দুর্গাপুজোয় নরবলি দিয়ে পাপ করেছেন রাজা! আজও 'ফল' ভুগছে বাংলার এই রাজপরিবার
Sayani Sen
মণি-মুক্তো, হিরে-জহরত। সেইসঙ্গে ১০৮ টি আকবরি স্বর্ণমুদ্রা। সাড়ে ১১ গ্রামের ওই স্বর্ণমুদ্রা মিলিয়ে ওজন প্রায় দেড় কেজি। সেই সঙ্গে দেড় মণ (৬০ কেজি) রুপোর তৈরি মায়ের চালচিত্র। আন্তর্জাতিক বাজারে যার দাম ভারতীয় মুদ্রায় কয়েক কোটি টাকা। সেই কারণেই তো সোনার মা থাকেন ব্যাঙ্কের লকারে। মহাষষ্ঠীতে আসেন পুলিশ এসকর্টে। পুজো হয় একেবারে পুলিশ পাহারায়। কিন্তু সোনায় মোড়া মায়ের পুজোয় বারবার ঘটে যায় অঘটন। আর সেই অঘটন থেকে বিপদ নেমে আসে রাজপরিবারে। এই পুজোয় নরবলি দেওয়াতেই পুরুলিয়ার জয়পুরের রাজপরিবারে দুঃসময় নেমে এসেছে। সাড়ে ৩০০ বছরের প্রাচীন এই পুজোকে ঘিরে এখন এমনই উপলব্ধি পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বর্তমানে রাজপরিবারের সদস্যের। ওই পরিবারের বরিষ্ঠ সদস্য সত্তরোর্ধ শয্যাশায়ী প্রশান্তনারায়ণ সিং দেও বলেন, "রাজা পাপ করেছিলেন। তার ফল ভুগতে হচ্ছে আমাদের। সেই জন্যই বারে বারে এই পুজোয় অঘটন ঘটছে। আর তাকে ঘিরে বিপদ নেমে এসেছে পরিবারে।"
১৬৭০ সাল থেকে খাঁড়া বা তরবারিকে সামনে রেখে শক্তির প্রতীক হিসাবে এখানে মা দুর্গার আরাধনা শুরু হয়। তখন রাজা জয় সিংহ-র আমল। মুন্ডা সর্দার খামার মুন্ডাকে হত্যা করে
ছোটনাগপুর মালভূমির এই বনাঞ্চলের দখল নিয়েছিলেন মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়নীর ধারনগর থেকে আসা ওই রাজা। খামার মুন্ডা একটি খাঁড়াকে ইস্ট দেবী হিসাবে পূজা করতেন। ফলে রাজা জয়সিংহ সেই খাঁড়াকে তাঁর গৃহে প্রতিষ্ঠা করে জয়পুর রাজত্বের পত্তন করেন। সেই অনুসারেই এই জনপদের নাম হয় জয়পুর। কথিত আছে, তাঁর সময় থেকেই মায়ের আরাধনায় শুরু হয়েছিল নরবলি! তবে তা হতো গুপ্তভাবে। পরে এই রাজপরিবারের সপ্তম রাজা জয়সিংহ-র প্রপৌত্র মদনমোহন সিংহ ওই খাঁড়ার সঙ্গে মাটির প্রতিমা তৈরি করে পুজো শুরু করেন। ওই খাঁড়াকে কলাবউ হিসাবে দুর্গার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন। এদিকে মধ্যপ্রদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত নর্মদা নদী এলাকা থেকে শিবলিঙ্গ এনে এই সাম্রাজ্যে প্রতিষ্ঠা করেন এক সাধু। নরবলি বন্ধ করার জন্য রাজার কাছে আবেদন করেন। তারপরেই বন্ধ হয় ওই নরবলি। কিন্তু সেই খাঁড়া-র পুজো আজও চলছে। হয় রাজপরিবারের বন্দুক পূজাও।
আরও পড়ুন:
