দেবীপক্ষমহানগররাজ্যবিদেশখেলালাইফস্টাইল
Election Commission

বিতর্কে নির্বাচন কমিশন, সরষের মধ্যে ভূতের গুঞ্জন 

দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে সরব অন্য দু’জন কমিশনার। সাংবাদিক ঋতিকা চোপড়ার প্রতিবেদনে জানা যায়, সান্ধু ও জোশী– দু’জন কমিশনার আপত্তি তুলেছিলেন ৬ নম্বর ফর্মের নতুন বয়ান ও ‘ইসিআইনেট’-এর মাধ‌্যমে ভোটার তালিকার তথ‌্য কমিশনের হাতে কুক্ষিগত করে নেওয়া নিয়ে। 
Kishore Ghosh
04:35 PM Sep 29, 2026 IST
দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে সরব অন্য দু’জন কমিশনার। সাংবাদিক ঋতিকা চোপড়ার প্রতিবেদনে জানা যায়, সান্ধু ও জোশী– দু’জন কমিশনার আপত্তি তুলেছিলেন ৬ নম্বর ফর্মের নতুন বয়ান ও ‘ইসিআইনেট’-এর মাধ‌্যমে ভোটার তালিকার তথ‌্য কমিশনের হাতে কুক্ষিগত করে নেওয়া নিয়ে। 
মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে সরব অন্য দুই কমিশনার!

টি. এন. শেষনকে অাক্রমণ করতে গিয়ে প্রাক্তন মুখ‌্যমন্ত্রী জে‌্যাতি বসুকে বলতে শুনেছিলাম, ‘এক মেগালোম‌্যানিয়াক গণতন্ত্রকে শেষ করে দিচ্ছেন।’ ২০০১ সালে বিধানসভা ভোটে পরাজয়ের পর তৎকালীন মুখ‌্য নির্বাচন কমিশনার এম. এস. গিলকে উদ্দেশ‌্য করে মমতা বন্দে‌্যাপাধ‌্যায় বলেছিলেন, ‘পারচেজ্‌ড গিল।’ ২০০২ সালে গুজরাতে বিধানসভা ভোটের সময় সে-রাজে‌্যর তৎকালীন মুখ‌্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নিশানায় ছিলেন মুখ‌্য নির্বাচন কমিশনার জেমস মাইকেল লিংডো। এইরকম উদাহরণ অজস্র। মুখ‌্য নির্বাচন কমিশনাররা সবসময়ই রাজনৈতিক নেতাদের অাক্রমণের লক্ষে‌্য থেকেছেন। ফলে ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর তদন্তমূলক প্রতিবেদনের পর বর্তমান মুখ‌্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে নতুন করে বিজেপি বিরোধী দলগুলির যে অান্দোলন শুরু হয়েছে তা ব‌্যতিক্রমী কিছু নয়। এখন প্রশ্ন হল, এই অান্দোলনের জল কত দূর গড়াবে? এই অান্দোলনের জেরে কি সতি‌্য সতি‌্যই জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে সরতে হবে? এই অান্দোলন কি ‘এসঅাইঅার’-এ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়াদের সমস‌্যার ক্ষেত্রে কোনও সুরাহা করতে পারবে? ইত‌্যাদি ইত‌্যাদি।

‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ কাগজে ঋতিকা চোপড়ার বিস্ফোরক প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর স্বাভাবিকভাবেই শাসক দল বিজেপির পক্ষ থেকে এর সত‌্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। ঋতিকা তঁার প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, গত বছরের নভেম্বর মাস থেকে এই বছরের অাগস্ট মাস পর্যন্ত গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী ‘এসঅাইঅার’ প্রক্রিয়া নিয়ে মোট ১৪ বার বিভিন্ন অাপত্তি জানিয়েছেন। প্রতি ক্ষেত্রেই তঁারা তঁাদের অাপত্তির কথা মুখ‌্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে জানান এবং একবার প্রথা ভেঙে তঁারা চিঠি দেন কেন্দ্রীয় ক‌্যাবিনেট সচিবকেও। অর্থাৎ ঋতিকার খবরের মূল প্রতিপাদ‌্য হল, নির্বাচন কমিশনে এসঅাইঅার নিয়ে তীব্র মতবিরোধ। তিন নির্বাচন কমিশনারের মধে‌্য দু’জনই, মানে সংখ‌্যাগরিষ্ঠ সদস‌্যই এই সংক্রান্ত গৃহীত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। তবুও মুখ‌্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার কিছুটা স্বেচ্ছাচারী কায়দাতেই ‘এসঅাইঅার’-সংক্রান্ত কমিশনের যাবতীয় সিদ্ধান্ত একাই নিয়ে চলেছেন।

Advertisement
দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

ঋতিকা যে ১০ মাস সময়ের কথা বলেছেন সেটি পশ্চিমবঙ্গের এসঅাইঅার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গ-সহ ১২ রাজে‌্য এসঅাইঅারের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়েছিল গত বছরের ২৭ অক্টোবর। এরপর নভেম্বর থেকে সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী একের পর এক অাপত্তি তুলতে থাকেন। সর্বপ্রথম এসঅাইঅার হয়েছিল বিহারে। গত বছরের ২৪ জুন বিহারে এসঅাইঅার বিজ্ঞপ্তি জারি হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধে‌্যই তৎকালীন বাংলার মুখ‌্যমন্ত্রী মমতা বন্দে‌্যাপাধ‌্যায় অভিযোগ করেছিলেন, কমিশনের মূল নিশানায় পশ্চিমবঙ্গ। বিধানসভা ভোটের অাগে রাজে‌্য তৃণমূলের ভোট এই পদ্ধতিতে বাদ দেওয়া হবে। স্বাভাবিকভাবে গত অক্টোবরের শেষে রাজে‌্য এসঅাইঅার চালু হওয়ার পর এই বিরোধিতা চরমে ওঠে। রাস্তায় নেমে ও সংসদের ভিতরে প্রতিবাদের সঙ্গে সঙ্গে তীব্র এসঅাইঅার বিরোধিতা মমতা বন্দে‌্যাপাধ‌্যায় নিজে সুপ্রিম কোর্টেও নিয়ে যান। সেই মামলার এখনও নিষ্পত্তি ঘটেনি।

ঋতিকার প্রতিবেদনে জানা গিয়েছে, সান্ধু ও জোশী– দু’জন কমিশনার মূলত অাপত্তি তুলেছিলেন ৬ নম্বর ফর্মের নতুন বয়ান ও ‘ইসিঅাইনেট’-এর মাধ‌্যমে ভোটার তালিকার তথ‌্য কমিশনের হাতে কুক্ষিগত করে নেওয়া নিয়ে। বস্তুত, পশ্চিমবঙ্গে এসঅাইঅার চালু হওয়ার পর এই দু’টি ইসু‌্যতেই মূলত বিতর্ক দানা বাধে।

এসঅাইঅারের সময় ৬ নম্বর ফর্মে বাপ-ঠাকুরদার তথ‌্য জানতে চাওয়া হয়। তঁাদের নাম বিগত এসঅাইঅারের পর ভোটার তালিকায় উঠেছিল কি না জানতে চাওয়া হয়। এসব তথ‌্য ধরেই ‘ম‌্যাপিং’ করা হয়। তথ‌্যগত অসংগতির তালিকা বানানো হয়। কিছু লোককে অনুপ্রবেশকারী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। ১৯৬০ সালে ভোটার নিবন্ধন বিধিমালায় ৬ নম্বর ফর্মের বয়ান দেওয়া রয়েছে। সান্ধু ও জোশী অাপত্তি জানিয়ে বলেছিলেন, এসঅাইঅারের জন‌্য যদি ৬ নম্বর ফর্মের বয়ান বদলাতে হয় তা হলে ১৯৬০ সালের ওই বিধিতে পরিবর্তন দরকার, যেটা একমাত্র সরকার করতে পারে। নচেৎ বিষয়টি বেঅাইনি কাজ হয়। সান্ধু ও জোশীর অাপত্তি যে কানে তোলা হয়নি তা বলা বাহুল‌্য।

সান্ধু ও জোশী নির্বাচন কমিশনের ‘ইসিঅাইনেট’ পোর্টাল পরিচালনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব অাইনে ভোটার তালিকায় নাম তোলা ও বাদ দেওয়ার ক্ষমতা শুধুমাত্র প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রের ‘ইলেকটোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার’ তথা ‘ইঅারও’-কে দেওয়া থাকে। দেশে হাজার হাজার ‘ইঅারও’। এঁরা প্রতে‌্যকে মহুকুমা শাসক স্তরের অফিসার। এঁরা-ই ভোটার তালিকার মূল মালিক। অাগে এঁরা ভোটার তালিকার হার্ড কপিতে নাম কাটা ও নাম তোলার কাজ করতেন।

তালিকা ডিজিটাইজ করার পর ২০১৭ সাল থেকে কাজটা শুরু হয় ‘ইঅারওনেট’ নামে সফটওয়‌্যারের মাধ‌্যমে। এই বছরের জানুয়ারিতে জ্ঞানেশ কুমার চালু করেন ‘ইসিঅাইনেট’ নামে নির্বাচন কমিশনের পোর্টাল। এই পোর্টালে অন্তর্ভুক্ত হয় ‘ইঅারওনেট’। এই ‘ইঅারওনেট’– ‘ইসিঅাইনেট’-এর অধীনে যাওয়ার পর থেকে অভিযোগ ওঠে ‘ইঅারও’-রা অার চট করে লগ ইন করতে পারছেন না। অর্থাৎ ভোটার তালিকা পুরোপুরো নির্বাচন কমিশনের জিম্মায় চলে যায়। ‘ইসিঅাইনেট’ পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশনের তথ‌্যপ্রযুক্তি বিভাগ। যঁার মাথায় রয়েছেন সীমা খান্না। এই সীমা খান্নাই রাজে‌্যর ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটছেন বলে অভিযোগ তুলেছিল তৃণমূল। ‘ইঅারও’-দের বিধিবদ্ধ অাইনি ক্ষমতা এইভাবে সীমা খান্নার হাতে চলে যাওয়া যে সান্ধু ও জোশীকে যথেষ্ট বিব্রত করেছিল তা ঋতিকা চোপড়ার প্রতিবেদনে জানানো হয়।

অাইটি বিভাগ তথা সীমা খান্নার কাজে নজরদারি করার দায়িত্ব দেওয়া ছিল সঞ্জয় কুমার– একজন উপনির্বাচন কমিশনারের হাতে। তঁাকে সান্ধু ও জোশী নির্দেশ দেন ‘ইসিঅাইনেট’-এর মাধ‌্যমে ‘ইঅারও’-দের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে কি না তা কমিটি গড়ে দেখা হোক। সঞ্জয় কুমার সেই নির্দেশ রূপায়িত করতে গেলে তঁাকে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়। অারও একজন অাইএএসকে দায়িত্ব অানা হয়। তিনি এসেই কাজের নতুন বন্টন শুরু করেন। এ ব‌্যাপারেই অাপত্তি জানিয়ে ক‌্যাবিনেট সচিবকে চিঠি দিয়েছিলেন সান্ধু ও জোশী।

ঋতিকার প্রতিবেদনে উঠে অাসা সব অভিযোগ যে সতি‌্য তা প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে ২৬ সেপ্ট্েম্বর জারি করা তিন নির্বাচন কমিশনারের বিবৃতিতে। এখানে ধরে ধরে অভিযোগের উত্তর দেওয়া হয়েছে। ৬ নম্বর ফর্মের পরিবর্তন নিয়ে সাফাই দিয়ে বলা হয়েছে, এটি শুধু এই এসঅাইঅারের জন‌্য। সুপ্রিম কোর্ট এটি বহাল রেখেছে। ‘ইসিঅাইনেট’ পোর্টালের তালিকার দখল নেওয়ার অভিযোগকেও কার্যত মেনে নিয়ে বলা হয়েছে, ভোটার তালিকায় নাম তোলা ও কাটার ক্ষমতা একমাত্র ‘ইঅারও’-দের হাতেই থাকবে। বিরোধীরা এই বিবৃতিকে বলছেন ক্ষত মেরামত। সেটা এক কথায় ঠিক।

তবে বিরোধিতা যতই হোক, এসঅাইঅারের প্রয়োজনীয়তাও স্বীকার করতে হয়। এখনও পর্যন্ত ২০টি রাজে‌্য এসঅাইঅার শেষ হয়েছে। প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ গিয়েছে। এগুলি মূলত মৃত, স্থানান্তরিত ও ডুপ্লিকেট ভোটারের নাম। এককথায় ‘ভুয়া’ ভোটারের নাম। এই ‘ভুয়া’ ভোটাররা যে ভোটে বড় ভূমিকা গ্রহণ করে তা নিয়ে সংশয় নেই। ‘ভুয়া’ ভোটারের নাম তালিকায় থেকে যাওয়ার ক্ষেত্রে যে ‘ইঅারও’-দের ভূমিকাও থাকে তা অস্বীকার করা যায় না। ‘ইঅারও’-রা রাজে‌্যর অফিসার। এঁদের মাধ‌্যমেই রাজে‌্যর শাসক দল তালিকা থেকে বিরোধীদের নাম বাদ দেয় এবং ‘ভুয়া’ নাম ঢোকায় বলে দীর্ঘ দিনের অভিযোগ। এ রাজে‌্য বাম অামলে এই অভিযোগ করতেন মমতা বন্দে‌্যাপাধ‌্যায় এবং তৃণমূল অামলে এই অভিযোগ ছিল বিজেপির। শুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরি করতেই যে কমিশন ‘ইসিঅাইনেট’ পোর্টালের মাধ‌্যমে ‘ইআরও’দের ক্ষমতা খর্ব করতে চেয়েছিল তা নির্বাচন কমিশনের দপ্তরে কান পাতলেই জানা যায়।

ঋতিকার প্রতিবেদন ও কমিশনের বিবৃতির পর মানুষের কাছে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। এসআইআরের যে ত্রুটিগুলি সান্ধু ও জোশী তুলে ধরেছিলেন এবং যেগুলিকে বিরোধীরা সমর্থন করেছেন, তার প্রতিকার হয়েছে। কমিশনের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের সিলমোহর নিয়েই এসআইআর চলছে। যঁাদের নাম এসআইআরে ভুলক্রমে বাদ পড়েছে, তঁাদের নাম তালিকায় তোলার জন‌্য বিশেষ অভিযান হবে। ৬ নম্বর ফর্মের পুরনো বয়ানও ফিরে আসবে। ‘ইআরও’রাই থাকবেন ভোটার তালিকার মালিক। এখন একটাই প্রশ্ন, এবার বিরোধী জোটের অবস্থান কী হবে।

bapi.pratidin@gmail.com

Advertisement
দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Tags :
Chief Election Commissioner Gyanesh KumarElection Commission
Advertisement
Tags :
Chief Election Commissioner Gyanesh KumarElection Commission

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন