পাহাড়তলিতে সন্ধ্যা নামে, উমা শরণে নিখোঁজ মেয়েকে আজও খোঁজেন জবারানি
Utsa Tarafdar
আজও মেয়েকে খুঁজে বেড়ান মা। ১৬ বছর ধরে সেই খোঁজার যেন শেষ নেই! দলমা পাহাড় রেঞ্জের বান্দোয়ান পাহাড়তলিতে সন্ধ্যা নামে। রাত হয়। আঁধার যত বাড়ে তত-ই যেন বাড়ে ভয়। বিছানায় কুঁকড়ে যান তিনি। চাদর টেনে কান চাপা দেন। তবুও কানের কাছে বাজতে থাকে, "দরজা খোল, আমরা বনপার্টি!” শিউরে ওঠেন জবারানি। ওরাই তো মাথার কাছে একে ৪৭ ঠেকিয়ে মেয়েকে জঙ্গলের দিকে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর থানা, পুলিশ, কেন্দ্রীয় বাহিনী, সরকার কত কী। মেয়ে আর ফিরে আসেননি। আজও নিখোঁজ পুরুলিয়ার বান্দোয়ানের লেদাম গ্রামের বাসিন্দা, রাজাহুলির অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী অনিমা বেসরা। পুলিশের খাতায় 'মিসিং কেস'।
"এবার একমাত্র ছেলেকেও নিয়ে যাবে না তো? ও যে স্পেশাল হোমগার্ড।" মা জবারানির মনের মধ্যে চলে নানা প্রশ্নের চাপানউতোর। তাঁকে বোঝায় কার সাধ্যি যে দলমা পাহাড়ের কোলে বনপার্টি আর নেই। এক এক করে গ্রেপ্তার, আত্মসমর্পণ, যৌথ বাহিনীর গুলিতে মৃত্যুর পর ওই পার্টিটাই যেন শেষ হয়ে গিয়েছে। তবুও বর্ষাশেষে পুজো এলেই আতঙ্ক যেন আরও চেপে বসে জবারানির মুখে। চোখের সামনে ভাসতে থাকে সেই হাড়হিম সন্ধ্যা।
আরও পড়ুন:
২০১০ সালের ২২ আগস্ট। ঘড়ির কাঁটা সবে সন্ধ্যা ৭টা পার হয়েছে। টিভি দেখছিলেন অণিমা। তার পাশেই বসেছিলেন মা জবারানি। আচমকাই বন্দুকের বাঁট দিয়ে দরজায় ধাক্কা দেওয়ার শব্দ। অণিমা 'কে' জানতে চাইতেই কড়া ধমক। খুলে দিতে হয় ঘরের দরজা। ঢুকে পড়ে জলপাই পোশাকের বন্দুকধারীরা।
'অণিমা কোথায়?' গণআদালত বসবে। থরথর করে কাঁপতে থাকেন মা। মেয়ে বেরিয়ে আসতেই চুলের মুঠি ধরে বাইরে টেনে নিয়ে আসে ওরা। বলতে থাকে, "সিপিএমের হার্মাদদের সঙ্গে মিশে গুলি করেছ স্কোয়াড সদস্য পুসাকে?" অণিমা প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, "তাহলে এখানেই মেরে দাও আমাকে।" ততক্ষণে পাশের বাড়ির কাকা নন্দ বেসরার ডাক পড়ে। এদিকে আর একজন লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকে ভাই জগন্নাথকে। দরজার কাছে লুটিয়ে পড়েন তিনি। কাকা-ভাইঝিকে পিছমোড়া করে বেঁধে জঙ্গলের দু'দিকে মিলিয়ে যায় বন্দুকধারীরা।
পরের দিন সকালে ওই জঙ্গলেই কাকা নন্দ বেসরার নলিকাটা মৃতদেহ উদ্ধার হয়। কিন্তু অণিমা? এই প্রশ্নের আজও উত্তর নেই পুলিশের কাছে। উত্তর কি আছে জঙ্গলমহলে 'মাওবাদ অধ্যায়' শেষ হওয়া পুলিশের হেফাজতে থাকা আকাশের কাছে?
মায়ের কোল খালি করে আজও নিখোঁজ অণিমা। লেদাম, রাজাহুলি, নান্নার গ্রামে গ্রামে এখনও মেয়েকে খুঁজে বেড়ান জবারানি। বলে ওঠেন, "ওই ঘটনার পর কতবার মা দুর্গা এসেছেন। কিন্তু মেয়ে যে আসে না! মা উমা কি শুনতে পান না আমার কথা? দেখতে পান না মনমরা মায়ের কষ্ট! মেয়েকে কি খুঁজে দিতে পারেন না?"
মায়ের এমন হাজারও প্রশ্ন আছড়ে পড়ে আরেক মায়ের কাছে! তিন কিমি দূরে যশপুরে সেজে ওঠেন মা উমা (Durga Puja 2026)। কিন্তু চোখের জল মোছে না মা জবারানির।