নবমীতে 'শত্রু বলি', কোন শঙ্কায় আজও কাঁচা মাছ-আনাজে দেবীর ভোগ দেয় ঝাড়গ্রামের এই পরিবার?
Jaba Sen
বর্গির হানার ভয়ে একসময় ঠাঁইনাড়া হতে হয়েছিল সেনগুপ্ত পরিবারের পূর্বপুরুষদের। পুজোর আয়োজন করতে হয়েছিল গোপনে। রান্না করে দেবীকে ভোগ দেওয়ার সুযোগও ছিল না। তাই কাঁচা আনাজ, চাল, ডাল ও মাছ দিয়েই চলেছিল দেবীর আরাধনা। সেই সময়ের স্মৃতি আজও বহন করে চলেছে ঝাড়গ্রাম শহরের বাছুরডোবার সেনগুপ্ত পরিবারের ‘রজনী কুটির’-এর দুর্গাপুজো। কয়েক শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও বদলায়নি সেই রীতি।
সেনগুপ্ত পরিবারের এই পুজোর শিকড় অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুর জেলার বান্ধব-দৌলতপুরে। পরিবারের পূর্বপুরুষ ও প্রখ্যাত কবিরাজ রামগতি সেনগুপ্ত এই পুজোর সূচনা করেছিলেন বলে পরিবারের দাবি। প্রায় সাড়ে তিনশো বছর ধরে চলে আসছে সেই পুজো। বর্গি হামলার সময়ে পুজো করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছিলেন পরিবারের পূর্বপুরুষেরা। হামলার আশঙ্কায় তাঁদের ঠাঁইনাড়া হতে হয়। সেই সময় রান্না করার সুযোগ না থাকায় কাঁচা আনাজ ও মাছ দিয়েই দেবীকে ভোগ নিবেদনের রীতি শুরু হয়। পরে সেটিই পারিবারিক প্রথায় পরিণত হয়।
আরও পড়ুন:
দেশভাগের পরে সেনগুপ্ত পরিবারের সদস্যেরা পূর্ববঙ্গ ছেড়ে ঝাড়গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন। বাছুরডোবায় তৈরি হয় তাঁদের বসতবাড়ি ‘রজনী কুটির’। ১৯৪৮ সাল থেকে সেখানে শুরু হয় পারিবারিক দুর্গাপুজো। পূর্ববঙ্গের পুজোর সেই পুরনো রীতিও চলে আসে ঝাড়গ্রামে।
রজনী কুটিরের পুজোয় দেবীর সামনে সাজিয়ে দেওয়া হয় চাল, ডাল এবং নানা ধরনের কাঁচা আনাজ। আলু, ফুলকপি, বেগুন, মুলো, কাঁচকলার মতো আনাজ থাকে নিবেদনে। কাঁচা মাছেও নুন-হলুদ মাখিয়ে তা দেওয়া হয় দেবীকে। নিবেদনের পরে সেই ভোগ পরিবারের সদস্যেরা গ্রহণ করেন না। তা ব্রাহ্মণকে দান করা হয়।
প্রতিমার বিন্যাসেও রয়েছে বিশেষত্ব। একচালার প্রতিমায় লক্ষ্মীর পাশে কার্তিক এবং সরস্বতীর পাশে গণেশ থাকেন। নবমীতে রয়েছে ‘শত্রু বলি’র রীতিও। চালের গুঁড়ি দিয়ে মানুষের অবয়ব তৈরি করে প্রতীকী বলি দেওয়া হয়। বর্গির আতঙ্কে যে রীতির জন্ম, সময়ের স্রোতে আজ সেটিই হয়ে উঠেছে রজনী কুটিরের দুর্গাপুজোর স্বতন্ত্র পরিচয়। ইতিহাসের সেই স্মৃতি আঁকড়ে ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই নিয়মে দেবীর আরাধনা করে চলেছে সেনগুপ্ত পরিবার।