দেবীপক্ষমহানগররাজ্যবিদেশখেলালাইফস্টাইল
Gulliver's Travels

লিলিপুটের বামন, ব্রবডিংনাগের দৈত্য, গালিভারের সফর আজও মজার এবং অস্বস্তির

শাসকের রোষ এড়াতে বইটি ১৭৩৫ সালের সংস্করণের আগে পর্যন্ত প্রকাশিত হত বেনামে– দীর্ঘ শিরোনামে লেখা থাকত ভ্রমণ কাহিনির কথকের নাম– ‘লেমুয়েল গালিভার’। কিন্তু শিশুসাহিত্যই যদি হবে, শাসক-রোষের প্রশ্ন কেন তবে?
Amit Kumar Das
02:37 PM Oct 04, 2026 IST
শাসকের রোষ এড়াতে বইটি ১৭৩৫ সালের সংস্করণের আগে পর্যন্ত প্রকাশিত হত বেনামে– দীর্ঘ শিরোনামে লেখা থাকত ভ্রমণ কাহিনির কথকের নাম– ‘লেমুয়েল গালিভার’। কিন্তু শিশুসাহিত্যই যদি হবে, শাসক-রোষের প্রশ্ন কেন তবে?
“গালিভার’স ট্রাভেল্‌স”-এর প্রচ্ছদ। কোর ক্লাসিকস সিরিজ।

লিলিপুটের বামন, ব্রবডিংনাগের দৈত্য, অদ্ভুত সব দেশ– এত বছর পরেও গালিভারের সফর থামেনি। ছোটদের কাছে রোমাঞ্চ, বড়দের কাছে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ– “গালিভার’স ট্রাভেলস” এখনও একই সঙ্গে মজায় এবং অস্বস্তিতে ফেলে। আগামী ২৮ অক্টোবর ৩০০ বর্ষপূর্তি। লিখছেন, চন্দনাশিস লাহা।

সচিত্র কাহিনি হিসাবে বা সংক্ষিপ্তাকারে যে-বইটি শৈশবে-কৈশোরে চির-আকর্ষণীয়, উচ্চশিক্ষার ইংরেজি সিলেবাসে যার স্থান এখনও অনড়, জোনাথন সুইফ্‌টের সেই অমর সৃষ্টি “গালিভার’স ট্রাভেল্‌স” (Gulliver's Travels)-এর (প্রথম প্রকাশ ১৭২৬) এবার ৩০০ বছর। শতাধিক ভাষায় এই বহুস্তরীয় অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাসটি অনূদিত হয়েছে। প্রথম প্রকাশের কয়েক বছর পর তখনকার বিখ্যাত কবি ও নাট্যকার জন গে মন্তব্য করেছিলেন– ‘ইট ইজ ইউনিভার্সালি রেড, ফ্রম দ্য ক্যাবিনেট কাউন্সিল টু দ্য নার্সারি।’ সেই ট্র্যাডিশন এখনও অব্যাহত।

Advertisement
দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

শাসকের রোষ এড়াতে বইটি ১৭৩৫ সালের সংস্করণের আগে পর্যন্ত প্রকাশিত হত বেনামে– দীর্ঘ শিরোনামে লেখা থাকত ভ্রমণ কাহিনির কথকের নাম– ‘লেমুয়েল গালিভার’। কিন্তু শিশুসাহিত্যই যদি হবে, শাসক-রোষের প্রশ্ন কেন তবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই এই কালজয়ী সাহিত্যকর্মটির মাহাত্ম্য তথা বহুমাত্রিক মূল্য পরিস্ফুট হবে।

