পথের আলোতেই পড়াশোনা একালের 'বিদ্যাসাগরে'র! মায়ের প্রার্থনা, মাধ্যমিকে ছেলের অভাবনীয় ফল
Sayani Sen
খাটিয়ায় বসে পড়াশোনায় মগ্ন 'আজকের বিদ্যাসাগর'। আর শিয়াল-নেকড়ের হাত থেকে তাকে রক্ষা করতে পাশে বসে রয়েছেন 'জীবন্ত দুর্গা'। মাথার উপর নেই বিদ্যুতের আলো। ভরসা বলতে রাস্তার ধারের পথের আলো। একদিকে জঙ্গলের আতঙ্ক। অন্যদিকে অভাবের সংসার। তবুও ছেলের পড়াশোনায় যাতে কোনও বাধা না আসে, তার জন্য দিনমজুরের কাজ সেরে প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত সন্তানের পাশে পাহারায় বসে থাকেন মা। নিজের জীবনের সমস্ত অন্ধকার সরিয়ে ছেলের ভবিষ্যৎ আলোকিত করাই তাঁর একমাত্র স্বপ্ন। এবার মা দুর্গার কাছে মায়ের একটাই প্রার্থনা, মাধ্যমিকে অভাবনীয় ফল করুক ছেলে।
প্রকাশ কিস্কু, বাঁকুড়ার ছাতনা তাঁতিরভূঁই এলাকার বাসিন্দা। বর্তমানে বাঁকুড়ার মধুবন গোয়েঙ্কা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির পড়ুয়া। ক্লাসে দ্বিতীয় স্থানাধিকারী। সামনেই মাধ্যমিক পরীক্ষা। স্বপ্ন অনেক বড় হওয়ার। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অভাব আর প্রতিকূল পরিস্থিতি। প্রকাশের বাবা বহুদিন আগেই স্ত্রী ও সন্তানকে ছেড়ে চলে গিয়েছেন। তারপর থেকেই দিনমজুরের কাজ করে একা হাতে ছেলেকে বড় করে তুলছেন মা লুধুমা কিস্কু। বর্তমানে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে এক আত্মীয়ের ভাড়াবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন তাঁরা। কিন্তু সেখানেও নেই বিদ্যুতের আলো। সন্ধ্যা নামলেই চারপাশ ঢেকে যায় অন্ধকারে। পড়াশোনার জন্য প্রকাশকে হস্টেলে থাকতে হয়। দুর্গাপুজোর আগে মায়ের কাছে ছুটি কাটাতে এসেছে সে। সামনেই মাধ্যমিক পরীক্ষা। তাই ছুটির দিনেও সময় নষ্ট করতে চায় না। বাড়িতে আলো না থাকায় শোভাপুর লাগোয়া জঙ্গলের পাশে রাস্তার ধারে খাটিয়া পেতে পড়তে বসে।
আরও পড়ুন:
কিন্তু সেই জঙ্গল থেকেই সন্ধ্যা নামলে লোকালয়ে চলে আসে শিয়াল, নেকড়ে, বিষধর সাপ, অজগর-সহ নানা বন্যপ্রাণী। তাই ছেলেকে একা ছেড়ে দেওয়ার সাহস পান না মা। সারাদিন দিনমজুরের কাজ সেরে ক্লান্ত শরীর নিয়েও ছেলের পাশেই বসে থাকেন রাত দশটা পর্যন্ত। মা লুধুমা কিস্কুর কথায়, "অভাবের সংসার। তার উপর ছেলে আমার কাছে থাকে না। হস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে। তাই শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে এখন এক আত্মীয়ের ভাড়াবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। কিন্তু সেখানে আলো নেই। ছেলেকে কষ্ট করেই পড়াশোনা করতে হয়। ছেলে খুব বুদ্ধিমান। ক্লাসে দ্বিতীয় হয়। আমি চাই, ও অনেক বড় হোক। বিদ্যাসাগরের মতো শিক্ষিত মানুষ হোক। ছেলের স্বপ্নপূরণ করতে আমি সবসময় ওর পাশে থাকতে চাই।" মা দুর্গার কাছে মায়ের একটাই প্রার্থনা, মাধ্যমিকে ছেলে এমন ফল করুক, যেন আগামীর পথে তা এক আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠে।
মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী প্রকাশ কিস্কুর কথায়,"আমি হস্টেলে থেকে পড়াশোনা করি। কিন্তু যখন বাড়িতে আসি তখন আলো না থাকায় রাস্তার ধারেই পড়তে বসি। কষ্ট তো হয় একটু। বাবা ছেড়ে চলে গিয়েছেন। আমাদের নির্দিষ্ট কোন বাড়িও নেই। তাই এভাবেই এগিয়ে যেতে হচ্ছে। তবে আমার মা সবসময় আমার পাশে থাকেন।" জঙ্গলের পাশে পথবাতির ক্ষীণ আলোয় শুধু এক মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর পড়াশোনা চলে না। প্রতিদিন লেখা হয় এক মায়ের আত্মত্যাগের কাহিনি। যে মা দিনের বেলায় দিনমজুর, আর রাতের অন্ধকারে সন্তানের স্বপ্নের প্রহরী। অভাব আর আতঙ্ককে উপেক্ষা করে ছেলের ভবিষ্যৎ গড়ার এই লড়াইয়ে তিনিই 'জীবন্ত দুর্গা'।