দেবীপক্ষমহানগররাজ্যবিদেশখেলালাইফস্টাইল
Durga Puja in panagarh

ঔরঙ্গজেবের আমলে শুরু, ৩৩৪ বছর আগে পানাগড়ে দুর্গার কাঠামো দেখে রাস্তা ছাড়েন স্বয়ং রাজা!

সোঁয়াই গ্রামকে আর পাঁচটা গ্রাম থেকে আলাদা করেছে এখানকার বিখ্যাত মুখোপাধ্যায় পরিবারের দুর্গাপুজো।
Jaba Sen
08:23 PM Sep 27, 2026 IST
সোঁয়াই গ্রামকে আর পাঁচটা গ্রাম থেকে আলাদা করেছে এখানকার বিখ্যাত মুখোপাধ্যায় পরিবারের দুর্গাপুজো।
মুখোপাধ্যায় বাড়ির দুর্গা ঠাকুর। নিজস্ব ছবি।

বর্ধমানের পানাগড়ের সোঁয়াই গ্রাম। গ্রামটাকে আর পাঁচটা গ্রাম থেকে আলাদাই করেছে এখানকার বিখ্যাত মুখোপাধ্যায় পরিবারের দুর্গাপুজো। পুজোর শুরু আজ থেকে ৩৩৪ বছর আগে। তারও আগে বর্ধমানের ফরিদপুরে এই পরিবারের দুর্গাপুজো হত। সেই ইতিহাস এখন কালের গর্ভে হারিয়ে গিয়েছে। তবে যে ইতিহাস এখনও সদর্পে বেঁচে আছে তা হল মুখোপাধ্যায় বাড়ির ৩৩৪ বছরে পা দেওয়া দুর্গাপুজো।

সোঁয়াই গ্রামে যখন এই পুজোর সূত্রপাত হয় তখন দিল্লির মসনদে বসে আছেন ঔরঙ্গজেব। সময়টা ইংরাজি ১৬৯৩ খ্রিস্টাব্দ। বাংলার ১১০০ সন। সেই সময়ে বর্ধমানের সোঁয়াই গ্রামে থাকতেন মুখোপাধ্যায় পরিবারের পূর্বপুরুষ বাসুদেব মুখোপাধ্যায়। তিনি আদপে ছিলেন ফরিদপুরের মানুষ। কিন্তু টোল-এ পড়াশোনা করতে তাঁর সোঁয়াই গ্রামে আসা। তারপর এই গ্রামেরই মেয়েকে বিয়ে করে এখানে থাকতে শুরু করেন। এই বাসুদেব মুখোপাধ্যায় একদিন হঠাৎ স্বপ্নাদেশ পান। স্বপ্নাদেশে মা দুর্গা তাঁকে বলেন তিনি অপূজিত অবস্থায় ফরিদপুরে পড়ে আছেন। এই স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর আর সময় নষ্ট করেননি বাসুদেববাবু। তিনি তাঁর ৩ পুত্র ও পরিবারের অন্যদের নিয়ে সোজা চলে যান বাকলসার কাছে ফরিদপুরে তাঁর পৈতৃক ভিটেয়। তারপর তাঁরা পারিবারিক দুর্গার কাঠামো কাঁধে তুলে সোঁয়াই গ্রামের দিকে পা বাড়ান।

Advertisement
দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

প্রায় সোঁয়াই গ্রামের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন তাঁরা। সেই সময় রাস্তার উলটোদিক থেকে বর্ধমানের মহারাজা ভ্রমণ সেরে ফিরছিলেন। রাজা যে পথে যাবেন সেই পথ দিয়ে কারা এভাবে আসছে তা দেখতে রাজার পাইক, বরকন্দাজ ছুটে যান। তাঁরা বাসুদেব মুখোপাধ্যায়কে রাস্তা ছেড়ে সরে দাঁড়াতে বলে। কিন্তু বাসুদেববাবু জানিয়ে দেন মায়ের কাঠামো নিয়ে তাঁরা রাস্তা ছাড়বেন না। বরং রাজা সরে দাঁড়ান। মা যাবেন। কীসের এত হাঙ্গামা তা জানতে রাজা এবার স্বয়ং এগিয়ে আসেন। ধর্মপ্রাণ রাজা যেই শোনেন যে মা দুর্গার কাঠামো যাচ্ছে তিনি তৎক্ষণাৎ রাস্তা ছেড়ে সরে দাঁড়ান।