গ্রেট ব্রিটেনের তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈদেশিক সংঘাত, দ্রুত পরিবর্তনশীল সামাজিক কাঠামোর এক জটিল সময়পর্বে “গালিভার’স ট্রাভেল্‌স” রচিত হয়। সুইফ্‌ট তৎকালীন রাজনৈতিক পরিবেশ, মানবপ্রকৃতি এবং এনলাইটেনমেন্টের ধারণার প্রতি নিজের গভীর ক্ষোভ ও মোহভঙ্গ– চারটি অংশে বিভক্ত এই বৃত্তান্তাত্মক উপন্যাসে– ফুটিয়ে তুলেছেন এক অতীব আকর্ষণীয় কাল্পনিক ভ্রমণ-বৃত্তান্তের মোড়কে। রাজনৈতিক পটভূমিতে একাধিক বিষয় রয়েছে। প্রথমত, টোরি ও হুইগ দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা (লেখক নিজে ছিলেন টোরি দলের অনুরাগী সমর্থক)। দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রী রবার্ট ওয়ালপোলের অপশাসন– যাকে লেখক তীব্রভাবে ব্যঙ্গ করেছেন লিলিপুটের অর্থমন্ত্রী ফ্লিমল্যাপের চরিত্রের মাধ্যমে। ফ্লিমল্যাপ পদোন্নতি পায় যোগ্যতা বা প্রজ্ঞার জোরে নয়, বরং দড়ির উপর সার্কাস দেখিয়ে! তৃতীয়ত, সাউথ সি কোম্পানির লোভ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি– যার ফলে হাজার হাজার বিনিয়োগকারী সর্বস্বান্ত হয়। এছাড়া, বইটির চতুর্থাংশে অ্যাংলো-আইরিশ সম্পর্ক ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশবাদের তীক্ষ্ণ সমালোচনা রয়েছে।

কাহিনির তৃতীয় অংশে লেখক মাত্রাতিরিক্ত বৌদ্ধিক কসরতকে একহাত নিয়েছেন। তাই আমরা দেখি, লাগাডোর ‘গ্র্যান্ড অ্যাকাডেমি’-র বিজ্ঞানীরা শসা থেকে সূর্যালোক বের করার নিষ্ফল গবেষণায় দিনপাত করছেন, অথচ সমাজের মৌলিক পরিকাঠামোর উন্নতিবিধানে সম্পূর্ণ উদাসীন।

বইয়ে বিধৃত সামাজিক ও বৌদ্ধিক প্রেক্ষাপটও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ডিমের কোন দিকটি ভাঙা উচিত (বড় দিক না ছোট দিক) তা নিয়ে লিলিপুট আর ব্লেফুস্কুদের মধ্যে চলছে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। সুইফ্‌ট আসলে তদানীন্তন ধর্মীয় অনৈক্য ও সংঘাতের অসাড়তা তুলে ধরেছেন। কাহিনির তৃতীয় অংশে লেখক মাত্রাতিরিক্ত বৌদ্ধিক কসরতকে একহাত নিয়েছেন। তাই আমরা দেখি, লাগাডোর ‘গ্র্যান্ড অ্যাকাডেমি’-র বিজ্ঞানীরা শসা থেকে সূর্যালোক বের করার নিষ্ফল গবেষণায় দিনপাত করছেন, অথচ সমাজের মৌলিক পরিকাঠামোর উন্নতিবিধানে সম্পূর্ণ উদাসীন।

ভ্রমণাখ্যান ও রূপক হিসাবে উপন্যাসটির ‘দ্বৈতজীবন’-এর এই শাশ্বত সাফল্যের মূলে রয়েছে অসাধারণ ঘটনাবলিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার বর্ণন-ক্ষমতায়। আর, তারই সঙ্গে প্রতি পরতে ক্ষুরধার বঙ্কিম বক্তব্য গুঁজে দেওয়ার সুইফ্‌টীয় প্রতিভা। জনৈক সমালোচকের ভাষায়, ‘ছোটরা বইটি পড়ে লাইন বরাবর, বড়রা বিটুইন দ্য লাইন্‌স’। গালিভার স্মৃতিচারণার এক জায়গায় জানাচ্ছেন, দৈত্যাকৃতির এক মহিলা তাঁকে দেখে ‘চিৎকার করে পিছন ফিরে দৌড় দিল, যেমনটি ইংল্যান্ডের মহিলারা করে থাকে একটা ব্যাঙ বা মাকড়সা দেখতে পেলেই’। এখানে ঘটনাটি ছোটদের জন্য, কিন্তু উপমাটি অবশ্যই পরিণত পাঠকদের কাছে উপভোগ্য।

আর-একটি অতিপরিচিত উদাহরণ পেশ করা যাক। আগুন লেগেছে লিলিপুটীয়দের রাজপ্রাসাদে। খুব ছোট ছোট বালতিতে আনা অল্প জলে সেই বিধ্বংসী আগুন নেভার নয়। গালিভার অনতিবিলম্বে তৎপর হয়ে উঠলেন। আগের রাতে প্রচুর সুরাপানের ফলে গালিভারের মূত্রথলি ছিল অতিপূর্ণ। প্রাসাদের উপর হিসু করে করে গালিভার আগুন নিভিয়ে ফেললেন তিন মিনিটের মধ্যে। কিন্তু, হায়, রানি গালিভারকে পুরস্কৃত না করে করলেন তিরস্কৃত, শালীনতা ও শিষ্টাচার ভঙ্গের অপরাধে। সন্দেহ নেই ছোটরা এই বর্ণনায় তুমুল মজায় মজবে; আর বড়রা খুঁজে পাবে ১৭১৩ সালের সেই বিখ্যাত ‘ট্রিটি অফ ইউট্রেক্ট’-এর রূপক, যে অতি-প্রয়োজনীয় সন্ধির বিতর্কিত কিন্তু বাস্তবমুখী ব্যবস্থা করে সুইফ্‌টের বন্ধু বলিংব্রোক রাজদ্রোহের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। লেখক আসলে দেখাচ্ছেন কীভাবে কোনও রাজনৈতিক নেতার স্থূল অথচ আন্তরিক হিতৈষণা বিপক্ষ দলের অপব্যাখ্যার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

গালিভার স্মৃতিচারণার এক জায়গায় জানাচ্ছেন, দৈত্যাকৃতির এক মহিলা তাঁকে দেখে ‘চিৎকার করে পিছন ফিরে দৌড় দিল, যেমনটি ইংল্যান্ডের মহিলারা করে থাকে একটা ব্যাঙ বা মাকড়সা দেখতে পেলেই’।

সুইফ্‌টকে শুধুই শুকনো ‘সিনিক’ বা সংশয়বাদী ভাবলে ভুল হবে। তাঁর ফ্যান্টাসির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এই প্রতীতী যে, মনুষ্যজীবন ভাল-মন্দের দ্বিত্ব দিয়েই তৈরি। তাঁর বইয়ের বামন, দৈত্য, বিচিত্র ঘোড়া– সকলের মধ্যেই রয়েছে এই বিপরীতের সহাবস্থান। তিনি বলতে চেয়েছেন মানুষ নিছক ‘ইয়াহু’-র (Yahoo) সমগোত্রীয় নয়; তার মধ্যে ‘হুইনাম’দের (Houyhnhnm)- শ্রেয়বোধও বিদ্যমান। বইটির এই সদর্থকতা মোটেই উপেক্ষণীয় নয়।

“গালিভার’স ট্রাভেল্‌স” ধরনের শিশুসাহিত্যের এখনকার নাম– ‘ডিপ চিলড্রেন্স লিটারেচার’। বিংশ শতাব্দীতে এরকম বেশ কিছু স্মরণীয় ‘গভীর শিশুসাহিত্য’ লেখা হয়েছে, যেমন– ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’, ‘থ্রু দ্য লুকিং গ্লাস’, ‘দ্য ওয়াটার বেবিজ’, ‘দ্য লিট্‌ল প্রিন্স’, ‘দ্য ভয়েজ অফ দ্য ডন ট্রেডার’ ইত্যাদি। অবিসংবাদিতভাবে লেমুয়েলের ভ্রমণবৃত্তান্ত এসব আধুনিক ফ্যান্টাসির অগ্রদূত।

Advertisement
দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Tags :
Britain
Advertisement
Tags :
Britain

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন