দেবীপক্ষমহানগররাজ্যবিদেশখেলালাইফস্টাইল
Anurag-valli

বিষ্ণুপ্রিয়ার জীবনের অজানা কথা শোনায় ‘অনুরাগবল্লী’, একাধারে তত্ত্ব ও জীবনীগ্রন্থ

বিষ্ণুপুর বৈষ্ণবপাড়া থেকে পুঁথিটি সংগ্রহ করে প্রকাশ করেন মৃণালকান্তি ঘোষ।
Biswadip Dey
04:50 PM Oct 01, 2026 IST
বিষ্ণুপুর বৈষ্ণবপাড়া থেকে পুঁথিটি সংগ্রহ করে প্রকাশ করেন মৃণালকান্তি ঘোষ।
প্রতীকী ছবি।

সে পুঁথির নাম 'অনুরাগবল্লী'। এটি একাধারে তত্ত্ব ও জীবনীগ্রন্থ। মৃণালকান্তি ঘোষ সর্বপ্রথম মনোহরদাস প্রণীত 'অনুরাগবল্লী' প্রকাশ করেছিলেন। এই লেখার জন্য অবলম্বিত পুঁথিটি সংগৃহীত হয়েছিল বিষ্ণুপুর বৈষ্ণবপাড়া থেকে। লিখছেন বিকাশ পাল।

শ্রীচৈতন্যের অন্তর্ধানের পরে, ষোড়শ শতাব্দীর শেষ থেকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত, বৈষ্ণব তত্ত্ব ও সাধনগ্রন্থ, সাধকজীবনী বা মহান্তজীবনী গ্রন্থ লেখার জোয়ার এসেছিল। এ বিষয়ে অগ্রগণ্য রূপগোস্বামী রচিত ‘উজ্জ্বলনীলমণি’ ও ‘ভক্তিরসামৃতসিন্ধু’; গোপালভট্টের ‘হরিভক্তিবিলাস’, নরহরি চক্রবর্তীর ‘ভক্তিরত্নাকর’ অন্যতম। ভক্তিরত্নাকর একাধারে তত্ত্ব ও ইতিহাস। জীবনীগ্রন্থের ধারায় চৈতন্য-জীবনী ছাড়াও হরিচরণদাসের ‘অদ্বৈতমঙ্গল’, লোকনাথদাস গোস্বামীর ‘শ্রীসীতাচরিত্র’ এবং আচার্য শ্রীবিষ্ণুদাস বিরচিত ‘শ্রীসীতাগুণকদম্ব’ অন্যতম। মনোহরদাস বিরচিত ‘অনুরাগবল্লী’ এই ধারায় উজ্জ্বল সংযোজন– এটি একাধারে তত্ত্ব ও জীবনীগ্রন্থ। এই বইয়ে যেমন বৈষ্ণবীয় সাধনতত্ত্ব আলোচিত হয়েছে, তেমনই শ্রীনিবাসাচার্যের জীবনকথা ও শ্রীবিষ্ণুপ্রিয়া দেবীর জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বর্ণিত আছে। সুতরাং প্রায় অনালোচিত এই বইটি বৈষ্ণব সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

Advertisement
দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

মৃণালকান্তি ঘোষ সর্বপ্রথম মনোহরদাস প্রণীত ‘অনুরাগবল্লী’ প্রকাশ করেছিলেন। এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ‘কলিকাতা ১৯২০ নম্বর বাগবাজার স্ট্রিট পত্রিকা প্রেস’ থেকে, যা তড়িৎকান্তি বিশ্বাস দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত। প্রকাশকাল ‘৪২৪ শ্রীগৌরাঙ্গাব্দ’ অর্থাৎ ১৯১০ খ্রিস্টাব্দ। এই সংস্করণে অবশ্য সম্পাদক হিসাবে মৃণালকান্তি ঘোষের নাম নেই, তবে ভূমিকা রচয়িতা হিসাবে রয়েছে। ভূমিকা রচয়িতা ‘সম্পাদক’ না-ও হতে পারেন, আবার হতেও পারেন। তবে অনুমান করাই যায় তিনিই গ্রন্থ সম্পাদক, কেননা তৃতীয় সংস্করণের সম্পাদক ও প্রকাশক মৃণালকান্তি ঘোষ। প্রকাশক অনুকূলচন্দ্র সেন। ‘কলিকাতা ৯ নম্বর বিশ্বকোষ লেন, বাগবাজার, বিশ্বকোষ প্রেস’ থেকে প্রকাশিত। প্রকাশকাল ৪৪৫ শ্রীগৌরাঙ্গাব্দ অর্থাৎ ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দ। প্রথম সংস্করণ আমাদের হাতে নেই, তবে তৃতীয় সংস্করণের ভূমিকার শেষে ভূমিকা-কর্তা মৃণালকান্তি ঘোষ প্রথম সংস্করণের সময়কাল উল্লেখ করেছেন ‘৪১৩ শ্রীগৌরাঙ্গাব্দ’ অর্থাৎ ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দ। প্রাপ্ত দু’টি সংস্করণে একই ভূমিকাই ব্যবহৃত হয়েছে।

