মানত করেই পুজোর কাজে অংশ, ভোগের দায়িত্বে বিধবারা, উত্তরের এই পুজোয় দশমীর পর মৎস্যমুখ
Sayani Sen
দুর্গা আরাধনার সপ্তমী থেকে নবমীতে হরেক ব্যঞ্জনায় প্রসাদীভোগ রান্নার আয়োজনে এখানে বিধরাও সামিল হন। দশমীতে দেবীমা বিসর্জনের পর ঢাকি থেকে শুরু করে বিদায় মুহুর্তের সকল সঙ্গীদের মৎস্যমুখ করিয়ে আবার স্বাভাবিক স্রোতে ফেরেন পরিবারের সদস্যরা। শতাব্দী উত্তীর্ণ রায়গঞ্জের দেবীনগরের বিবেকানন্দ পল্লির সরকার বাড়ির পুজোর (Durga Puja) জোগাড় আয়োজনে আলাদা করে কোন লোকজনকে ডাকতে হয় না। পুজোর দিনগুলোতে পাড়া পড়শির মহিলারা পুজোর যাবতীয় আয়োজনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসেন। এই ঐতিহ্য বংশ পরম্পরায় আজও অক্ষুণ্ণ রয়েছে এখানে।
তবে এই পরিবারে দেবী হৈমবতীর আগমনের সূচনা হয়েছিল কাঁটাতারের ওপারে অধুনা বাংলাদেশের (সাবেক পূর্ব পাকিস্তান) মানিকগঞ্জ জেলায় বিনোদবিহারী সরকারের হাত ধরে। শতবর্ষ পেরিয়েও নিষ্ঠা উপাচারের ধারাবাহিকতা এতবছর পরেও একচুল বিবর্ণ হয়নি। তবে ভারত স্বাধীনতার লগ্নে দেশ ভাগের বিশৃঙ্খলাময় বাংলাদেশের ভয়াবহ হামলার মুহুর্তে আকস্মিকভাবে প্রাণ হারান বিনোদ বিহারী সরকার। এই অপ্রত্যাশিত ভয়াল আবহে আতঙ্কিত হয়ে তাঁর ছেলে জন্মভিটা ছেড়ে জ্ঞানেন্দ্রনাথ সরকার প্রাণের ভয়ে পালিয়ে এপারের মালদহের রানিগঞ্জে উদ্বাস্তু হয়ে ঠাঁই হন। তবে চরম আর্থিক দৈন্যতার গ্রাসের মধ্যেই বংশের দুর্গাপুজোর ঐতিহ্যের সামান্য ছেদ ঘটেনি। তবে দেবী প্রতিমার বদলে শুধু মঙ্গলঘট বসিয়ে দেবীর প্রাণ প্রতিষ্ঠার এ এক অদ্ভুত অচেনা লড়াইয়ের মুখোমুখি হন তিনি। তবে সময়ের স্রোতে কয়েক বছরের মধ্যেই ঘুরে দাঁড়ানোর পথের সোপান খুঁজে পান। আবার একচালা মৃন্ময়ী প্রতিমা গড়ে দুর্গাপুজোর নতুন যাত্রা শুরু হয়।
আরও পড়ুন:
কিন্তু কয়েক বছর পর মালদহ থেকে অবিভক্ত পশ্চিম দিনাজপুর রায়গঞ্জে পাড়ি দেন জ্ঞানেন্দ্রনাথের পরিবার। রায়গঞ্জের দেবীনগরে র একচিলতে জায়গায় নতুন ঠিকানা হয় দেবী উমার। তারপর থেকে প্রায় পঁচিশ বছর ধরে এখানেই শরৎকালে মা দুর্গার আগমন ঘটে। সময় বদলালেও পুজোর নিষ্ঠায় উপকরণের সামান্য বদল হয়নি। কংক্রিটের ঠাকুর দালানে দেবীমাকে বরণের আয়োজনের জোর প্রস্তুতি চলছে। সপ্তমী পুজোয় সাতরকম পদের সবজি ভাজা।অষ্টমীতে আটরকম সবজির তরকারিতে দেবীমায়ের ভোগ রান্নায় সকলে স্বাগত। পাড়ার বধূদের সঙ্গে কাধে কাধ মিলিয়ে প্রসাদী ভোগের আয়োজনে দেখা যায় বিধবাদের। মায়ের কাছে যারা মানদ করেন, সকলেই দেবীর ঠাকুর দালানে পুজোর কাজে অংশ নেন। উত্তরাধিকার সূত্রে এ প্রজন্মের প্রহ্লাদ সরকারের দায়িত্বে পঁচিশ বছর ধরে এবারও দেবী আরাধনার জোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। বছর পঞ্চাশের প্রহ্লাদবাবুর কথাও,আমার বাবা বলতেন,মায়ের পুজোয় কোন ভেদাভেদ নেই। সধবা-বিধবার কোনও তারতম্য নেই। সকলের মায়ের পুজোর অধিকার আছে।" বিগত কয়েক যুগ ধরে বংশ পরম্পরায় ব্রাহ্মণ পুরোহিত পরিবারের পুজো করছেন। কুলপুরোহিত প্রদীপ চক্রবর্তী পরবর্তীতে তাঁর পুত্র বাপ্পাদিত্য চক্রবর্তী বর্তমানে বাড়ির পুজোর দায়িত্বে রয়েছেন।