'ছেলেকে কেড়ে নিলি মা, এবার...?' পুজো এলেই চোখের জল বাঁধ মানে না পূর্ণিমার
Arpita Mondal
ঢাকের বোল কানে এলেই বুক ফেটে যায়। এত আলোর মাঝেও গিলে খেতে আসে শূন্যতা। চারিদিক ঝলমল করলেও অন্ধকার নামে পূর্ণিমার জীবনে। হোমগার্ড ছেলের সাদাকালো ছবি বুকে নিয়ে প্রতিমার দিয়ে তাকিয়ে থাকেন আনমনে। আর একরাশ ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, 'একটা ছেলেকে কেড়ে নিলি...তোর পুজো চালাবে কে?' একসময় নিজের বেতনের বেশিরভাগ টাকাই মায়ের পুজোর জন্য দিয়ে দিত ছেলে। পুজো এলেই ব্যস্ত হয়ে উঠত নারায়ণ রায়। পুজোর আয়োজন থেকে অন্নকুট সবকিছুতেই ছিল তাঁর হাত। পরিবারের মুখে হাসি ফুটবে, পুজোয় যেন কোনও খামতি না থাকে, সেটাই ছিল তাঁর আনন্দ। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস। ভয়াবহ পথ দুর্ঘটনায় প্রাণ কেড়ে নেয় রাজ্য পুলিশের হোমগার্ড নারায়ণের।
দুর্গাপুরের কাঁকসার রক্ষিতপুরের বাসিন্দা ছিলেন নারায়ণ। ২০১৭ সালের ৪ এপ্রিল কর্তব্যরত অবস্থায় কাঁকসার বিরুডিহা এলাকায় পুলিশের গাড়িতে ট্রাকের ধাক্কায় মাত্র ২৯ বছর বয়সেই থেমে যায় তাঁর জীবন। তারপর থেকে পুজো আসে। উমা আসেন। ঢাক বাজে। ধূপের গন্ধে ভরে ওঠে চারপাশ। আকাশে চাঁদ ওঠে। আলোর মালায় সেজে ওঠে মন্দির। শুধু আলো জ্বলে না পূর্ণিমার মনে। কারণ যে ছেলে নিজের বেতনের টাকা দিয়ে মায়ের পুজো সাজাত, আজ সেই ছেলের ছবিতেই ফুল দিতে হয় মাকে। পুজোর দিনগুলিতে অন্য বাড়িতে যখন আনন্দ, তখন পূর্ণিমার চোখে জমে ওঠে জল।প্রতিমার মুখের দিকে তাকিয়ে যেন খুঁজে ফেরেন তাঁর নারায়ণকে। মনে পড়ে যায় সেই দিনগুলির কথা। পুজোর কাজে ছেলের ছুটে চলা, অন্নকুটের আয়োজন, মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার ব্যস্ততা। আজ সব আছে। শুধু নেই সেই ছেলেটা। তাই ঢাকের প্রতিটি বাদ্দি যেন পূর্ণিমার বুকের ভিতর পুরনো ক্ষতটাকে আবার জাগিয়ে দেয়। মনে হয়, এই বুঝি ছেলে ছুটে এসে বলবে, "মা, পুজোর সব কাজ হয়ে গেছে।" কিন্তু সেই ডাক আর আসে না।
আরও পড়ুন:
প্রতিবছর উমা ঘরে আসে। ছেলের জন্য হু হু করে ওঠে পূর্ণিমার বুক। তিনি বলেন,"সোনার টুকরো ছেলে ছিল। একমাত্র ভরসা ছিল পরিবারের। পুজো এলেই সেজে উঠত ঘর। সে এলাকার গরিব মানুষদের হাতেও তুলে দিত নতুন বস্ত্র। পুজো এলেই অনেককে উপহার দিত। দেবী দুর্গার পুজোর জন্য নানারকম কাজকর্ম করতে। পুজো চারদিন বাড়িতেই কাটাতো। বহু মানুষকে নিমন্ত্রণ করত। কিন্তু দমকা হওয়ায় সব শেষ হয়ে যায়। সে যন্ত্রনা কি আর ভোলা যায়। মাকে বলি, ছেলেই তো আমার সম্বল ছিল, কেন কেড়ে নিলি? এবার তোর পুজো চালাবে কে?"