তবে ১৮৬৫-৬৬ সাল থেকে এই পুজোয় ঘটতে থাকে একের পর এক অঘটন। তখন রাজা ছিলেন জয় সিংহের ষষ্ঠ পুরুষ কাশীনাথ সিং। সেই সময় পুজোয় মন্দিরে থাকা বৃহৎ পিলসুজ ( বড় প্রদীপ ) উলটে আগুন লেগে যায়। পুড়ে যায় মায়ের মাটির মূর্তি। ক্ষতিগ্রস্ত হয় মন্দিরও। তখন এই রাজপরিবারের অমঙ্গলের কথা চিন্তা করে মায়ের কাছে ধরনায় পড়েন রাজা। সেই সময় মায়ের স্বপ্নাদেশে বেনারস থেকে স্বর্ণকারদের এই রাজবাড়িতে নিয়ে এসে তৈরি হয় ওই সোনার দুর্গা। এরপর ১৮৬৭ সাল থেকে স্বর্ণময়ীর পুজো করে আসছে এই রাজপরিবার। রাজা কাশীনাথ সিংহের পর তাঁর ছেলে রাজা ভিক্ষাম্বর সিং এই পুজোর দায়িত্ব পান। কিন্তু তাঁর আমলে ১৯১৪ সালে জয়পুর এস্টেট দেনাগ্রস্থ হয়ে ব্রিটিশ সরকারের অধীনে 'ওয়ার্ডস অ্যান্ড ইনকম্বার্ড' ঘোষিত হয়। রাজার একমাত্র পুত্র যুবরাজ হরিনন্দন সিংয়ের ১৯১৮ সালে হঠাৎ অকাল বিয়োগ হয়। পুত্রশোকে রাজা ভিক্ষাম্বর পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে চোখে গ্লুকোমার কারণে অন্ধ হয়ে যান। ১৯২০ সালে তিনি মারা যান। রাজপরিবার পুরুষশূন্য হয়। এরপর রাজার জীবিত দুই রানীর মধ্যে বড়রানি রুক্মিণী দেবী এস্টেটের দায়িত্ব পান। কিন্তু তিনিও ১৯২৪ সালে মহাঅষ্টমীর দিন নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যান। ১৯৬৭ সালে বন্ধ হয় মোষ বলি।
এরপর এই পুজোয় ২০১২ সালে এক তরোয়ালের কোপে ছাগ বলি হয়নি। ফলে বেনারসের পন্ডিতের বিশেষ অনুমতিক্রমে ছাগ বলি বন্ধ হয়। কিন্তু তিনি জানান, যেহেতু তারা ক্ষত্রিয় তাই রক্ত দরকার। তাই শিঙি মাছ বলি দিতে হবে। ওই ঘটনার এক বছরের মাথায় ২০১৩ সালে শেষ রাজা বীরেন্দ্রনারায়ণ সিং দেও-র স্ত্রী কনকমঞ্জরী দেবী মারা যান। অঘটনের এখানেই শেষ নয়। ২০২২ সালে বলিকে নিয়ে আবার একই পুনরাবৃত্তি ঘটে। তবে তা আঁখ বলিকে ঘিরে। কারণ ২০২১ সালে মায়ের স্বপ্নাদেশে সমস্ত রকম প্রাণী হত্যা অর্থাৎ বলি বন্ধ হয়। তরোয়ালের এক কোপে বলি হয়নি আঁখ। ওই দিন রাতেই আবার অখণ্ড 'জাগর' প্রদীপও নিভে যায়। তখনই পুরোহিত সকলের সামনে রাজপরিবারের সদস্যদের জানিয়েছিলেন, পরিবারে কোন বিপদ নেমে আসতে পারে।
এমনকি পুরোহিত নিজেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন, তার পরিবারের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে। পুজো শেষের প্রায় ১৫ দিনের মাথায় মারা যান এই রাজপরিবারের সেজো ছেলে শংকরনারায়ণ সিং দেও। এই প্রয়াণের সাড়ে পাঁচ মাসের মধ্যে এই রাজপরিবারের মেজ ছেলে প্রণবকুমার সিং দেও মারা যান। এমনকি পুরোহিতের স্ত্রীও শয্যাগতা হন। বর্তমানে এই রাজপরিবারের বরিষ্ঠ সদস্য প্রশান্তনারায়ণ সিং দেও বলেন, "পরিবারে যে বিপদ আসছে তা ওইদিনই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন মা। ইশারাতেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বিপদের কথা। আমি মায়ের সেই ইশারা বুঝে মন্দিরেই পরিবারের সবাইকে বলে দিয়েছিলাম আমাদের সামনে বড় বিপদ!" এই কথা ঠাকুরদালানে বসে বলতে বলতে লোম খাড়া হয়ে যায় প্রশান্তনারায়ণের। মাথা চাপড়ে বলতে থাকেন, "নরহত্যা তো পাপ!"