সত্যজিতের শুটিং স্পট, আজও নিমতিতা রাজবাড়িতে দুর্গার মুখ উজ্জ্বল করে 'জলসাঘরে'র ঝাড়লণ্ঠন
Jaba Sen
পুজো আসছে। কুমোরটুলিতে খড় বাঁধা শুরু হলেই মুর্শিদাবাদের এক ভগ্নপ্রায় রাজবাড়ির উঠোনে যেন শঙ্খ বেজে ওঠে। সামশেরগঞ্জের নিমতিতা রাজবাড়ি। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে ধ্বংসস্তূপ, ভিতরে ঢুকলেই বোঝা যাবে, এখানে সময় থমকে আছে।
প্রায় ১০ বিঘা জমির উপর ইতালিয়ান স্থাপত্যে ১৮৫৫ সালে গৌরসুন্দর ও দ্বারকানাথ চৌধুরী যে ১৫০ ঘরের প্রাসাদ বানিয়েছিলেন, তার দেওয়ালে আজ ফাটল, ঝাড়লণ্ঠনে ধুলো। কিন্তু আজও পঞ্চমীর ভোরে যখন দেবীকে ‘থানে’ তোলা হয়, তখন মনে হয় ছবি বিশ্বাস ওই ঝাড়লণ্ঠনের নিচেই বসে আছেন। হ্যাঁ, এই বাড়িই সত্যজিৎ রায়ের জলসাঘর। এই উঠোনেই ‘দেবী’র শট, এই সিঁড়ি দিয়েই ‘সমাপ্তি’তে ছুটে গিয়েছিলেন অপর্ণা সেন। সিনেমার নস্টালজিয়া আর পুজোর নস্টালজিয়া এখানে মিলেমিশে একাকার।
আরও পড়ুন:
স্থানীয় প্রবীণরা বলেন, একসময় এখানকার পুজো ছিল জেলার সবচেয়ে বড়। ১০১ জন ঢাকি একসঙ্গে ঢাক বাজাতেন, ঢাকের আওয়াজ পৌঁছে যেত পদ্মার ওপারে। পাঁচ দিন ধরে হাজার হাজার মানুষের পাত পড়ত। জমিদার বাড়ির ভাঁড়ার থেকে চাল, ডাল, ঘি বেরোত গরুর গাড়ি করে। সে এক রাজকীয় ব্যাপার।
কালের নিয়মে জমিদারি গেছে, জাঁকজমকও কমেছে। কিন্তু নিয়মের একচুল নড়চড় হয়নি। প্রায় ৩৫০ বছর ধরে যে প্রথায় পুজো হয়ে আসছে, আজও সেই প্রথাই চলছে। এখনও একচালার প্রতিমা। আজও সেই একই কুমোর পরিবার বংশপরম্পরায় প্রতিমা গড়েন। যিনি প্রথম পুজো করেছিলেন, তাঁরই নাতি-পুতিরা আজও পুরোহিত। আর সবচেয়ে অবাক করা প্রথা, পুজোর সমস্ত জোগাড় করেন নাপিতরা। চৌধুরী পরিবারের কেউ সরাসরি জোগাড়ে হাত দেন না। এটাই দস্তুর।
পরিবারের চতুর্থ প্রজন্মের মধুছন্দা চৌধুরী বলেন, “আমাদের পুজো বৈষ্ণব মতে। তাই বলি নেই, অন্নভোগও নেই। মায়ের ভোগ হয় লুচি, পাঁচ রকম ভাজা, পায়েস, মিষ্টি দিয়ে, তাও নুন ছাড়া। এই নুন ছাড়া ভোগই আমাদের মায়ের সবচেয়ে প্রিয়।”
পুজোর ক’টা দিন বদলে যায় গোটা নিমতিতা। কলকাতা থেকে আসেন চৌধুরী পরিবারের সদস্যরা। যাঁরা আসতে পারেন না, তাঁরা ভিডিও কলে অঞ্জলি দেন। মধুছন্দা দেবী বলেন, “শরীর খারাপ থাকলেও ভিডিও কলে মায়ের মুখ না দেখলে পুজো অসম্পূর্ণ লাগে। এই দুর্গা আমাদের কাছে জাগ্রত।” ষষ্ঠীতে বোধন, সপ্তমীর সকালে বাঁশি বাজিয়ে মায়ের আরতি, অষ্টমীতে সন্ধিপুজোর সময় রাজবাড়ির সব আলো নিভিয়ে শুধু প্রদীপ জ্বলে, আর নবমীতে ধুনো পোড়া। দশমীতে পদ্মার ঘাটে বিসর্জন। তারপর আবার এক বছরের অপেক্ষা। পুজোর সময় হাজার হাজার মানুষ আসেন। কেউ আসেন সত্যজিৎ রায়ের স্মৃতি ছুঁতে, কেউ আসেন ৩৫০ বছরের পুরনো একচালার দুর্গাকে দেখতে।
২০২২ সালে হেরিটেজ তকমা পেয়েছে এই রাজবাড়ি। কিন্তু সংস্কার হয়নি। ইট খসে পড়ছে, ছাদ ভাঙছে। তবু পুজো থামেনি। কারণ নিমতিতার মানুষ বিশ্বাস করেন, রাজবাড়ি ভাঙলেও, যতদিন দুর্গা আছেন, ততদিন জলসাঘরের সানাই বাজবেই।