ভিক্ষাপাত্র দমাতে পারেনি পড়াশুনোর অদম্য জেদ, স্টেশনেই বাড়ছে ‘দুর্গার বিদ্যাসাগর’
Utsa Tarafdar
‘কী তোমার গোত্র পরিচয়?’ ভিন্ন শৈলীতে উপনিষদের সত্যকামের কথা বলেছিলেন কবি শঙ্খ ঘোষ! তাঁর কলমে উঠে এসেছিল পিতৃপরিচয়হীন এক ‘নির্জন রাখালে’র অদম্য জেদের কথা! বাস্তবের গল্প এমনই এক নির্জন রাখালের। অথবা তাকে বলা চলে ‘কলকাতার যিশু’, যার ঠিকানা রেলওয়ের স্যাঁতসেঁতে সাবওয়ে।
গোত্র পরিচয় নিয়ে সে-ও পেতে চায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা! জীবনের পথে অনেক দূর এগোতে চায় দীপ! স্কুলে ভর্তি হতে পারেনি, তবু মনে মনে নিত্য জল ঢালে স্বপ্নের গাছের গোড়ায়।
আরও পড়ুন:
হকার উচ্ছেদ পথে বসিয়েছে, দাবি করেন ওঁরা। স্টেশনের ‘অবৈধ’ চায়ের দোকানের কাজ হারিয়ে সুদূর রিষরা থেকে শিয়ালদহ ডিভিশনের এক ভিড়ে ঠাসা স্টেশনে আসেন ওর মা। আর সেখানেই কখনও আনমনে আঁকিবুকি, আবার কখনও অ, আ, ১, ২ লিখে কল্পনায় ঝড় তোলে একরত্তি। তার কিছুতেই ভয় নেই! ভিড়, আওয়াজ, তাড়া, সবকিছু উপেক্ষা করে স্বপ্নে বিরাট উপন্যাস লেখে সে।
সীমা দাসের দুই সন্তান, এক কন্যা, এক পুত্র। পুত্র দীপ, বয়স মেরেকেটে ৫-৬ হবে! স্কুলে ভর্তি হওয়া হয়নি এখনও। দুরন্ত ঘূর্ণিপাকের মতো চঞ্চল মনের নিষ্পাপ শিশু মায়ের ভিক্ষাবৃত্তি দেখে শুধু! যে মা কয়েকদিন আগেও নাকি স্টেশনের চায়ের দোকানে কাজ করত, সেই মাকেই সন্তান নিয়ে বসে থাকতে হয়, ধুলোমাখা কটূ গন্ধে ভরপুর এক সাবওয়েতে! তাড়া খেয়ে সরে যেতে হয় মাঝে মাঝেই!
স্বামীর খুব সামান্য রোজগারে দিন চলে না আর! কেউ খারাপ বলেন, কেউ পাত্তাও দেন না! ছেলে কেন স্কুলে নয়, শুনতে হয় সীমাকে! তবুও সীমা আসেন। কয়েক দিন সকালে কয়েক ঘণ্টা স্টেশনে কাটিয়ে ফিরে যান ভাড়া বাড়িতে। সবটাই গোপন রাখেন যদিও! পাছে কেউ তাড়িয়ে দেন!
সীমা বলছেন, "ছেলেটাকে এবারই স্কুলে ভর্তি করব। ও লোকজন ভালোবাসে। খুব দুরন্ত, তাই চোখে চোখে রাখব বলে নিয়ে আসি সঙ্গে করে। লজ্জা করে ভিক্ষা চাইতে। ছেলে নিজের মনে পড়াশোনা করে, আঁকে! ওকে কখনও বলি না ভিক্ষা শেখ! ও এসব বোঝেও না!" স্টিলের চায়ের গ্লাস হাতে রুগ্ন মায়ের দাবি, "স্টেশনে একটা চায়ের দোকানে কাজ করতাম। দোকান তুলে দেওয়ার পরে কাজ নেই। মাঝে মাঝে যা পাই করি। কিন্তু স্টেশনে আসি, বসি। যদি কিছু আয় হয়। কাজ করতে হবে, ছেলেটাকে স্কুলে পড়ানোর ব্যবস্থা করতেই হবে!" যেন সন্তানকে আগলে রয়েছেন গণেশজননী (Durga Puja 2026)।
ভয় আছে, আবার ছোট্ট দীপের আছে জয়ের ইচ্ছা! তার অনুভূতিতে রয়েছে শুধুই এগিয়ে যাওয়ার কথা। সীমা ঠিক বলছেন কী বলছেন না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে! কেন তিনি এখানে? দীপকে নিয়ে কী করছেন? সত্যিই কী করতেন, আমরা জানি না! কিন্তু অস্পষ্ট স্বরের অভ্যন্তরেও লুকিয়ে যেন জীবনশক্তির কথা, যা শুধু বলে যায়, ‘ফিরে যাব ঘরে/যখন সহস্র পূর্ণ হবে!’