সেখানেই শেষ নয়, এই পুজো যাতে ধুমধাম করে হতে পারে সেজন্য মুখোপাধ্যায় পরিবারকে প্রচুর জমি, পুকুর, সম্পত্তি দান করেন। সে বছরই সেই কাঠামোয় মাটি লেপে তাতে রং করে প্রতিমাকে মৃন্ময়ী রূপ দেওয়া হয়। শুরু হয় পুজো, সেই যে পুজো শুরু হয়েছে তা আজও অমলিন। এ বছর ৩৩৪ বছরে পা দিল এই মুখোপাধ্যায় বাড়ির পুজো। আজও চিরাচরিত রীতি মেনে, পুরনো পারিবারিক পুঁথি মেনে হয় পুজো।

গ্রামের সকলকে নিয়ে হয় ভোগ প্রসাদ খাওয়া। এই পুজো বংশানুক্রমিকভাবে এগিয়ে চলেছে। মুখোপাধ্যায় পরিবারের পুজোয় বলি আজও চলে আসছে। পুজোয় ছাগ বলি, আখ বলি তো হয়ই। সেইসঙ্গে এই পরিবারে মোষ বলির রীতিও রয়েছে। এখনও প্রতি বছর মহানবমীতে মোষ বলি হয়। বলির পর মোষটি নিয়ে স্থানীয় আদিবাসীরা চলে যান। এটাই চলমান রীতি। পরিবারে পুজোর ৩ দিন একটি মহাপ্রদীপ প্রজ্বলিত থাকে। যা গব্য ঘৃত দিয়ে জ্বালিয়ে রাখা হয়। প্রদীপের দীপশিখা কখনও নিষ্প্রদীপ হয় না এই ৩ দিনে। প্রতিদিন এই প্রদীপকে নিরন্তর জ্বালিয়ে রাখার দায়িত্ব পড়ে পরিবারের এক এক জন সদস্যের উপর। পুজো পারিবারিক হলেও পুজোয় গ্রামের সকলকে শামিল করার রীতি এ পরিবারের পূর্বপুরুষদের স্থির করা। ফলে পুজোর দিনগুলোয় সোঁয়াই গ্রাম তো বটেই আশপাশের গ্রামের মানুষও হাজির হন। পুজো দেখেন, আরতি দেখেন, ভোগ খান। এ পরিবারে পাত পেড়ে সকলকে অন্নপ্রসাদ খাওয়ানো শত শত বছর ধরে চলে আসছে। পুজোর দিনগুলোয় সকলে মিলে একসঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠাই এর প্রধান লক্ষ্য।

মহাষষ্ঠীর দিন এই পুজো শুরু হয় কল্পারম্ভ দিয়ে। তারপর পুজোর দিনগুলোয় ষোড়শ উপচারে পুজো হয়। স্থানীয় মহাদেব মন্দির বিদ্যেশ্বর বাবার তাঁতপুকুর থেকে নবপত্রিকা স্নান করিয়ে আনা হয়। নবপত্রিকা আসে পালকিতে। মহাষ্টমীর সন্ধিপুজোয় সবচেয়ে বেশি ভিড় জমে। ৬ বস্তা আতপ চালের মহারাস নৈবেদ্য সহযোগে সন্ধিপুজো সম্পন্ন হয়। মহানবমীতে হয় মোষ, মেষ, ছাগ, আখ ইত্যাদি বলি। তার আগে মহাসপ্তমী ও মহাষ্টমীতে ছাগ বলি হয়ে থাকে।

এ পুজোয় বিসর্জনেও প্রচুর মানুষের সমাগম হয়। বিসর্জন হয় মুখোপাধ্যায় পরিবারের বাড়ি সংলগ্ন একটি পুকুরে। ধুমধাম করে হয় বিসর্জন। বিসর্জনের পর তুলে আনা হয় মায়ের কাঠামো। রেখে দেওয়া হয় সযত্নে। পরের বছর ফের তাতে খড় বাঁধা হয়, মাটি পড়ে, রঙের প্রলেপ পড়ে। ফের আসে পুজো। ফের মুখোপাধ্যায় পরিবার মেতে ওঠে পুজোর আনন্দে। মেতে ওঠে গোটা সোঁয়াই গ্রাম। সময়ের সরণী বেয়ে যুগ বদলাতে থাকে। কিন্তু বদলায় না এ পরিবারের আবহমান রীতি মেনে পুজোর দিনগুলো। এমন বনেদি পুজো বাংলার বহমান ইতিহাস হয়ে বেঁচে থাকে যুগের পর যুগ।

Advertisement
দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Tags :
Banglar Durga PujaDurga Puja 2026Durga Puja in West BengalPanagarhwest bengal durga puja
Advertisement
Tags :
Banglar Durga PujaDurga Puja 2026Durga Puja in West BengalPanagarhwest bengal durga puja

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন