বলির রক্ত নালা বেয়ে মিশত কাঁসাই নদীতে! সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দুর্গাপুজোয় অনন্য পাথরা
Sucheta Sengupta
অখ্যাত গ্রাম, মন্দির ঘেরা। সময়ের গায়ে ঘষটানি খেয়ে সেসব মন্দির আজ ভগ্নপ্রায়। তবে শেষ হতে হতেও তা শেষ হয়নি। বরং সেই সময়ের হাত ধরেই ফিরে পেয়েছে হৃত গৌরব। মেদিনীপুর সদর ব্লকের সেই অখ্যাত গ্রাম পাথরার জীর্ণ মন্দিরগুলিকে যিনি ফের আলোয় ফিরিয়েছেন, তাঁর নাম ইয়াসিন পাঠান। এলাকারই বাসিন্দা। সেই ইয়াসিনের হাত ধরে পাথরার দুর্গাপুজো হয়ে উঠেছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন। পুজো এখানে অনাড়ম্বর অথচ নিখাদ আনন্দে ভরা এক অনুষ্ঠান। আর তাই পাথরার পুজো ব্যতিক্রমী ও বিখ্যাত।
বছরের পর বছর ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নিদর্শন পাথরার পুজো। মেদিনীপুরের অখ্যাত গ্রাম পাথরা আজ বিখ্যাত হয়েছে ঐতিহাসিক মন্দিরের মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য। এই পাথরা এখন জেলার অন্যতম এক পর্যটনকেন্দ্রও। এখানকার লুপ্তপ্রায় মন্দিরগুলি সংস্কারে উদ্যোগী হয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ধারা বহন করে রাষ্ট্রপতি পুরস্কারও পেয়েছেন এলাকার বাসিন্দা ইয়াসিন পাঠান নামে এক মুসলিম ব্যক্তি। তাই পাথরার পুজোতেও বরাবর থাকে সম্প্রীতির ছাপ। এলাকা তথা আশপাশের গ্রামের হিন্দু ও মুসলিম সকলেই অংশ নেন এই পুজোয়।
আরও পড়ুন:
পাথরার পুজো ঘিরে বেশ রোমাঞ্চকর ইতিহাসও আছে। কথিত আছে, একসময় এই পাথরার পুজোকে ঘিরে আলোড়ন পড়ে যেত সারা তল্লাটে। দুর্গতিনাশিনীকে শান্ত করতে বলির রক্ত নালাপথ বেয়ে নদীর জলে না পৌঁছনো পর্যন্ত বিরাম ছিল না। সেই পুজো মাঝখানে বন্ধ হয়ে যায়। ফের পুজো শুরু হয় গ্রামবাসীদের উদ্যোগেই। পাথরার অবলুপ্তিমুখী মন্দিরগুলির গবেষণা করতে গিয়ে ইয়াসিন জানতে পারেন যে এলাকার ঘোষাল পরিবারের নিত্যানন্দ ঘোষাল মুঘল রাজত্বে নবাব আলিবর্দি খাঁ-র আমলে রতনচক পরগনার নায়েব হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। নিত্যানন্দবাবু মারা যাওয়ার পর পরবর্তীকালে তাঁর ছেলে বিদ্যাধর ঘোষাল নায়েব নিযুক্ত হয়েছিলেন। নবাবদের কাছ থেকে জমিদারিত্ব জুটেছিল তাঁর। তখনই তিনি ‘মজুমদার’ উপাধি লাভ করেন। সেই থেকেই ঘোষাল পরিবার মজুমদার পরিবারে পরিণত হয়।
এলাকার জমিদার ওই মজুমদার পরিবারই মহা ধুমধামের সঙ্গে ওই পুজো শুরু করেন। জানা গিয়েছে, প্রাচীন ওই পুজোর বৈশিষ্ট্যই ছিল পাঁঠা ও মহিষ বলি। দুর্গামন্দিরের যে স্থানটি বলি দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট করা ছিল সেখান থেকে দক্ষিণ দিক বরাবর একটি নালা তৈরি করা হয়েছিল সরাসরি কাঁসাই নদী পর্যন্ত। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, বলির রক্ত যতক্ষণ পর্যন্ত না ওই নালাপথ বেয়ে নদীর জলে গিয়ে মিশত, ততক্ষণ বলি বন্ধ হত না। একের পর এক চলতে থাকত মহিষ ও পাঁঠার বলি। শতাধিক বলি হত সেসময়। ফলে এলাকাবাসীর কাছে ওই ড্রেনটি ‘রক্তনালা’ হিসেবেই পরিচিতি লাভ করেছিল। আশপাশের বহু মানুষই মানত করতেন সেখানে। পরবর্তীকালে সেই পুজো বন্ধও হয়ে যায়। প্রায় দুশো বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ ছিল পুজো।
এখন আর জমিদার পরিবারের চিহ্নও নেই। বহু বছর আগেই তাঁরা অন্যত্র পাড়ি দিয়েছেন। বর্তমানে ওই পরিবারের কোনও উত্তরসূরিও এ তল্লাটে নেই। বেশ কয়েকবছর আগে পর্যন্ত বলির খড়্গটিকে দেখা গেলেও আজ তা উধাও। তবে মাটির নিচে এখনও তার স্মৃতি বহন করে চলেছে রক্তনালা। এখনও মাটি খুঁড়লে তার অস্তিত্ব পাওয়া যাবে। আর আছে ভগ্নপ্রায় মন্দিরের পরিকাঠামো ধ্বংসাবশেষ। বড় বড় পাথরের চাঁই দিয়ে চারপাশ ঘেরা মন্দিরের পরিকাঠামো আজও স্মৃতিতে ঘেরা। এবারের পুজো কমিটির সভাপতি চন্দ্রশেখর ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, পুজোকে ঘিরে তারা নানারকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করে থাকেন। সর্বধর্ম সমন্বয়েই তাঁদের পুজো আজ অন্য এক মাত্রায় পৌঁছে গিয়েছে।