ডিজিটাল যুগে তথ্যের অবাধ স্রোত যেমন সমাজকে স্বচ্ছ করেছে, তেমনই এর ফলে ব্যক্তিগত জীবনের উপর নতুন ধরনের চাপও সৃষ্টি হয়েছে। ইন্টারনেটে কোনও তথ্য প্রকাশিত হলে তা বহু বছর ধরে থেকে যেতে পারে। আর, সেই তথ্য যদি কোনও ব্যক্তির অতীতের সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে তার প্রভাব বর্তমান জীবনকেও প্রভাবিত করতে শুরু করে। এই অবস্থায় 'ভুলে যাওয়ার অধিকার' বা 'রাইট টু বি ফরগটেন'-কে 'ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার'-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রূপে স্বীকৃতি দিয়ে দিল্লি হাই কোর্ট যে-পর্যবেক্ষণ রেখেছে, তা সময়োপযোগী।
বিচারপতি সচিন দত্তর রায়ে স্পষ্ট-গোপনীয়তার অর্থ শুধু তথ্য গোপন রাখা নয়, বরং একজন
নাগরিকের নিজের 'ব্যক্তিগত তথ্য'-র ব্যবহার, প্রচার, দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতির উপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ থাকাও। দীর্ঘ দিন অনলাইনে থেকে যাওয়া তথ্য যদি কোনও ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা, পেশাগত ভবিষ্যৎ, বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তবে সেই তথ্যের প্রয়োজনীয়তা ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার নাগরিকের আছে।
ডিজিটাল দুনিয়ায় যা সবচেয়ে বড় সুবিধে, তা-ই প্রকারান্তরে সবচেয়ে বড় সমস্যা তথ্যের স্থায়িত্ব। ডিজিটাল আর্কাইভ অতীতের ঘটনাকে মুহূর্তে জীবিত করে তুলতে পারে।
তবে এই অধিকারের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন- বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা। আদালতের নথি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকা গণতান্ত্রিক বিচার ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি। প্রকাশ্য বিচারপ্রক্রিয়া মানুষের আস্থা তৈরি করে, আইনের শাসনকে শক্তিশালী করে তৎসহ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নথি সংরক্ষণ করে। তাই ব্যক্তিগত গোপনীয়তার নামে আদালতের তথ্য সম্পূর্ণ মুছে ফেলা কোনওভাবেই সমাধান হতে পারে না। সমস্যাটি আসলে তথ্যের অস্তিত্ব নয়, বরং তথ্যের উপস্থাপনা। কোনও ব্যক্তি হয়তো কোনও মামলায় অভিযুক্ত হয়েছিলেন কখনও, কিন্তু পরে অভিযোগ থেকে মুক্ত হয়েছেন, তাহলে শুধু পুরনো অভিযোগের অংশটুকু সামনে থেকে গেলে তা ন্যায়বিচারের সম্পূর্ণ ছবি তুলে ধরে না।
একজন নাগরিকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এখানেই 'ডি-ইনডেক্সিং' এবং 'মাস্কিং'-এর মতো পদ্ধতির গুরুত্ব। তথ্য মুছে ফেলা নয়, বরং এমন ব্যবস্থা করা, যাতে ব্যক্তির নাম দিয়ে অনুসন্ধান করলেই সংবেদনশীল পুরনো তথ্য সহজে সামনে না আসে, এটাই হতে পারে একমাত্র মধ্যপন্থা। এতে আদালতের রায় বা আইনি নথির গুরুত্ব নষ্ট হয় না, আবার ব্যক্তির মর্যাদাও অযথা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।
ডিজিটাল দুনিয়ায় যা সবচেয়ে বড় সুবিধে, তা-ই প্রকারান্তরে সবচেয়ে বড় সমস্যা তথ্যের স্থায়িত্ব। ডিজিটাল আর্কাইভ অতীতের ঘটনাকে মুহূর্তে জীবিত করে তুলতে পারে। ফলে ভুল অভিযোগ, বা অসম্পূর্ণ তথ্য একজন মানুষের জীবনের সঙ্গে চিরকাল যুক্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। সেই জায়গায় 'রাইট টু বি ফরগটেন' ইতিহাস মুছে ফেলার অধিকার নয়; এটি মানুষের মর্যাদা রক্ষার প্রয়াস। এত তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা অক্ষুণ্ণ থাকবে। নাগরিকের গোপনীয়তার অধিকারও সুরক্ষিত হবে।