এই বইয়ে যেমন বৈষ্ণবীয় সাধনতত্ত্ব আলোচিত হয়েছে, তেমনই শ্রীনিবাসাচার্যের জীবনকথা ও শ্রীবিষ্ণুপ্রিয়া দেবীর জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বর্ণিত আছে।

এই প্রাচীন গ্রন্থ সম্পাদনায় সম্পাদক মৃণালকান্তি ঘোষ কোন কোন পুঁথি অবলম্বনে গ্রন্থের পাঠ সম্পাদনা করেছিলেন সে সম্পর্কিত কোনও তথ্য তিনি দেননি। আমরা অনুসন্ধান করে জেনেছি ‘অনুরাগবল্লী’ বইটির আর কোনও সংস্করণ প্রকাশিত হয়নি। এবং এটি খুব সুলভও নয়। যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য প্রণীত বাংলা পুঁথির তালিকা সমন্বয় (প্রথম খণ্ড) বইয়ে ‘অনুরাগবল্লী’-র মাত্র চারটি পুঁথির উল্লেখ আছে। পুঁথিগুলি তিনটি স্থানে রক্ষিত আছে।

যেমন–

১। ‘বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ’ পুঁথিশালায় রক্ষিত ২৬৩৮ সংখ্যক পুঁথি। এটি অনুলিপিকাল উল্লিখিত সম্পূর্ণ পুঁথি বলে জানানো হয়েছে। অনুলিপি কাল হিসাবে উল্লেখ রয়েছে ১১০৩ বঙ্গাব্দ বা ১৬১৮ শকাব্দের চৈত্র মাস। অর্থাৎ ১৬৯৭ খ্রিস্টাব্দ। বাংলা সাহিত্যের ঐতিহাসিক সুকুমার সেন ‘বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস’ বইয়ে দ্বিতীয় খণ্ডে ১৬১৮ শকাব্দ বা ১৬৯৭ খ্রিস্টাব্দকে এর রচনাকাল বলে উল্লেখ করেছেন।

‘অনুরাগবল্লী’-র পুঁথিতে প্রাপ্ত সমাপ্তিসূচক শ্লোক অনুসারে ১৬১৮ শকাব্দে গ্রন্থটি সমাপ্ত হওয়ার কথা জানা যায়। যদিও সব পুঁথিতে এই শ্লোকটি পাওয়া যায় না। এই সালটিকেই অনুলিপি কাল হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে কি না তা স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। তবে মুদ্রিত সংস্করণে ‘১৭৫৩ সম্বৎ’ এবং ‘১৬১৮ শকাব্দ’ উল্লেখ রয়েছে, অর্থাৎ ১৬৯৭ খ্রিস্টাব্দ। সুতরাং এই সনটিই রচনা কাল বলে ধরে নেওয়া যায়। বইটি সমাপ্ত হয়েছিল বৃন্দাবনে। নরহরি চক্রবর্তীর ‘ভক্তিরত্নাকর’ বইয়ে ‘অনুরাগবল্লী’-র উল্লেখ আছে। সুকুমার সেন জানিয়েছেন ‘ভক্তিরত্নাকর’-এর রচনাকাল ১৬৯৪ খ্রিস্টাব্দের পরে এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম পাদে বলে উল্লেখ করেছেন।

‘বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ’ পুঁথিশালায় রক্ষিত ২৬৩৮ সংখ্যক পুঁথি। এটি অনুলিপিকাল উল্লিখিত সম্পূর্ণ পুঁথি বলে জানানো হয়েছে। অনুলিপি কাল হিসাবে উল্লেখ রয়েছে ১১০৩ বঙ্গাব্দ বা ১৬১৮ শকাব্দের চৈত্র মাস।

২। বরানগর পাটবাড়ির ‘গৌরাঙ্গ গ্রন্থ মন্দির’-এ ‘অনুরাগবল্লী’-র একটি পুঁথি সংরক্ষিত রয়েছে। এর পঞ্জিভুক্তি সংখ্যা ২২৮১/১। পুঁথিটি ১৬৬০ শকাব্দ বা ১১৪৬ বঙ্গাব্দ অর্থাৎ ১৭৩৮ খ্রিস্টাব্দে অনুলিপিকৃত। ওই বছর ২৮ ভাদ্র অনুলিপি সমাপ্ত হয়েছিল বলে উল্লেখ রয়েছে। পুঁথিটি খণ্ডিত। মাত্র ৩৮টি পত্রই এখানে রয়েছে। গৌরাঙ্গ গ্রন্থ মন্দিরের বিবরণাত্মক তালিকা অনুসারে এই পুঁথিটি অতিশয় জীর্ণ।

৩। বিশ্বভারতীর লিপিকা পুঁথিশালায় ‘অনুরাগবল্লী’-র দু’টি পুঁথি আছে। বাংলা পুঁথির তালিকা সমন্বয় (প্রথম খণ্ড) অনুযায়ী, পুঁথি দু’টির পঞ্জিভুক্তি সংখ্যা যথাক্রমে– ২৪৬ ও ৬১০০। দু’টি পুঁথি খণ্ডিত এবং অনুলিপির সন-তারিখ উল্লেখবিহীন। এই চারটি পুঁথির মধ্যে বরানগর পাটবাড়ির গৌরাঙ্গ গ্রন্থমন্দিরে রক্ষিত পুঁথি ও বিশ্বভারতীর লিপিকা পুঁথিশালার ২৪৬ সংখ্যক পুঁথি অর্থাৎ মাত্র দু’টি পুঁথি ‘জাতীয় পাণ্ডুলিপি মিশন’-এর (National Mission for Manuscripts) তালিকায় নথিভুক্ত। তাছাড়াও বৃন্দাবন শোধ সংস্থান, মথুরা, উত্তরপ্রদেশে মনোহরদাস রচিত ‘অনুরাগবল্লী’-র একটি পুঁথি আছে। পুঁথিটি অসম্পূর্ণ।

বরানগর পাটবাড়ির ‘গৌরাঙ্গ গ্রন্থ মন্দির’-এ ‘অনুরাগবল্লী’-র একটি পুঁথি সংরক্ষিত রয়েছে। এর পঞ্জিভুক্তি সংখ্যা ২২৮১/১। পুঁথিটি ১৬৬০ শকাব্দ বা ১১৪৬ বঙ্গাব্দ অর্থাৎ ১৭৩৮ খ্রিস্টাব্দে অনুলিপিকৃত।

আমাদের অবলম্বিত পুঁথিটি উক্ত ৫টি পুঁথি থেকে স্বতন্ত্র, ইতোপূর্বে কোথাও নথিভুক্ত হয়নি। পুঁথিটি সংগৃহীত হয়েছিল বিষ্ণুপুর বৈষ্ণবপাড়া থেকে। এখান থেকে একসঙ্গে অনেকগুলি পুঁথি সংগৃহীত হয়েছিল, তার অন্যতম মালাধর বসু বা গুণরাজ খানের ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’, উত্তমদাস বিরচিত ‘শ্রীকৃষ্ণপ্রকাশরত্ন’, বিশ্বনাথ চক্রবর্তী সংকলিত ‘ক্ষণদাগীতচিন্তামণি’ ও মনোহরদাস প্রণীত ‘অনুরাগবল্লী’। পুঁথিটি সম্পূর্ণ। অর্থাৎ এখনও পর্যন্ত প্রাপ্ত পুঁথি অনুযায়ী এটি দ্বিতীয় সম্পূর্ণ পুঁথি, যা কোথাও তালিকাভুক্ত হয়নি।। সুতরাং এই পুঁথিটি ‘অনুরাগবল্লী’ চর্চার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এই পুঁথির অনুলিপিকর গয়ারাম দাস। এর অনুলিপি সমাপ্ত হয়েছিল ১১৯০ বঙ্গাব্দ বা ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দ। পুঁথির ‘পুষ্পিকা’-য় অনুলিপিকর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে লিখেছেন, ‘ইতি শ্রীমদঅনুরাগবল্লী সমাপ্ত। সন ১১৯০ সাল। স্বাক্ষর মিদং শ্রীগয়ারামদাস।’ এখানে উল্লিখিত সালটি বঙ্গাব্দ-বোধক। মল্লভূমির পুঁথি বা ‘মন্দির লিপি’ থেকে জানা যায়, এই অঞ্চলে সন-সাল হিসাবে উল্লিখিত সম্বৎ মল্লাব্দকেই বোঝাত। এই পুঁথিতে উল্লিখিত ‘সম্বৎ বঙ্গাব্দ’-কেই বুঝিয়েছে তা প্রমাণিত হয় গয়ারাম দাসের অনুলিখিত বিশ্বনাথ সংকলিত ‘ক্ষণদাগীতচিন্তামণি’-র পুঁথি থেকে। সে পুঁথিটিও ১১৯০ বঙ্গাব্দে অনুলিপি সমাপ্ত হয়েছিল। অনুলিপিকর এই ‘সম্বৎ’-কে ‘প্রাকৃত সন’ বলে উল্লেখ করেছেন। শুধু তা-ই নয়, এই পুঁথিতে ‘১৭০৫ শকাব্দ’-এর উল্লেখ আছে। হিসাব অনুযায়ী প্রমাণিত হয় ১১৯০ সন প্রকৃতপক্ষে বঙ্গাব্দ। 

পুঁথিতে অনুলিপিকর গয়ারাম দাসের বিস্তৃত কোনও পরিচয় উল্লেখ নেই। শুধুমাত্র গ্রন্থ-শেষে তাঁর নাম পাওয়া যায় মাত্র। গয়ারামদাসের হস্তলিপি সুস্পষ্ট ও সুন্দর। একটি চরণ একটি মাত্রার অধীনে লিখিত হলেও অক্ষরবিন্যাস গোটা-গোটা থাকায় পাঠে অসুবিধা হয় না। অনুমিত হয় তিনি পেশাদার লিপিকর ছিলেন। এই পুঁথিতে পাঠক বা শ্রোতার কোনও নামোল্লেখ না থাকায় অনুমিত হয়, তিনি নিজের জন্যই এই পুঁথির অনুলিপি প্রস্তুত করেছিলেন।

পুঁথিটিতে সর্বমোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ৯৫। প্রথম পত্রের একদিকে লেখা। তাছাড়া ৪৭টি পত্রের উভয় পৃষ্ঠায় লেখা অর্থাৎ অঙ্কের হিসাবে ১ (৪৭ x ২) = ৯৫। পুঁথির কাগজ তুলট। প্রতিটি পৃষ্ঠার ডান দিকের ঊর্ধ্ব-কোণে ‘অনুরাগবল্লী’ নামটি লেখা রয়েছে, যাতে কোনও একটি পৃষ্ঠা কোনওভাবে পুঁথি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে সহজেই বোঝা যায়– এটি কোন পুঁথির অংশ।
লিপিকর লিপিকর্মে দুই ধরনের কালি ব্যবহার করেছিলেন। কাব্যটি কালো কালিতেই লেখা, কিন্তু চরণের শেষে পূর্ণচ্ছেদগুলি লাল কালিতে চিহ্নিত। পুঁথির মধ্যে অবস্থিত চিহ্নগুলি লাল ও কালো– উভয়প্রকার কালিতেই রচিত। গয়ারাম দাস পুঁথির সৌন্দর্যবিধানেও সচেতন ছিলেন, তা বোঝা যায়। পুঁথিতে তোলা পাঠের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম, তবে মাঝেমধ্যে অবশ্য তোলা পাঠ রয়েছে। এড়িয়ে যাওয়া শব্দ বা পঙ্‌ক্তি ঠিক করার জন্য এবং কখনও কখনও ভুল শব্দ কেটে বাদ দিয়ে সঠিক করার জন্য তোলাপাঠ ব্যবহার করা হয়েছে।
(মতামত নিজস্ব)

Advertisement
দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন