দেবীপক্ষমহানগররাজ্যবিদেশখেলালাইফস্টাইল
Passive Smoking

সিগারেট না খেয়েও রেহাই নেই! পরোক্ষ ধূমপানে প্রাণ হারাচ্ছে অসংখ্য মানুষ

ভারতে পরোক্ষে ধূমপানের এই বাড়তে থাকা বোঝা এখন বড় জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ। কোনও জনবহুল জায়গায় ধূমপানকে 'সামান্য অপরাধ' বলে আর এড়িয়ে গেলে চলবে না।
Kishore Ghosh
04:10 PM Oct 01, 2026 IST
ভারতে পরোক্ষে ধূমপানের এই বাড়তে থাকা বোঝা এখন বড় জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ। কোনও জনবহুল জায়গায় ধূমপানকে 'সামান্য অপরাধ' বলে আর এড়িয়ে গেলে চলবে না।
‘পরোক্ষ ধূমপান’ এখন ভারতের জন্য এক বড় জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ।

সিগারেট না খেলেও ধোঁয়ার বিষ থেকে রেহাই নেই। অন্যের ধুমপানের কারণে প্রতি বছর অসুস্থ হচ্ছে ও প্রাণ হারাচ্ছে বিপুল সংখ্যক মানুষ। ভারতে পরোক্ষে ধূমপানের এই বাড়তে থাকা বোঝা এখন বড় জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ। কোনও জনবহুল জায়গায় ধূমপানকে 'সামান্য অপরাধ' বলে আর এড়িয়ে গেলে চলবে না। লিখছেন আদিত্য ঘোষ। 

বাস স্টপে দঁাড়িয়ে বাসের অপেক্ষা করছেন। কয়েক হাত দূরে একজন ভদ্রলোক সাদা লম্বা সিগারেটে টান দিচ্ছেন। আপনার নাক পর্যন্ত সিগারেটের গন্ধ ভেসে আসছে। আপনি নাক চাপা দিলেন। ভাবলেন, সিগারেটের ধোঁয়া আপনার সুগভীর হৃদ্‌তলে যেতে পারল না। আবার কফি হাউসে মাটন স্যান্ডউইচ আর কফি খেতে খেতে আপনার চোখে পড়ল একে-একে সিগারেট খাওয়ার ছবি। ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকানো উদাসী অপরাহ্ণে কোলাহলে মুখরিত কফি হাউসে বসে ভাবলেন– ‘আমি তো সিগারেট খাচ্ছি না।

Advertisement
দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

আমার কোনও চিন্তা নেই।’ সকালে রবীন্দ্র সরোবরে প্রাতঃভ্রমণ করতে করতে লক্ষ করলেন দু’জন তরুণী সিগারেটে সুখটান দিচ্ছে। আপনি নাক সিটকে বললেন, ‘সমাজটা উচ্ছন্নে গেল!’ আরও জোরে পা চালিয়ে এগিয়ে গেলেন। তারপর দু’-হাত উপরে তুলে লম্বা শ্বাস নিলেন। কিন্তু ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গিয়েছে। কারণ আপনি ততক্ষণে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়েছেন।

এই ‘পরোক্ষ ধূমপান’ বা ‘সেকেন্ডহ্যান্ড স্মোক’-ই এখন ভারতের জন্য এক বড় জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ। সাম্প্রতিক একটি গবেষণার হিসাব বলছে, ২০২৩ সালে ভারতে প্রায় ৪৪ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষ অন্যের তামাকের ধোঁয়ার সংস্পর্শে এসেছে। আরও উদ্বেগের বিষয়, ওই বছরই পরোক্ষ ধূমপানের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন রোগে ভারতে আনুমানিক ৩ লক্ষ ২৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অথচ পরিসংখ্যানের আরও একটি অদ্ভুত দিক রয়েছে– ১৯৯০ সালের তুলনায় ভারতে পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শে আসার হার কমেছে, কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে আক্রান্ত মানুষের মোট সংখ্যা বেড়েছে। অর্থাৎ ধূমপান না করলেই যে তামাকের ক্ষতি থেকে নিরাপদ থাকা যায়, ভারতের এই বিপুল পরিসংখ্যান যেন সেই ধারণাকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে দঁাড় করাচ্ছে।

২০২৩ সালে পরোক্ষ ধূমপানের কারণে সারা বিশ্বে আনুমানিক ১৬ লক্ষ ৬০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

পরোক্ষ ধূমপানকে তাই নিছক কয়েক মুহূর্তের ধোঁয়া বলে উড়িয়ে দেওয়ার উপায় নেই। একজন মানুষ যখন সিগারেটে টান দেয়, তখন শুধু তার ফুসফুসেই ধোঁয়া ঢোকে না, সিগারেট থেকে বেরিয়ে আসা ধোঁয়ার একটি অংশ সরাসরি আশপাশের বাতাসে মিশে যায়। সেই বাতাসই শ্বাসের সঙ্গে টেনে নেয় পাশে দঁাড়িয়ে থাকা মানুষটি। তামাকের এই ধোঁয়ায় থাকে নিকোটিন, কার্বন মনোক্সাইড-সহ অসংখ্য ক্ষতিকর রাসায়নিক, যার বেশ কিছু উপাদান ক্যানসার সৃষ্টিকারী হিসাবেও পরিচিত। নিয়মিত এই ধোঁয়ার সংস্পর্শে এলে ফুসফুসের ক্ষতি তো হয়ই, পাশাপাশি হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক এবং শ্বাসযন্ত্রের নানা রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

২০২৩ সালে সারা পৃথিবীতে প্রায় ২৭১ কোটি মানুষ অন্যের তামাকের ধোঁয়ার সংস্পর্শে এসেছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৭৬ কোটি ৭০ লক্ষই শিশু। ওই বছর পরোক্ষ ধূমপানের কারণে সারা বিশ্বে আনুমানিক ১৬ লক্ষ ৬০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, এর ফলে মানুষের প্রায় ৪ কোটি ৪৮ লক্ষ বছর সুস্থ জীবন নষ্ট হয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে হৃদ্‌যন্ত্র ও ফুসফুস। পরোক্ষ ধূমপানের সঙ্গে সম্পর্কিত অসুস্থতার মধ্যে হৃদ্‌রোগের বোঝাই সবচেয়ে বড়, আর শিশুদের ক্ষেত্রে বারবার দেখা দিয়েছে নিম্ন শ্বাসনালির সংক্রমণ। অর্থাৎ অন্যের সিগারেটের ধোঁয়া কয়েক মুহূর্তের জন্য নাকে এসে লাগছে বলে বিষয়টিকে তুচ্ছ করে দেখার কোনও কারণ নেই। সেই সামান্য ধোঁয়াই দীর্ঘদিন ধরে শরীরে ঢুকতে থাকলে তার প্রভাব জমতে জমতে একসময় গুরুতর অসুস্থতা, কর্মক্ষমতা হারানো, এমনকী অকালমৃত্যুর কারণ হয়ে উঠতে পারে।

পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষেত্রে মহিলাদের ঝুঁকির ছবিটিও বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।

পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষেত্রে মহিলাদের ঝুঁকির ছবিটিও বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পূর্ব এশিয়া এবং ওশেনিয়া অঞ্চলে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শে আসার হার প্রায় ৫৯% বেশি। এর নেপথ্যের অন্যতম কারণ হিসাবে ঘরের ভিতরে পুরুষের ধূমপানকে দেখা হচ্ছে। অর্থাৎ একজন পুরুষের ধূমপানের অভ্যাসের প্রভাব অনেক সময় তার নিজের শরীরের গণ্ডি পেরিয়ে স্ত্রী, মা কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যের শরীরেও পৌঁছে যায়। বিশেষ করে যারা দিনের দীর্ঘ সময় বাড়িতে কাটায়, তাদের ক্ষেত্রে এই অনিচ্ছাকৃত ধোঁয়ার সংস্পর্শ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

সমস্যাটি এখানেই যে, পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতি নিয়ে এত তথ্য সামনে আসার পরেও আমাদের চারপাশের বাস্তব ছবিটা খুব একটা বদলায়নি। ভারতে ২০০৩ সালের ‘তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন’-এর চতুর্থ ধারায় জনসাধারণের ব্যবহারের জায়গায় ধূমপান নিষিদ্ধ, আর ২০০৮ সালের বিধিতে ‘জনসাধারণের জায়গা’-র সংজ্ঞার মধ্যে বাস স্টপ, রেলস্টেশন, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কার্যালয়, রেস্তরঁা-সহ বহু স্থানকে স্পষ্টভাবে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ বাস স্টপে দঁাড়িয়ে থাকা অবস্থায় আপনার পাশের মানুষটি সিগারেট ধরালে সেটি শুধু আপনার অসুবিধার বিষয় নয়, আইনেরও লঙ্ঘন।

কিন্তু আইন থাকা আর আইনের নিয়মিত প্রয়োগ– দু’টি এক জিনিস নয়। দেশের ৩৮টি অঞ্চলে করা একটি সমীক্ষায় ২০,৪৫৫টি জনসাধারণের জায়গা খতিয়ে দেখা হয়েছিল; সেখানে মাত্র ৫১% জায়গায় ধূমপান-বিরোধী নিয়মের সম্পূর্ণ মান্যতা পাওয়া গিয়েছিল। আরও তাৎপর্যপূর্ণ: বাস স্টপ, রেলস্টেশন, বাজার, প্রেক্ষাগৃহের মতো মানুষের নিয়মিত যাতায়াতের জায়গায় নিয়ম মানার হার ছিল মাত্র ২৭%। অর্থাৎ যেখানে মানুষের ভিড় সবচেয়ে বেশি, সেখানে সুরক্ষার ফঁাকটাও সবচেয়ে বড়।

পরোক্ষ ধূমপানের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু ধূমপায়ীকে সিগারেট ছাড়ানোর লড়াই নয়, ধূমপান না করা মানুষটির শ্বাসের অধিকার রক্ষার লড়াইও।

এই ব্যর্থতার পিছনে শুধু ধূমপায়ীর অনীহা নয়, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব, স্পষ্ট সতর্কবার্তার অনুপস্থিতি এবং নিয়ম ভাঙলে নিশ্চিতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া না হওয়ার মতো সমস্যাও রয়েছে। ‘জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি’-র সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অবশ্য দেখাচ্ছে যে, আইনের চতুর্থ ধারায় ১ লক্ষেরও বেশি চালান করা হয়েছে। অর্থাৎ ব্যবস্থা একেবারেই নেওয়া হয় না, তা নয়। প্রশ্ন হল, সেই ব্যবস্থা কি এতটাই নিয়মিত ও দৃশ্যমান যে, একজন মানুষ বাসস্ট্যান্ডে সিগারেট ধরানোর আগে দু’বার ভাববে?

তাই পরোক্ষ ধূমপানের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু ধূমপায়ীকে সিগারেট ছাড়ানোর লড়াই নয়, ধূমপান না করা মানুষটির শ্বাসের অধিকার রক্ষার লড়াইও। আইনকে আরও কার্যকর করতে হলে শুধু জরিমানার পরিমাণ বাড়ালেই হবে না; কোথায় ধূমপান নিষিদ্ধ, তা স্পষ্টভাবে জানাতে হবে, নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে হবে এবং আইন ভাঙলে দ্রুত ও নিশ্চিতভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে।

বাস স্টপ, রেলস্টেশন, উদ্যান কিংবা অন্য কোনও জনবহুল জায়গায় ধূমপানকে ‘সামান্য অপরাধ’ বলে এড়িয়ে গেলে চলবে না, কারণ সেই একটি সিগারেটের ধোঁয়া হয়তো পাশে দঁাড়িয়ে থাকা কোনও শিশু, অন্তঃসত্ত্বা মহিলা, হৃদ্‌রোগী কিংবা এমন এক মানুষের ফুসফুসে পৌঁছে যাচ্ছে, যে হয়তো সারা জীবন ধূমপান থেকে দূরে থেকেছে। যে শহরে মানুষ সুস্থ থাকার অভিপ্রায়ে সকালে হঁাটতে বেরয়, যে বাস স্টপে মানুষ কাজের তাগিদে দঁাড়িয়ে থাকে, সেই শহরের বাতাসে অন্তত অন্যের ধোঁয়া থেকে বঁাচার অধিকারটুকু কি মানুষের থাকবে না?

(মতামত নিজস্ব)
লেখক প্রাবন্ধিক
agadityaghosh@gmail.com

Advertisement
দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Tags :
Heart Attack‪‎Smoking
Advertisement
Tags :
Heart Attack‪‎Smoking

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন