দেবীপক্ষমহানগররাজ্যবিদেশখেলালাইফস্টাইল
Nepal

প্রকৃতির রুদ্ররূপ, নেপালে বিপর্যয় এবং জরুরি কিছু প্রশ্ন

প্রকৃতির রুদ্ররূপে বিধ্বস্ত নেপাল আবারও সামনে এনে দিল হিমালয়ের ভয়ংকর ভঙ্গুরতা। হড়পা বানের বিপর্যয়ের আড়ালে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে নেপালের রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং ভারত-চিন ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণ। এই দুর্যোগ তাই শুধু নেপালের নয়, সারা হিমালয় ও ভারতের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
Kishore Ghosh
05:39 PM Sep 01, 2026 IST
প্রকৃতির রুদ্ররূপে বিধ্বস্ত নেপাল আবারও সামনে এনে দিল হিমালয়ের ভয়ংকর ভঙ্গুরতা। হড়পা বানের বিপর্যয়ের আড়ালে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে নেপালের রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং ভারত-চিন ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণ। এই দুর্যোগ তাই শুধু নেপালের নয়, সারা হিমালয় ও ভারতের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
২৬ আগস্টের হড়পা বান নেপালের ইতিহাসে অন্যতম বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

নেপাল একটি সাড়ে বত্রিশ ভাজার দেশ। রাজধানী শহর কাঠমান্ডুতে গেলেই দেশটির
সার্বিক বিশৃঙ্খল অবস্থা সম্পর্কে একটা আঁচ পাওয়া যায়। কাঠমান্ডুর হৃৎপিণ্ড হিসাবে পরিচিত নারায়ণহিতি রাজপ্রাসাদ সংলগ্ন দরবার স্কোয়‌্যার এবং জমজমাট থামেল এলাকা এখনও সন্ধ‌্যা নামলেই নানা জাতের দেশি-বিদেশি সন্দেহভাজন ও অপরাধীদের মুক্তাঞ্চল। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মতোই কাঠমান্ডু-সহ নেপাল মাঝেমধ্যে কেঁপে ওঠে প্রবল রাজনৈতিক ভূমিকম্পেও। কখনও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, আবার গণতন্ত্রকে পরাস্ত করে রাজতন্ত্র ফিরে আসে, প্রাসাদ হত‌্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটে, রাজার মূর্তি ভেঙে কমিউনিস্ট শাসন তৈরি হয়, সেই ব‌্যবস্থাও অল্পদিনে মুখ থুবড়ে পড়ে, ইত‌্যাদি ক্ষমতার পরিবর্তন চলতে চলতে সর্বশেষ নেপাল দেখেছে ‘জেন জি’ বিপ্লব। এতরকম রাজনৈতিক রং বদলের পরেও দেশটির করুণ আর্থ-সামাজিক অবস্থার ছবিটি বিশেষ বদলেছে বলে কেউ দাবি করবে না।

গত ২৬ আগস্টের হড়পা বান নেপালের ইতিহাসে অন‌্যতম বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এই দুর্যোগে ইতিমধ্যে প্রায় হাজারটি মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। চার হাজারের উপর মানুষ নিখোঁজ। ২০১৫ সালে নেপালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পে ন’হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। সব হিসাবনিকাশের পর যদি দেখা যায় যে হড়পা বানে মৃত্যুর সংখ‌্যা ৯ হাজার পার করেছে, তাহলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ নেপালের প্রশাসনিক ব‌্যবস্থা এতটাই শিথিল যে, সাত দিনের কম সময়ে হড়পা বানের ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব কষা একরকম অসম্ভব। সোশ‌্যাল মিডিয়ার দৌলতে গোটা বিশ্ব বিধ্বংসী হড়পা বানটি প্রত‌্যক্ষ করেছে। বস্তুত, প্রকৃতির এই রুদ্ররূপ সমগ্র মানব প্রজাতি কখনও এইভাবে দেখেনি। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া সুনামি বা ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগগুলির খণ্ড খণ্ড চিত্র আমরা নিয়মিত দেখতে পাই। এবার নেপালের তিন জেলা জুড়ে খ‌্যাপা ষাঁড়ের মতো দৌড়ে বেড়ানো হড়পা বানের ছবি মানুষের মোবাইল ক‌্যামেরায় যেভাবে ধরা পড়েছে এবং সোশ‌্যাল মিডিয়ার মধ্যে দিয়ে যেভাবে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে, তার নজির অতীতে নেই।

Advertisement
দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

হড়পা বানটির উৎপত্তি নেপাল-চিন সীমান্তের লাংটাং-লিরুং এলাকায়।

এত বড় দুর্যোগের পর সব দেশই নেপালে উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার আর্জি জানিয়েছিল। এই দলে ভারত তো ছিলই। এই বিপর্যয়ে কত ভারতীয়র মৃত্যু হয়েছে তার সঠিক হিসাব এখনও পাওয়াই সম্ভব হচ্ছে না। নিঃসন্দেহে ভারতীয়দের মৃত্যুর সংখ‌্যাটা অন‌্য যে কোনও দেশের চেয়ে বেশি। কিন্তু দুর্ভাগ্যের হল– নেপাল সরকার কোনও দেশকেই উদ্ধারে হাত লাগাতে দিতে নারাজ। কারণটি ব‌্যাখ‌্যা করেছেন রাষ্ট্র সংঘে নেপালের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত দীনেশ ভাণ্ডারি। তিনি জানিয়েছেন, সীমান্ত সংবেদনশীলতার কারণেই বিদেশি উদ্ধারকারী দলকে অনুমতি দিতে নেপাল সরকারের অনিচ্ছা। আসলে, চিনকে অসন্তুষ্ট না করার কৌশলগত বাধ‌্যবাধকতা থেকেই নেপাল ভারত, আমেরিকা-সহ কোনও দেশের উদ্ধারকারীদের তিব্বত সীমান্তে যেতে দিতে চাইছে না।

তিব্বত সীমান্তে তাদের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব রক্ষা করতেই চিন রসুয়াতে কোনও বিদেশি সংস্থা, বিশেষ করে ভারত ও আমেরিকাকে দেখতে চায় না। শোনা যাচ্ছে, বেজিংয়ের আশঙ্কা ভারত বা আমেরিকার সেনা কিংবা উদ্ধারকারী বাহিনী যদি তিব্বত সীমান্তে উদ্ধার অভিযান চালায় তবে তারা ওই কৌশলগত পাহাড়ি এলাকার সমস্ত তথ‌্য সংগ্রহ করে নেবে। চিন-অধিকৃত তিব্বতের জুরং এলাকাতেও হড়পা বানের ব‌্যাপক প্রভাব পড়েছে। সেখানেও প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চিনের তৎপরতায় সেই তথ‌্যও মিলছে না বলে সন্দেহ দানা বেঁধেছে।

হড়পা বানটির উৎপত্তি নেপাল-চিন সীমান্তের লাংটাং-লিরুং এলাকায়। এখানে কোনও একটি পাহাড়ে শিলাধস ও বরফধসের ফলেই হড়পা বানটির সৃষ্টি হয়েছে। ভূতাত্ত্বিকরা শিলা ও বরফ ধসের এই ঘটনাকে ‘স্টার্জস্ট্রম’ বলে থাকেন। এক্ষেত্রে খুব উঁচু পর্বতমালায় একটি ঝুলন্ত শিলা হিমবাহ সমেত হঠাৎ ভেঙে পড়ে। নেপালে ৬ লক্ষ ২০ হাজার বর্গমিটার এলাকা জুড়ে একটি ঝুলন্ত পাহাড় বরফের স্তূপ সমেত ভেঙে পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রচুর পরিমাণে পাথর ও বরফ একসঙ্গে মাটির উপর ভেঙে পড়ায় এর গতিবেগ প্রবল হয়। তিব্বত সীমান্তে লেন্দে খোলা নদীর উপর এটা ভেঙে পড়ার পর কয়েক মিনিটের মধ্যে পাথর, কাদা ও বরফের বিশাল স্রোত ভয়ংকর গতিতে ভোটে কোশী ও ত্রিশূলী নদীর অববাহিকা ধরে নেমে এসে ধ্বংসলীলা চালায়। ঠিক এমন ‘স্টার্জস্ট্রম’-এর ঘটনা ঘটেছিল ২০২১ সালের উত্তরাখণ্ডের চামোলিতে। হিমালয় বেলেপাথর ও চুনাপাথরের নবীন ও ভঙ্গুর পর্বতমালা।

শুধু মধ‌্য হিমালয়েই ১৯৭০ সালের পর থকে ২০ শতাংশ হিমবাহ গলে গিয়েছে।

এই ধরনের শিলাধসের ঘটনা যে সেখানে ঘটতেই থাকবে তা বলাই বাহুল‌্য। এর সঙ্গে বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে হিমালয়ে প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে ‘গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’ তথা ‘গ্লোফ’। এই ‘গ্লোফ’ হল হিমবাহের হ্রদ বিস্ফোরণ ঘটে হওয়া বন‌্যা। গত কয়েক দশকে হিমালয়ে কয়েকশো ‘গ্লোফ’ ঘটেছে। শুধু মধ‌্য হিমালয়েই ১৯৭০ সালের পর থকে ২০ শতাংশ হিমবাহ গলে গিয়েছে।

হিমালয় যখন আমাদের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে দাঁড় করিয়েছে তখন তিব্বতকে সামনে রেখে চিনের এইভাবে হিমালয়ের একটি বড় অংশে একক আধিপত‌্য বিস্তারের প্রচেষ্টা ফের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। নেপালের ঘটনার পর এর প্রাসঙ্গিকতা বেড়েছে। অরুণাচল প্রদেশের উপরে তিব্বতে ব্রহ্মপুত্রের উচ্চ অববাহিকায় চিন ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছে। ভারত এ নিয়ে বিস্তর আপত্তি জানানোর পরও চিন এই কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ভারত একে ‘জলবোমা’ হিসাবে দেখছে। ভবিষ‌্যতে যে কোনও মুহূর্তে সেটি ফেটে ব্রহ্মপুত্রে এরকমই আচমকা বান আসতে পারে। নেপালের ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে চিন তাদের সীমান্তে থাকা হিমবাহগুলি সম্পর্কে সঠিক সময় তথ‌্য দিচ্ছে কি না।

এবারের উদ্ধারকাজে কাউকে অংশ নিতে না দেওয়ার মতো চিনের সবক্ষেত্রে তথ‌্য গোপনীয়তা রক্ষার চেষ্টা ও দাদাগিরি ভবিষ‌্যতে আরও ভয়ংকর প্রাকৃতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা ভারতের। ‘ব্রিক্‌স’-এর শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষে ভারতে সফরে আসছেন চিনের প্রসিডেন্ট শি জিনপিং। তাঁর সফরে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ভারত হিমালয়ের সুরক্ষার মতো বিষয়গুলি উত্থাপন করবে বলে শোনা যাচ্ছে। ফলে নেপালের দুর্যোগ এবার ভারত-চিন সম্পর্কেও ছায়া ফেলতে চলেছে।

bapi.pratidin@gmail.com

Advertisement
দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Tags :
NepalNepal Flood
Advertisement
Tags :
NepalNepal Flood

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন