ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে মিশে যায় আজান, বাংলার সাড়ে ৩০০ বছরের পুজোয় অটুট সম্প্রীতি
Sayani Sen
পুজোর সন্ধ্যায় দেবীর সামনে শুরু হয় সন্ধ্যারতি। একদিকে বেজে ওঠে ঘণ্টা, শঙ্খ আর কাঁসর। আর ঠিক সেই সময়েই মন্দিরের সামনের বেদিতে বসেন এক মৌলবী। তাঁর কণ্ঠে ভেসে ওঠে আজানের সুর। পাঠ হয় কোরান। দু’টি আলাদা ধর্মীয় পরম্পরা যেন একই উঠোনে এসে মিশে যায় এক অদৃশ্য সুরে। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীর সন্ধ্যায় আরামবাগের ভালিয়া গ্রামের সরকার বাড়িতে এমন দৃশ্যই দেখা যায়। প্রায় সাড়ে তিনশো বছর ধরে চলে আসা দুর্গাপুজোর এই রীতি আজও অটুট।
সময় বদলেছে। জমিদারি প্রথা হারিয়েছে। বদলে গিয়েছে মানুষের জীবনযাত্রা। কিন্তু বদলায়নি সেই পুরনো বিশ্বাস, উৎসব সবার, আনন্দও সবার। এই ঐতিহ্যের শুরু কয়েকশো বছর আগে। পরিবারের পূর্বপুরুষ জমিদার বাবুরাম সরকার এই দুর্গাপুজোর সূচনা করেছিলেন। কথিত আছে, পুজো শুরুর পর তাঁর নজরে আসে, মুসলমান প্রজাদের অনেকেই পুজোর অনুষ্ঠানে আসছেন না। অথচ তিনি চাইতেন, তাঁর প্রজাদের প্রত্যেকেই যেন এই উৎসবের অংশ হন। সেই ভাবনা থেকেই সন্ধ্যারতির সঙ্গে আজান ও কোরান পাঠের ব্যবস্থা করেন। সেদিনের সেই ভাবনাই ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে পরম্পরা। প্রজন্ম বদলেছে, মানুষ বদলেছে, কিন্তু সরকারবাড়ির পুজোয় সেই রীতিতে কোনও ছেদ পড়েনি। আজও পুজোর তিন সন্ধ্যায় বংশপরম্পরায় এক মৌলবী এসে বসেন মন্দিরের সামনের বেদিতে। আরতির ঘণ্টাধ্বনির পাশে শোনা যায় তাঁর কণ্ঠের আজান।
আরও পড়ুন:
কোরানের আয়াত পাঠের সেই মুহূর্তে মন্দিরের ভিতরে দেবীর আরাধনা চলে আপন নিয়মে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজনের কাছেও দৃশ্যটি যেন বড় পরিচিত। কারণ, এই মিলনই তো ভালিয়ার সরকারবাড়ির পুজোর বহু বছরের গল্প। এই গল্পে কোনও বড় আয়োজন নেই। নেই কোনও জাঁকজমক। আছে শুধু কয়েকশো বছরের অভ্যাস। আছে এক জমিদারের পুরনো ভাবনা, যে ভাবনায় উৎসবের দরজা সবার জন্য খোলা থাকবে। আর সেই ভাবনাকেই আজও নিজেদের মতো করে বয়ে নিয়ে চলেছেন পরবর্তী প্রজন্ম। পুজোর চারদিন তাই সরকারবাড়ি যেন হয়ে ওঠে পরিবারের মিলনস্থলও। কর্মসূত্রে দূরে থাকা পরিবারের সদস্যরা ফিরে আসেন বাড়িতে। আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা বাড়ে। উঠোনে জমে গল্প, হাসি, আড্ডা। দেবীর আরাধনার পাশাপাশি ফিরে আসে শৈশবের স্মৃতি, পুরনো দিনের কথা, পরিবারের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত।
আর সন্ধ্যা নামলেই আবার সেই চেনা দৃশ্য। ঘণ্টা বাজে। শঙ্খধ্বনি ওঠে। প্রদীপের আলোয় আলোকিত হয় মন্দির। আর তারই পাশে মিশে যায় আজানের সুর। সাড়ে তিনশো বছর ধরে এইভাবেই চলে আসছে ভালিয়ার সরকারবাড়ির দুর্গাপুজো। হয়তো সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই বদলে যাবে। বদলাবে উৎসবের ধরন, বদলাবে প্রজন্ম। কিন্তু এই পুজোর উঠোনে পাশাপাশি বয়ে চলা দুই সুর মনে করিয়ে দেবে সম্প্রীতির গল্প। কখনও কখনও তা বেঁচে থাকে একটি পরিবারের ছোট্ট একটি রীতিতে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। আর সেই কারণেই ভালিয়ার সরকারবাড়ির দুর্গাপুজো শুধু দেবীর আরাধনা নয়, কয়েকশো বছরের একসঙ্গে পথ চলারও গল্প।