ছেলে পহেলগাঁও হামলায় 'শহিদ', উমার উপরে ভরসা হারিয়েছেন সন্তানহারা মা
Utsa Tarafdar
ডান হাতে বিপত্তারিণীর লাল রঙের মোটা 'ধাগা' দেখেই কার্বাইনের গুলিতে মণীশকে ঝাঁজরা করে দিয়েছিল ওরা। স্ত্রী পেছনে তাকিয়ে দেখেন মাটিতে লুটিয়ে স্বামী। রক্তে ভেসে যাচ্ছে পহেলগাঁওয়ের বৈশরণ উপত্যকা।
তারপর? সার্জিকাল স্ট্রাইক। জঙ্গিদের ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেয় ভারত। এনআইএ পাকিস্তানের লস্কর-ই-তইবাকে দায়ী করে আদালতে চার্জশিট পেশ করে। স্বামী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের এএসপি পদমর্যাদার আইবি অফিসার মণীশরঞ্জন মিশ্র জঙ্গি হামলায় মারা যাওয়ার পর স্ত্রী জয়া মিশ্র চাকরি পেয়েছেন সেই গোয়েন্দা দপ্তরেই। বাপের বাড়ি প্রয়াগরাজে। কিন্তু বড় ছেলে মণীশকে হারিয়ে পুরুলিয়ার ঝালদার বাড়িতে এখনও বিলাপই সম্বল মায়ের, "পুরা পাকিস্তান ভি মর যায়ে। উস সে তো মেরা কুছ হোগা নেহি। মেরা বাবু তো লটকে নেহি আয়েগা!”
আরও পড়ুন:
'বাবু' আর ফিরে আসবে না বলেই ২০২৫-র ২২ এপ্রিল পহেলগাঁওয়ে সেই হামলার পর বাড়ির ঠাকুর রাখার সিংহাসনে পর্দা টেনে দিয়েছিলেন মা। জমে গিয়েছিল ধুলো-ঝুলের আস্তরণ। ওল্ড বাঘমুন্ডি রোড তথা ঝালদা পুরসভার শহিদ মণীশরঞ্জন সরণি থেকে ৭০০ মিটার দূরে চকবাজারের দুর্গা মণ্ডপ (Durga Puja 2026)। কিন্তু সেই পথে আর পা ফেলেননি আশাদেবী। কী ভাবেই বা যাবেন! ফি বছর যে দুর্গা অষ্টমীতে বড় ছেলের দেওয়া শাড়ি পরেই পুষ্পাঞ্জলি দিতেন। শহরের ডেরা বস্তিতে নবরাত্রিতে ছেলের ডান্ডিয়া নাচ দেখতেন।
ঝালদা হিন্দি হাইস্কুল থেকে অবসরপ্রাপ্ত বাবা মঙ্গলেশ মিশ্র বলছিলেন, "কত বুঝিয়েছি। বলেছি, তোমার ছেলে শহিদ হয়েছে। কত সম্মান নিয়ে মারা গিয়েছে। তুমি এবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরো।” তারপর রাখিপূর্ণিমার দিন থেকে আবার আগের মতই পূজাপাঠ শুরু করেন পঁয়ষট্টির আশাদেবী। মণীশের প্রিয় পায়েস রান্না করে কৃষ্ণর চরণে নিবেদনও করেন। মায়ের কথায়, “ঈশ্বরের প্রতি, মা দুর্গার প্রতি শ্রদ্ধা রয়েছে। কিন্তু মন থেকে আর ভরসা জাগে না!"
রাত সাড়ে ১২ টাতেও দু'চোখ বন্ধ হয় না মায়ের। মাঝরাতে বিছানা থেকে উঠে বসে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকেন। উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ খেয়ে দুপুরেও মণীশকে স্বপ্নে দেখেন মা। কোনওদিন মাকে জড়িয়েই যেন কাঁদতে থাকে বড় ছেলে। আবার কোনওদিন তিনি মা কে বলেন, "এভাবে কষ্ট পেও না। ভুলে যাও আমাকে।” কিন্তু মা ভুলবেন কী করে! তাঁর যে বিশ্বাসই হয় না, তাঁর বাবু আর নেই! মন বলে, বাবু একদিন ঠিক বাড়িতে ফিরবে!
বাবা-মায়ের পঞ্চাশতম বিবাহবার্ষিকীতে বাড়ির সবাইকে নিয়ে সুইজারল্যান্ড যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল মণীশের। মাকে বারবার সে কথা বলত। আসলে সুইজারল্যান্ডের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য একা নয়, মা-বাবাকে নিয়ে দেখার ইচ্ছা ছিল মণীশের। কিন্তু সবই কপাল।
সে কথা মনে পড়তেই মা বলে ওঠেন, "না, এই জীবনে আর কোনও দিন ২৪ এপ্রিল বিবাহবার্ষিকী পালন করব না। দিল্লি থেকে ওই দিনই ছেলের কফিনবন্দি দেহ যে এসেছিল বাড়িতে!" বলতে বলতেই বৈঠকখানা থেকে সোজা ঠাকুরঘরে চলে যান মা। মাথা ঠুকে মা দুর্গার ছবির সামনে বলতে থাকেন, "বিপদ থেকে বাঁচতে তোমার পুজোর ধাগা-ই তো পরেছিল বাবু। কেন বাঁচালে না?"