হিন্দু বাড়ির দুর্গা নিরঞ্জনের দায়িত্বে মুসলমানরা, হয় না মহাষষ্ঠী, বাংলার এই পুজোর প্রতিমাতেও রয়েছে চমক
Sayani Sen
হিন্দু, মুসলমান বিভেদ নয়। নদিয়ার চাপড়ার সুটিয়ার ব্রহ্মবাড়ির পুজো যেন প্রকৃত অর্থেই ধর্মনিরপেক্ষ। হিন্দু বাড়ির দুর্গার নিরঞ্জনের দায়িত্বে মুসলমানরা। এখানে হয় না মহাষষ্ঠীর আচার। পুজো শুরু হয় মহাসপ্তমীতে। প্রতিমাতেও রয়েছে চমক। সময়ের সঙ্গে বদলেছে চারপাশ। তবে বদলায়নি নিয়মকানুন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২৭০ বছর আগে ব্রহ্ম পরিবারের জমিদার লক্ষীকান্ত ব্রহ্ম এই পুজোর সূচনা করেন। সে সময় বাংলার নবাব ছিলেন মুর্শিদকুলি খাঁ। ব্রহ্ম পরিবারের মূল ব্যবসা ছিল সুতোর। সেই ব্যবসার সূত্রেই গ্রামের নাম হয় ‘সুতিয়া’, যা পরবর্তী সময়ে ‘সুটিয়া’ নামে পরিচিতি পায়। পুজোর সূচনার কাহিনিও বেশ অন্যরকম। ষষ্ঠীর দিন খাজনা দেওয়ার জন্য জলঙ্গী নদীপথে নৌকায় কৃষ্ণনগরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন লক্ষীকান্ত ব্রহ্ম। বড় আন্দুলিয়া ঘাট থেকে নৌকায় ওঠার পর ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। নৌকা যখন নাকাশিপাড়ার মোটাবহিরগাছি ঘাটে পৌঁছয়, তখন স্বপ্নে তিনি শুনতে পান - “পাশের কাশবনে আমি পড়ে আছি, আমাকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠা করো।”
আরও পড়ুন:
স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার পর আর দেরি করেননি লক্ষীকান্ত। মাঝিকে নৌকা থামানোর নির্দেশ দেন। ঘাটে নৌকা ভেড়ার পর আশপাশের কাশবনে খোঁজ করে তিনি একটি দুর্গাপ্রতিমা দেখতে পান। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, একটি বাড়িতে পুজোর জন্য প্রতিমাটি আনা হয়েছিল। কিন্তু ওই বাড়ির ছেলে সাপের কামড়ে মারা যাওয়ায় ষষ্ঠীর দিন প্রতিমাটি বিসর্জন না দিয়ে ঘাটের ধারে রেখে যাওয়া হয়েছিল। এরপর সেই প্রতিমাই নৌকায় তুলে বাড়িতে নিয়ে আসেন লক্ষীকান্ত ব্রহ্ম। শুরু হয় ব্রহ্মবাড়ির দুর্গাপুজো। যেহেতু ষষ্ঠীর দিন পেরিয়ে যাওয়ার পর প্রতিমা বাড়িতে আনা হয়েছিল, তাই সেই সময় থেকে আজও এই পুজোয় ষষ্ঠীর কোনও আয়োজন হয় না। পুজোর সূচনালগ্নের সেই ঘটনাই যেন পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হয়ে উঠেছে একটি বিশেষ রীতি।
আরও একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে এই পুজোয়। দেবী দুর্গা সাধারণত দশভূজা রূপে পূজিত হলেও ব্রহ্মবাড়ির প্রতিমা দ্বিভূজা। প্রাচীন সেই রীতিই আজও ধরে রেখেছে পরিবার।
একসময় সুটিয়া গ্রামে এটিই ছিল একমাত্র দুর্গাপুজো। পুজোর দিনগুলিতে জাতি-ধর্মের বিভাজন ভুলে গ্রামের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ ব্রহ্মবাড়িতে এসে উৎসবে শামিল হতেন। সেই পরম্পরা এখনও অটুট। পুজোর অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হল প্রতিমা নিরঞ্জন। আজও ব্রহ্মবাড়ির দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জনের মূল দায়িত্ব পালন করেন মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষেরা। শুধু পুজো নয়, ব্রহ্মবাড়ির এই উৎসব পরিবারের কাছেও মিলনের উপলক্ষ।
পুজোর কয়েকটি দিনে পরিবারের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সদস্যেরা একত্রিত হন। পুজোর আয়োজনের পরিশ্রম ও ক্লান্তি তখন ছাপিয়ে যায় আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা হওয়া এবং একসঙ্গে উৎসব পালনের আনন্দ। প্রায় আড়াই শতকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সুটিয়ার ব্রহ্মবাড়ির দুর্গাপুজো শুধু একটি পরিবারের ধর্মীয় আচার হয়ে থাকেনি। স্বপ্নাদেশে পাওয়া প্রতিমাকে ঘিরে শুরু হওয়া সেই পুজো আজও বহন করে চলেছে প্রাচীন ইতিহাস, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং বাংলার গ্রামীণ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক দীর্ঘ পরম্পরা।