ্যায় বলেন, “প্রায় ৩০০ বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষ হাঁটুরাম প্রভুরাম এই দুর্গাপুজোর সূচনা করেন। তখন থেকেই আজ পর্যন্ত একই নিয়মে আমাদের পুজো চলে আসছে। পুজোর চার দিন পরিবারের সকলে নিরামিষ খাবার খান এবং সম্পূর্ণ বৈষ্ণব মতে পুজো হয়। এখানে কোনও বলিদান হয় না। তবে নবমীর দিন সর্বমঙ্গলা মন্দিরে পাঁঠা বলি হয়।”

সেজে উঠছে মাতৃমন্দির। ছবি - সুশান্ত পাল

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বহু কিছুই বদলে গিয়েছে কুন্ডলা গ্রামে। রয়ে গিয়েছে মহাষ্টমীর সন্ধ্যায় একটি বন্দুকের গর্জন! সেই আওয়াজেই যেন একসূত্রে বাঁধা পড়ে কুন্ডলা-সহ আশপাশের একাধিক গ্রামের শারদোৎসব। এবারও একই ভাবে উৎসবে মাততে তৈরি গোটা গ্রাম। শরৎ যে দোরগোড়ায়!

Advertisement
দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Tags :
Banglar Durga PujaDurga Puja 2026Durga Puja in West Bengal
Advertisement
Tags :
Banglar Durga PujaDurga Puja 2026Durga Puja in West Bengal

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন