দেবীপক্ষমহানগররাজ্যবিদেশখেলালাইফস্টাইল
Fitness for All

'ফিটনেস ফর অল', স্বাস্থ্য ও সক্রিয়তার সংস্কৃতি

ভারতীয় ঐতিহ্যে যোগব‌্যায়াম শরীর ও মনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। যোগকে শুধু কয়েকটি আসনের সমষ্টি হিসাবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা যায় না।
Kishore Ghosh
03:39 PM Sep 28, 2026 IST
ভারতীয় ঐতিহ্যে যোগব‌্যায়াম শরীর ও মনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। যোগকে শুধু কয়েকটি আসনের সমষ্টি হিসাবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা যায় না।
বর্তমানে শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা।

‘ফিটনেস ফর অল’-এর বার্তা আর শুধু স্লোগান নয়, সুস্থ ভবিষ্যতের দাবিতে গড়ে ওঠা এক জরুরি সামাজিক আন্দোলন। সেপ্টেম্বরের এই বার্তা যেন সেপ্টেম্বরেই থেমে না যায়। লিখছেন শেখর সাহা।

সেপ্টেম্বর জুড়ে ‘ফিটনেস ফর অল’-এর বার্তা আমাদের মনে করাচ্ছে একটি অত্যন্ত সহজ অথচ গভীর সত্য: সুস্থ থাকা জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। ‘ফিটনেস’, ‘প্রিভেনটিভ হেল্‌থ’– এসব শব্দ তুলনায় আধুনিক। কিন্তু এর মূল ভাবনা মোটেই নতুন নয়। হাজার বছর আগে মানুষ উপলব্ধি করেছিল যে শরীরকে সচল রাখা, পরিমিত খাদ্য গ্রহণ এবং সুশৃঙ্খল জীবনযাপন সুস্থ থাকার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসাশাস্ত্র আয়ুর্বেদে স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য দৈনন্দিন জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, বিশ্রাম ও শরীরচর্চায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। চরক ও সুশ্রুতের চিকিৎসাচিন্তায় রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য সংরক্ষণের কথাও পাওয়া যায়।

Advertisement
দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

বিশেষ করে সুশ্রুত বয়স, শক্তি ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী পরিমিত ব্যায়ামের কথা বলেছিলেন। অতিরিক্ত শরীরচর্চা যে ক্ষতিকারক হতে পারে, সেই সতর্কবার্তাও দিয়েছিলেন। যোগচর্চার মধ্যেও শরীর, মন ও শ্বাস-প্রশ্বাসকে সমন্বিত রাখার যে দর্শন রয়েছে, তার সঙ্গে আধুনিক ‘হোলিস্টিক হেল্‌থ’ অর্থাৎ, ‘সুস্থ শরীর, সুস্থ মন এবং সুশৃঙ্খল জীবন’—এই ভাবনা আমাদের ঐতিহ্যের মধ্যেও বহু পুরনো।

রোজ ৩০ মিনিট দ্রুত হঁাটা, সাইকেল চালানো, সঁাতার বা নিয়মিত খেলাধুলার মতো অভ্যাস দিয়েই শুরু করা যায়।

ভারতীয় ঐতিহ্যে যোগব‌্যায়াম শরীর ও মনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। যোগকে শুধু কয়েকটি আসনের সমষ্টি হিসাবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা যায় না। শ্বাস-প্রশ্বাস, শরীরের নিয়ন্ত্রণ, মনঃসংযম ও আত্মশৃঙ্খলার সঙ্গে যোগের সম্পর্ক রয়েছে। আমরা যখন শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতার কথাও বলছি, তখন প্রাচীন ভারতীয় এই সমন্বিত স্বাস্থ্যচিন্তার গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করা যায়। শুধু ভারতেই নয়, প্রাচীন গ্রিসেও শরীরচর্চাকে সুস্থ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে দেখা হত। চিকিৎসক হিপোক্রেটিস রোগীর চিকিৎসায় খাদ্য ও জীবনযাপনের পাশাপাশি শারীরিক কার্যকলাপে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। পরে রোমান চিকিৎসক গ্যালেনও ব্যায়ামের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন। প্রাচীন চিনেও শরীরকে সক্রিয় রাখার নানা পদ্ধতির বিকাশ ঘটেছিল। অর্থাৎ ভারত থেকে গ্রিস, রোম থেকে চিন– বিভিন্ন সভ্যতার অভিজ্ঞতায় একটি সাধারণ উপলব্ধি ধরা পড়ে: শরীরকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় রেখে সুস্থ থাকা যায় না।

বর্তমানে শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। ‘ওয়ার্ল্ড হেল্‌থ অরগ‌্যানাইজেশন’-এর মতে– নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপের অভাব হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, ‘টাইপ ২’ ডায়াবেটিস এবং বিভিন্ন রকমের ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ ওজন নিয়ন্ত্রণ, হৃদ্‌যন্ত্র ও ফুসফুসকে কর্মক্ষম রাখতে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও জীবনমান উন্নত করতে সাহায্য করে। ‘হু’-র পরামর্শ, ১৮-৬৪ বছর বয়সি প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ থেকে ৩০০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যকলাপ, অথবা ৭৫ থেকে ১৫০ মিনিট জোরালো শারীরিক কার্যকলাপ করা উচিত। পাশাপাশি সপ্তাহে অন্তত দু’-দিন পেশিশক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম করা উপকারি। রোজ ৩০ মিনিট দ্রুত হঁাটা, সাইকেল চালানো, সঁাতার বা নিয়মিত খেলাধুলার মতো অভ্যাস দিয়েই শুরু করা যায়। ফিটনেসের সবচেয়ে বড় শর্ত: শৃঙ্খলা সহযোগে নিয়মানুবর্তিতা, ব্যয়বহুল সরঞ্জাম নয়।
খেলাধুলো শুধু আনন্দ নয়, জীবন গড়ারও শিক্ষা।

ফিটনেসের প্রয়োজনীয়তা এখন শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; এটি আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য নীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে ফিটনেসের সঙ্গে খেলাধুলোর সম্পর্ক সবচেয়ে গভীর। মাঠে দৌড়ৃনো, ফুটবল খেলা, ক্রিকেট, সঁাতার, সাইকেল চালানো বা অন্য কোনও খেলায় অংশ নেওয়া শিশুর শরীরকে সক্রিয় রাখে। পাশাপাশি খেলা শেখায়– দলগতভাবে কাজ করা, নিয়ম মেনে চলা, অন্যকে সম্মান করা, জয়কে গ্রহণ করা এবং পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার চেষ্টা করা। মাঠ তাই শুধু শরীরচর্চার জায়গা নয়; এটি জীবন শেখারও বিদ্যালয়ও বটে। ‘হু’ ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সি শিশু-কিশোরদের প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৬০ মিনিট শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার পরামর্শ দেয়। এই মুহূর্তে যখন মোবাইল ফোন, ভিডিও গেম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশুদের অবসর সময়ের বড় অংশ দখল করে নিচ্ছে, তখন তাদের মাঠমুখী করা আরও জরুরি। তাই স্কুলে খেলাধুলাকে ‘অতিরিক্ত’ বিষয় হিসাবে না দেখে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে দেখা প্রয়োজন।

ফিটনেস শুধু শরীর নয়, মনের জন্যও জরুরি। আধুনিক জীবনে পড়াশোনা, চাকরি, অর্থনৈতিক চাপ, পারিবারিক সমস্যা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে। নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ উদ্বেগ ও বিষণ্ণতার উপসর্গ কমাতে, ঘুমের মান উন্নত করতে এবং মানসিক সুস্থতা বাড়াতে সাহায্য করে।

ফিটনেসের প্রয়োজনীয়তা এখন শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; এটি আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য নীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ২০১৮ সালে ‘হু’ ‘Global Action Plan on Physical Activity 2018-2030’-এর শপথ নেয়। লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ১৫ শতাংশ কমানো। এই পরিকল্পনায় মানুষকে শুধু ব্যায়াম করার পরামর্শ দেওয়া হয়নি; বরং হঁাটার জন‌্য নিরাপদ রাস্তা, সাইকেল চালানোর সুযোগ, পার্ক ও খেলার মাঠ, স্কুলে শারীরিক শিক্ষা, কর্মক্ষেত্রে সক্রিয়তা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে শারীরিক কার্যকলাপকে যুক্ত করার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

‘ফিটনেস ফর অল’ শুধু একটি স্লোগান নয়, এটি সুস্থ ভবিষ্যতের দাবিতে গড়ে ওঠা সামাজিক আন্দোলন।

‘হু’-র বিভিন্ন পর্যালোচনায় বহু দেশের জাতীয় নীতি, কৌশল ও কর্মপরিকল্পনায় শারীরিক সক্রিয়তাকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি উঠে এসেছে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একটি শহরে যদি হঁাটার নিরাপদ রাস্তা, শিশুদের মাঠ, সাইকেল চালানোর সুযোগ ইত‌্যাদিই না-থাকে, তাহলে ব্যক্তিকে যতই সচেতন করা হোক, বাস্তবে সক্রিয় থাকা কঠিন। ভারতও এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ২৯ আগস্ট ২০১৯, জাতীয় ক্রীড়া দিবসে ‘Fit India Movement’ শুরু করে। উদ্দেশ্য: ফিটনেসকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তোলা এবং আচরণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে মানুষকে আরও সক্রিয় জীবনযাপনে উৎসাহ দেওয়া।
তবে ‘ফিটনেস ফর অল’ সফল করতে হলে শুধু শহরই নয়, এগিয়ে আসতে হবে গ্রাম, মফস্‌সল, পঞ্চায়েত এবং বিভিন্ন পুরসভাকেও। স্থানীয় স্তরে ফিটনেস কর্নার, ওয়াকিং গ্রুপ, যোগাভ্যাস, খেলাধুলার আয়োজন করতে হবে। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রেও দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে থাকার পরিবর্তে ছোট বিরতি, হঁাটা এবং সক্রিয়তার সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার।

প্রাচীন ভারতীয় স্বাস্থ্যচিন্তা থেকে আধুনিক বিজ্ঞান, প্রাচীন গ্রিস, রোম ও চিনের শরীরচর্চার ধারণা থেকে ‘হু’-র বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনা– সময়-ভাষা-পদ্ধতি বদলেছে; কিন্তু মূলকথাটি বদলায়নি: শরীরকে সচল, মনকে ভাল রাখুন। রোগের অপেক্ষা না করে সুস্থ থাকার অভ্যাস গড়ে তুলুন। সে কারণেই এই মুহূর্তে ‘ফিটনেস ফর অল’ শুধু একটি স্লোগান নয়, এটি সুস্থ ভবিষ্যতের দাবিতে গড়ে ওঠা সামাজিক আন্দোলন। সেপ্টেম্বরের এই বার্তা যেন সেপ্টেম্বরেই থেমে না যায়।

(মতামত নিজস্ব)
লেখক সমাজকর্মী
shekharsms@gmail.com

Advertisement
দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Tags :
FitnessWHOYoga
Advertisement
Tags :
FitnessWHOYoga

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন