দেবীপক্ষমহানগররাজ্যবিদেশখেলালাইফস্টাইল
Lozenge Masi

‘চোখ দু’টো সারিয়ে দাও মা, মাঠে ফিরি’, পুজোয় একটাই প্রার্থনা ইস্টবেঙ্গলের লজেন্স দিদির

ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসে প্রিয় লাল-হলুদ রং-সহ গোটা পৃথিবীটাই ক্রমশ আবছা হচ্ছে তাঁর কাছে।
Buddhadeb Halder
07:01 PM Sep 28, 2026 IST
ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসে প্রিয় লাল-হলুদ রং-সহ গোটা পৃথিবীটাই ক্রমশ আবছা হচ্ছে তাঁর কাছে।
কারও কাছে তিনি লজেন্স দিদি। কারও কাছে লজেন্স পিসি।

“মা গো চোখদু’টো তাড়াতাড়ি ঠিক করে দাও! আমি আবার মাঠে ফিরতে চাই। খেলা দেখতে চাই। নইলে বাঁচব কী নিয়ে...?” ছোট্ট অ্যাসবেস্টসের চালের নিচে বসে কথাগুলো বলছিলেন যিনি, তাঁর পোশাকি নাম যমুনা দাস (Jamuna Das)। কিন্তু সেই নামে তাঁকে কেউই সম্ভবত চেনেন না। তাঁর যে আরেকটি পরিচয় আছে। আরেকটি নাম আছে। কারও কাছে তিনি লজেন্স দিদি (Lozenge Masi)। কারও কাছে লজেন্স পিসি। কেউ বা আবার ডাকেন লজেন্স মাসি নামে। ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা তো বটেই, গোটা ময়দানের খেলাপাগলরাই তাঁকে বিলক্ষণ চেনেন।

গত কয়েকবছর ধরেই একটু একটু করে কমে আসছিল চোখের জ্যোতি। নিজস্ব ছবি।

একচিলতে ছোট্ট ঘরটির দেওয়ালে নোনা ধরা। মেঝেতে তখনও জমে তিন-চারদিন আগে হয়ে যাওয়া বৃষ্টির জল। স্যাঁতস্যাঁতে ঘরটিতে বসে কথাগুলো বলতে বলতে কালো চশমার বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এল জল। আসলে বেশ কিছুদিন তিনি যেতে পারেননি গড়ের মাঠে। কারণ? চোখের ছানি। যার জেরে কিছুই তেমন দেখতে পাচ্ছেন না। সবই আবছা।

Advertisement
দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

লজেন্স মাসির জীবনে দু’টি রং। লাল আর হলুদ। কলকাতা হোক বা ভিনরাজ্য। ইস্টবেঙ্গলের খেলা থাকলে হয় লাল-হলুদ শাড়ি বা অন্য শাড়ির উপর লাল-হলুদ জার্সি চাপিয়ে তিনি ঠিক থাকবেন গ্যালারিতে। এটাই গত প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময়ের রীতি। কোমরের কাছে ঝোলে টাকা রাখার ব্যাগ। বাঁ হাতের ইয়াব্বড় প্লাস্টিকে ভর্তি রংবেরংয়ের লজেন্স। ‘পুরুষতান্ত্রিক’ গড়ের মাঠের ইস্টবেঙ্গল গ্যালারিতে যদি একজন মহিলাও থাকেন, তিনি লজেন্স মাসি। ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসে লাল-হলুদ রংকে নিজের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে রাখা যমুনা দাস এখন নিজের প্রাণের চেয়েও প্রিয় রং বুঝতেই পারছেন না। অবশ্য শুধু লাল-হলুদ কেন? সবকিছুই দেখছেন আবছা।

খবর প্রকাশ্যে আসতেই পাশে দাঁড়ায় ইস্টবেঙ্গল বিশ্ব। নিজস্ব ছবি।

আগরপাড়ার বিজি স্কুলের উলটোদিকের গলিতে ঢুকে তাঁর নাম বলতেই হাত তুলে বাড়ি দেখিয়ে দিলেন স্থানীয়রা। অবশ্য না বললেও চিনে নিতে অসুবিধা হত না। আশপাশের প্রায় সব বাড়িই মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। কোনওটি দোতলা। কোনওটি আবার তিনতলা। মাঝে একটাই ছোট্ট বাড়ি। অ্যাসবেস্টসের চাল। কয়েকদিন আগে হয়ে যাওয়া বৃষ্টির জল এখনও জমে ঘরের ভিতর। উঠোনে কাদা। কেন তিনি নিজের চোখের চিকিৎসা করাতে পারছিলেন না, তা যেন চিৎকার করে বলে দিচ্ছিল এই ছবিগুলিই।

গত কয়েকবছর ধরেই একটু একটু করে কমে আসছিল চোখের জ্যোতি। অবস্থা এমন হয়েছিল যে, যে কেউ ভালো করে চোখের দিকে তাকালেই তা বোঝা যাচ্ছিল। খবর প্রকাশ্যে আসতেই পাশে দাঁড়ায় ইস্টবেঙ্গল বিশ্ব। প্রত্যেকে যে যার মতো করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। মাঠের লড়াই ভুলে পাশে দাঁড়িয়েছেন বেশ কিছু মোহনবাগান সদস্য-সমর্থকও। ইতিমধ্যেই ডান চোখের ছানি কেটেছে। ডাক্তাররা সময় দিলে কাটা হবে বাঁদিকেরটাও। শরীরের এই অবস্থায় তিনি মাঠ থেকে দূরে। তবে ফুটবল কিন্তু তাঁর জীবন থেকে সরে যায়নি। সামনেই বাঙালির শ্রেষ্ঠ পার্বণ। তার আগে প্রত্যেকে যে যার মতো মায়ের কাছে নিজেদের উইশ লিস্ট তৈরি করছেন। কারও চাই নতুন পোশাক। কারও বা নামী দামি ব্র্যান্ডের মোবাইল। লাল-হলুদ রংকে আঁকড়ে থাকা মানুষটার অবশ্য ‘ডিয়ার মা’-র কাছে চাহিদা খুবই সামান্য। বলছিলেন, “আমি কখনও কারও কাছে হাত পাতিনি। সারাজীবন খেটে খেয়েছি। এখনও তাই চাই। মা দুর্গার কাছে একটাই প্রার্থনা (Durga Puja 2026)। তাড়াতাড়ি চোখদু’টো ঠিক করে দাও মা। মাঠে ফিরি। নাহলে আমি যে বাঁচব না।” একই সঙ্গে বললেন, “শুধু এখন কেন, আমার জীবনের যে কোনও কঠিন সময়ে যাঁরা পাশে থেকেছেন। সে নীতুদা থেকে শুরু করে ইস্টবেঙ্গলের বিভিন্ন কর্তা। বিভিন্ন ফুটবলার। হাজার হাজার সমর্থক। সবাইকে যেন মা ভালো রাখে, এটাই চাই।” আর নিজের জন্য? আবার বললেন, “আমার তেমন কিছু চাই না। চোখদু’টো ঠিক হয়ে যাক। মাঠে যাই। ব্যস...”

মানুষটার অবশ্য ‘ডিয়ার মা’-র কাছে চাহিদা খুবই সামান্য। নিজস্ব ছবি।

যে মানুষটা এতদিন মাঠের গ্যালারি থেকে ইস্টবেঙ্গলকে সমর্থন করেছেন, আজ তিনিই অপেক্ষা করছেন একটা দিনের জন্য। যেদিন চোখের সামনে আবার পরিষ্কার হয়ে উঠবে সবুজ গ্যালারি, লাল-হলুদ পতাকা, আর মাঠের সেই চেনা ছবি। আবার হয়তো হাতে উঠবে লজেন্সের ব্যাগ। আবার হয়তো গ্যালারি থেকে ভেসে আসবে তাঁর গলা— “ইস্টবেঙ্গল… ইস্টবেঙ্গল…”

Advertisement
দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Tags :
Durga Puja 2026East BengalKolkata
Advertisement
Tags :
Durga Puja 2026East BengalKolkata

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন