নেই পুজোর রোশনাই, ছোট্ট সন্তানকে হারিয়ে নাথ পরিবার শুধুই বিচারের অপেক্ষায়
Utsa Tarafdar
বাবা-মায়ের জীবনে আলোর উৎস হয়ে থাকে সন্তানই। সন্তান না থাকলে, অভিভাবকের জীবনে পুজোর আর কোনও গুরুত্বই বোধহয় থাকে না। আয়ুশ নাথের বাবা-মা প্রায় একযোগে বলেন এই কথা, জানান, “পুজোর কোনও অনুভূতি আমাদের নেই!” অথচ মাসকয়েক আগেও ছবির মতো সাজানো ছিল তাদের ছোট্ট সংসার।
চলতি বছরেরই মে মাসে বাঁশদ্রোণীতে স্কুল চলাকালীন অসুস্থ হয়ে পড়েছিল ক্লাস থ্রিয়ের পড়ুয়া আয়ুশ নাথ। দিনশেষে যখন পরিবারের সদস্যরা সে কথা জানতে পারেন, তখন দ্রুত শিশুটিকে ভর্তি করান হাসপাতালে। সেখানে ১২ দিন কোমায় কাটানোর পর অবশেষে তার জীবনাবসান ঘটে। দায়ী কে? স্কুল কর্তৃপক্ষের গাফিলতি নাকি অন্য কোনও গুরুতর সমস্যা? বিগত কয়েক মাস ধরে নিরন্তর সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলেছেন আয়ুশের বাবা-মা।
আরও পড়ুন:
স্কুলের শিক্ষকদের দোষ ছিলই, বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে আসে আয়ুশের মা টুম্পা নাথের গলা। এমন গালিফতির শাস্তি চেয়ে তাঁরা বারবার আবেদন জানিয়েছেন প্রশাসনের কাছে। মুখ্যমন্ত্রীর কাছেও পৌঁছেছে তাঁদের কাতর আর্তি। টুম্পা বলেন, “সময় লাগুক, কিন্তু বিচার হোক, সেটুকুর দিকে তাকিয়েই আমাদের বেঁচে থাকা।”
ঘরে রয়েছে আরও দুই সন্তান, কিন্তু প্রথম সন্তানকে কি তা বলে ভুলতে পারে মায়ের মন? “ওর মুখেই তো প্রথম ‘মা’ ডাক শোনা,” টুম্পা বলেন, “আমরা নিজেরাও জানি না কীভাবে দিন আসে-যায়। ভালো কিছু হলেই ওর কথা মনে পড়ে। মনে হয়, বিছানাতেই শুয়ে রয়েছে। কোনও কিছু কিনতে গেলে মনে হয়, ওর জন্যও কিনে নিয়ে আসি। পুজো (Durga Puja 2026) আসলে আনন্দ হত, জামাকাপড় কেনা হত। ও ঘুরতে ভালবাসত, খেতে ভালোবাসত।
এখন ছোট ছেলেকে একা স্কুলে নিয়ে যাচ্ছি। একটা হাতে ওর হাত ধরে রেখেছি, অন্য হাত শূন্য। সেই শূন্য হাত বারেবারে বুকে চেপে ধরছি। যে-হাসপাতালে ও শেষ সময় ভর্তি ছিল, সেখান দিয়ে যাওয়ার সময় বারবার ফিরে তাকাই। ছোট ছেলেকে স্কুলে রেখে আসি, ফেরত আনা পর্যন্ত আতঙ্ক হয়। সুস্থ অবস্থাতেই তো আমার বড় ছেলে হেঁটে স্কুলে ঢুকেছিল। দুই ভাই রাত অবধি গল্প করত। এক বছরের বড়, কিন্তু নিজে যা যা জানত, সব ভাইকে পড়িয়ে দিত।
“চিকেন পকোড়া, আলু ভাজা, পায়েস খেতে ভালবাসত আয়ুশ,” স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কোনওমতেই মায়ের চোখের জল বাঁধ মানে না, বলেন, “লোকের কাছে বলা সহজ হতে পারে, সন্তান চলে যাওয়া বাবা-মায়ের পক্ষে মেনে নেওয়া প্রায় অসম্ভব। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখি, ছেলেটাকে যেন দেখতে পাচ্ছি, অথচ ও একটু একটু করে দূরে চলে যাচ্ছে।”
ভাই আবেশ বলে প্রায় একই কথা, “দাদা বলত, আমি রয়েছি, ভয় পাওয়ার দরকার নেই। পুজোতে দাদার সঙ্গে ভালো কিছু খেতাম। ঠাকুরের কাছে বলব যেন দাদাকে ফিরিয়ে দেয়। লাখ লাখ টাকা হলে যদি দাদাকে ফিরিয়ে আনা যেত, তবে তাই দিতাম।”
বাবা আশিস কুমার নাথের মুখেও স্পষ্ট সে যন্ত্রণার ছাপ। দৃঢ়ভাবে বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী ও পুলিশ প্রশাসনের কাছে এই ঘটনার বিচার চাই। যাদের অবহেলার কারণে আমরা সন্তান হারালাম, তাদের প্রত্যেকের যেন যথোপযুক্ত শাস্তি হয়। আমার সন্তানের মতো অন্য কারও সন্তান যেন এভাবে অকালে ঝরে না যায়।”