মাঝরাতে ঠাকুরদালানে পড়ে রশ্মি! প্রতিপদেই শুরু আরাধনা, হুগলির ৫ শতকের পুজোর রীতি চমকে দেয়
Subhankar Patra
আজ থেকে পাঁচ শতক আগের কথা। স্বপ্নাদেশ পেলেন সীতারাম বসু। শুরু হল ঘটপুজো। এর প্রায় এক শতাব্দী পেরিয়ে সেই পুজো বদলে যায় মূর্তিপুজোয়। যা আজও অব্যাহত। মাঝের সময়ে পৃথিবী বদলেছে আমূল। তবু আজও হুগলির ‘চোদ্দো ঘর' বসু বাড়ির দুর্গাপুজো রয়ে গিয়েছে আগের মতোই।
প্রতিপদেই হয়ে যায় দেবীর বোধন। আর চণ্ডীঘট স্থাপনের পর শুরু পুজো। সেই দিনই প্রতিমাকে ডাকের সাজে সাজানো হয়। নেপথ্যের চালায় আঁকা দশম মহাবিদ্যার ছবি। ষোড়শোপচারে পুজো হয়। আসন রেখে, পা ধুয়ে, বস্ত্র, অলংকার, ধুনো দিয়ে দেবীর কৈলাস থেকে মর্ত যাত্রার ক্লান্তি দূর করা হয়। নবমী ও দশমী হয় সিঁদুর খেলা। হুগলির ‘চোদ্দো ঘর' বসু বাড়ির দুর্গাপুজোয় একাধিক চমকে দেওয়া রীতি ব্রিটিশ আসার আগে থেকে শুরু এই পুজোর এবার ৫২০ বছর।
আরও পড়ুন:
১৫০৭ সালে স্বপ্নাদেশ পান সীতারাম বসু। শুরু করেন ঘট পুজো। ১৬০৫ সালে প্রতিমার পুজো শুরু। রঘুনাথ বসু সেই দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কয়েক বছর পরে চাকরি সূত্রে তিনি ভদ্রকালী এলাকায় চলে যান। কমে পুজোর আড়ম্বর। ১৭৪৫ সালে রামনারায়ণ বসু এই পুজো আবার মহাসমারোহে শুরু করেন। একদম প্রথম দিকে ত্রিপলের ছাউনিতে পুজো হত। পরে মাটির মন্দির। তারপর হয় কাঠের মন্দির। তিন-চার পুরুষ আগে সিমেন্টের দালান তৈরি হয়েছে। এখন সেখানেই পুজো হয়।
দশমীতে নীলকণ্ঠ ও শঙ্খচিল পাখি দেখার লক্ষ্যে পরিবারের সকলে হাঁটা শুরু করেন। কিন্তু এখন সেই পাখি দু'টি প্রায় বিলুপ্ত। তাই বিকল্প পথ বেছে নিয়েছে তাঁরা। দূরে অন্য একটি গ্রামের মন্দিরে বানানো হয়েছে, নীলকণ্ঠ ও শঙ্খচিলের মূর্তি। পরিবারের লোকজন ওই বানানো পাখি দু'টি দেখেই ফেরেন।
ধনিয়াখালি হল্ট স্টেশন থেকে আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে গাড়ি করে মিনিট ১০-১৫ গেলেই 'চোদ্দো ঘর' বসু বাড়ি। গ্রামের ঢালাই রাস্তা। রাস্তার ধারে পাঁচিল ঘেরা মন্দির। ভিতরে ঢুকতেই দুটো ঘর। কিছুটা এগোলে সদর দালান। মাঝে বলির স্থান। আগে বলি হলেও এখন তা প্রায় বন্ধ। সদর দালানের পিছনে মূল মন্দির। মন্দিরের পিছনে ঘাট বাঁধানো পুকুর। টলমল করছে জল। তাতে ভাসছে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ, নীল আকাশ, তাল, নারকেল গাছের ছায়া।
ষষ্ঠীতে মায়ের বোধন শেষের পর পঞ্চপ্রদীপ, বরণ ডালা এবং চামরের বাতাসে দেবী বরণ। সেই রাতেই কলাবউ বা নবপত্রিকার স্নানের প্রস্তুতি সাড়া হয়। এখানেও রয়েছে চমক। নবপত্রিকার 'গায়ে হলুদ' করানো হয়। সপ্তমীর দিন মন্দির লাগোয়া পুকুরে পত্রিকার স্নানের পর্বটি সম্পূর্ণ হয়। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমীর পুজো পারিবারিক নিয়ম মেনে হয়। আগে এখানে মহিষ বলি দেওয়া হত। এখন বন্ধ। কিন্তু বলির সেই খড়্গ আজও অক্ষত। নবমী ও দশমী দু'দিন সিঁদুর খেলেন পরিবারের সদস্যরা।
দশমীতে নীলকণ্ঠ ও শঙ্খচিল পাখি দেখার লক্ষ্যে পরিবারের সকলে হাঁটা শুরু করেন। কিন্তু এখন সেই পাখি দু'টি প্রায় বিলুপ্ত। তাই বিকল্প পথ বেছে নিয়েছেন তাঁরা। দূরে অন্য একটি গ্রামের মন্দিরে বানানো হয়েছে, নীলকণ্ঠ ও শঙ্খচিলের মূর্তি। পরিবারের লোকজন ওই বানানো পাখি দুটি দেখেই ফেরেন।
রীতিতে যেমন চমক! তেমনই পুজো ঘিরে রয়েছে অলৌকিক কাহিনিও। পরিবারের দাবি, ঠাকুর দালানের মাঝ বরাবর কেউ ঘুমোতে পারেন না। মাঝরাতে সূর্যের প্রকাণ্ড তেজের মতো রশ্মি পড়ে মন্দিরে। বাড়ির দুই জামাই ঘুমানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন বলে দাবি।
পরিবারের সদস্য তুষারকান্তি বসু বলেন, “আমরা পুজোর নিয়মে কোনও বদল করিনি। বংশানুক্রমে চলে আসা রীতি মেনেই পুজো করা হয়। এবারও তাই হবে। পুজো আমাদের কাছে শিকড়ে ফিরে যাওয়ার সময়। দেশবিদেশে ছড়িয়ে থাকা আত্মীয়রা এক জায়গায় হই। নিষ্ঠা, আবেগ, ভালোবাসা আমাদের বেঁধে রেখেছে। পুজো আমাদের মিলনের উৎসব। সারা বছর এই দিনগুলোর অপেক্ষায় থাকি।”