দলগত সরকারি নিয়োগে পক্ষপাতিত্বের শঙ্কা, কীভাবে গড়ব মুখোশহীন সমাজ?
Kishore Ghosh
বর্তমান সমাজে 'মুখোশ' পরা মানুষের প্রাবল্য চোখে পড়ার মতো। এটিই সবচেয়ে বড় সামাজিক সত্য। নিজের ভাবমূর্তি ভালো রাখতে বা সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে প্রায়ই একটি অদৃশ্য মুখোশ পরে থাকে প্রত্যেকে। কারণ, সমাজ নির্দিষ্ট কিছু আচরণ পছন্দ করে। মানুষ 'একা' হয়ে যাওয়ার বা সমালোচিত হওয়ার ভয়ে নিজের আসল রূপ লুকিয়ে সেই ছাঁচে নিজেকে ফেলে দেয়। আবার অনেকেই নিজের ভিতরের কষ্ট, হতাশা বা দুর্বলতা অন্যের সামনে প্রকাশ করতে চায় না। তারাও সুখী ও সাফল্যের মুখোশ পরিহিত। অনেক সময় আবার সাময়িক কোনও সুবিধা পাওয়ার জন্য বা কারও প্রিয়পাত্র হওয়ার জন্য 'কৃত্রিম' ভালমানুষের রূপ নেয় অনেকে। আবার 'আমাকে এভাবে মানুষ মেনে নেবে!'--- এই ভয় থেকেও অনেকে নিজেকে আড়াল করার জন্য ভেক ধরে। কিন্তু এও সত্যি, 'মুখোশ'ধারী বেশি দিন ভেক ধরে থাকতে পারে না।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের নিয়মকে চ্যালেঞ্জ করে হওয়া মামলা ৫ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানো হবে কি না, তা নিয়ে একটি শুনানিতে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত। তাঁর কথায়, 'কোনও দল যদি আম্পায়ার নিয়োগ করে, সেই আম্পায়ারকে সবসময়ই সেই দলের প্রতি অনুগত বলে সন্দেহ করা হবে। তিনি যতই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নিন না কেন। নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের প্রক্রিয়াটি এমন করা দরকার, যাতে তাঁদের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে বিন্দুমাত্র সংশয় না থাকে।' ২০২৩ সালে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে বদল এনে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দেওয়া হয়। বর্তমান নিয়মে বাছাই কমিটিতে থাকেন ৩ সদস্য- প্রধানমন্ত্রী, একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বিরোধী দলনেতা। সে-প্রসঙ্গেই বিচারপতি দত্তর এই মন্তব্য। তাঁর ইঙ্গিত, প্রধানমন্ত্রীর বেছে নেওয়া নির্বাচন কমিশনাররা যে তাঁর অবাধ্য হবেন, তা আশাতীত।
আরও পড়ুন:
এটা বলা যায় না যে, প্রধানমন্ত্রী বেছে নিলেই সরকারি কর্তারা তাঁর 'একান্ত আজ্ঞাবাহী' হবেন।
তাঁর ইঙ্গিত গুরুত্বপূর্ণ হলেও পুরোপুরি বাস্তবসম্মত কি না, প্রশ্ন থেকেই যায়। যেমন এটা বলা যায় না যে, প্রধানমন্ত্রী বেছে নিলেই সরকারি কর্তারা তাঁর 'একান্ত আজ্ঞাবাহী' হবেন। আবার প্রধানমন্ত্রী বা অন্য কোনও মন্ত্রী বেছে না নিলেও প্রশাসনিক কোনও কর্তা বাড়তি আনুকূল্য পেতে সীমা লঙ্ঘন করবেন না, সেটাও ধরে নেওয়া যায় না। প্রকাশ্যে সমাজসেবী বা দারুণ ভাবমূর্তির মুখোশ পরে ঘুরে বেড়ানো অনেকে যেমন পর্দার আড়ালে নিকৃষ্ট কাজকর্ম করে থাকে, সে-কথা সরকারি স্তরেও প্রযোজ্য। কারণ, তাঁরাও এই বৃহত্তর সমাজেরই অংশ। মুখোশ সরিয়ে আসল মানুষটাকে চেনার চেষ্টা কার্যত হয় না।
দশচক্রে ভগবানও ভূত হয়। দরকার: প্রকৃত মানুষের। মুখোশ নয়, প্রকৃত মুখ। যারা ভাল-মন্দ যেমনই হোক, সত্যিটা খোলাখুলি সমাজের সামনে মেলে ধরবে। সমাজ যদি সেটা গ্রহণ করে, তাহলে ধীরে ধীরে মুখোশ পরিধান করার প্রয়োজনীয়তাও ঘুচে যাবে। কমবে মুখোশধারী মানুষের সংখ্যাও।