দেবীপক্ষমহানগররাজ্যবিদেশখেলালাইফস্টাইল
Gurukul Education System

শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসন, 'গুরুকুল' শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণভ্রমর

বিশ্লেষণ করতে পারা বা তলিয়ে ভাবতে পারার ক্ষমতার উপর আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় কোনও দিনই তেমন জোর দেওয়া হয়নি। কিন্তু উপনিষদ এবং বেদান্তের হাত ধরে ‘গুরুকুল’ শিক্ষাব্যবস্থায় ছিল ‘শ্রবণ, মনন, নিদিধ্যাসন’ পদ্ধতি।
Kishore Ghosh
01:56 PM Sep 14, 2026 IST
বিশ্লেষণ করতে পারা বা তলিয়ে ভাবতে পারার ক্ষমতার উপর আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় কোনও দিনই তেমন জোর দেওয়া হয়নি। কিন্তু উপনিষদ এবং বেদান্তের হাত ধরে ‘গুরুকুল’ শিক্ষাব্যবস্থায় ছিল ‘শ্রবণ, মনন, নিদিধ্যাসন’ পদ্ধতি।
গুরুকুল শিক্ষায় জ্ঞান অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি ছিল শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসন।

বিশ্লেষণ করতে পারা বা তলিয়ে ভাবতে পারার ক্ষমতার উপর আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় কোনও দিনই তেমন জোর দেওয়া হয়নি। কিন্তু উপনিষদ এবং বেদান্তের হাত ধরে ‘গুরুকুল’ শিক্ষাব্যবস্থায় ছিল  (Gurukul Education System)‘শ্রবণ, মনন, নিদিধ্যাসন’ পদ্ধতি। মানব বুদ্ধিমত্তাকে উন্নত করার সহায়ক ছিল তা। লিখছেন দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী।

‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ বা ‘এআই’ দ্রুতগতিতে আমাদের চারপাশের অনেক কিছুই বদলে দিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন আগামী ৫ বছরে পৃথিবী হয়তো আমাদের ধারণার থেকেও বেশি বদলে যাবে। কিন্তু মানুষ এই বিপুল বদলের জন্য প্রস্তুত কি না, এখনও অজানা। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গেই বদলে যাচ্ছে শিশু-মনের চাহিদা। ছোট থেকে যারা ‘এআই’-কে সঙ্গী করে বেড়ে উঠবে, তাদের সুশিক্ষার মাপকাঠি কী হবে?

Advertisement
দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নতুন শিক্ষানীতি কীভাবে তৈরি হবে– তাও ভাবার বিষয়। কারণ, আমরা আমাদের ছোটবেলায় প্রাথমিকভাবে মুখস্থবিদ্যার উপরেই জোর দিতাম। অনেক পরে, গবেষণা করতে গিয়ে বুঝেছি যে, বিশ্লেষণ করতে পারা বা তলিয়ে ভাবতে পারার ক্ষমতার উপর আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় কোনও দিনই তেমন জোর দেওয়া হয়নি।

গতানুগতিক, নির্দিষ্ট ছঁাচের উত্তর লিখেছে বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী। ‘আউট অফ দ্য বক্স’ চিন্তা করার ক্ষমতাই আসলে আমাদের নতুন জিনিস আবিষ্কার করতে শেখায়। ‘এআই’ যখন মানব বুদ্ধিমত্তাকেও টেক্কা দেবে, তখন এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিখতে পারার জন্যও আমাদের বোঝার ও বিশ্লেষণ করার ক্ষমতাকে ততটাই বা তার কাছাকাছি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া জরুরি।
এই ‘হায়ার কগনিটিভ স্কিল’ বা ‘উচ্চ চিন্তাশক্তি’ অবধারণ বিশ্লেষণের ক্ষমতাকে বাড়িয়ে তোলার বিষয়ে যদি প্রাচীন ভারতের শিক্ষাদান পদ্ধতির দিকে দৃষ্টি দিই– তবে কয়েকটি জিনিস বিশেষভাবে চোখে পড়ে। উপনিষদ এবং বেদান্তের হাত ধরে গুরুকুলে এসেছে ‘শ্রবণ-মনন-নিদিধ্যাসন’ পদ্ধতি।

শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসন
গুরুকুল শিক্ষায় জ্ঞান অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি ছিল শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসন। প্রথমে গুরুর কাছ থেকে মন দিয়ে শোনা, তারপর যুক্তি ও চিন্তার মাধ্যমে তা বোঝা এবং শেষে গভীরভাবে উপলব্ধি করা– এই ছিল শিক্ষার ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।

শ্রবণ: শুধু শোনা নয়, সক্রিয় শ্রবণ– মনোযোগ দিয়ে শোনা, মনে রাখা এবং বক্তব্যের মূল অর্থ বোঝা। বেদান্তে কোনও শাস্ত্রের মূল বক্তব্য বোঝার জন্য ষড়লিঙ্গ বা ছ’টি লক্ষণের কথা বলা হয়েছে। এগুলিকে শিশুদের চিন্তাশক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তি বিকাশের সহজ পদ্ধতি হিসাবেও ব্যবহার করা যায়।

উপক্রম ও উপসংহার: শুরু ও শেষে কী বলা হয়েছে (মূল বক্তব্য বোঝা)?
অভ্যাস: কোন কথা বারবার এসেছে (স্মৃতি ও প্যাটার্ন রেকগনিশন)?
অপূর্বতা: নতুন কী জানলাম (কৌতূহল ও শেখার আগ্রহ)?
ফল: এই জ্ঞান কীভাবে কাজে লাগবে (প্রয়োগ ও সমস্যা সমাধান)?
অর্থবাদ: এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ (মূল্যায়ন ও মতপ্রকাশ)?
উপপত্তি: এর কারণ বা যুক্তি কী (যুক্তি ও বিশ্লেষণী চিন্তা)?

বৈদিক মন্ত্র সংরক্ষণের জন্য শুধু সরল আবৃত্তি নয়, বিভিন্ন নিয়মবদ্ধ পাঠপদ্ধতি গড়ে উঠেছিল।

মনন: তথ্যের ব্যবচ্ছেদ ও বিশ্লেষণ। ছাত্ররা গুরুর শেখানো তথ্যকে ন্যায় এবং তর্কশাস্ত্রের সাহায্যে বিশ্লেষণ করত। তারা প্রশ্ন তুলত– ‘এই তথ্যটি কেন সত্য?’, ‘এর বিকল্প সম্ভাবনা কী হতে পারে?’, ‘এর নেপথ্যের যুক্তি কী?’ এটি শিশুর মধ্যে ‘Critical Thinking’ বা ‘সমালোচনামূলক চিন্তাধারা’, এবং ‘বিশ্লেষণাত্মক যুক্তিবোধ’ গড়ে তুলত।

নিদিধ্যাসন: মননের পর আসে নিদিধ্যাসন। যুক্তি দিয়ে বিচার করার পরে, সেই জ্ঞানকে নিজের জীবনের অংশ বানিয়ে নেওয়া হত। জ্ঞান যতক্ষণ না প্রজ্ঞায় পরিণত হচ্ছে, ততক্ষণ তা অর্থহীন। নিদিধ্যাসনের মাধ্যমে শিশুরা শিখত কীভাবে অর্জিত তত্ত্বকে দৈনন্দিন কাজ, নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায়।

মৌখিক চর্চা ও স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি
অনেকে মনে করতে পারেন, বৈদিক মন্ত্রের বারবার আবৃত্তি হয়তো শুধুই এক ধরনের মুখস্থবিদ্যা। কিন্তু আধুনিক ‘কগনিটিভ সায়েন্স’-এর দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যায়, এই নিয়মবদ্ধ মৌখিক চর্চার মধ্যে স্মৃতি, মনোযোগ, শব্দের ক্রম মনে রাখা এবং ধরন বা প্যাটার্ন শনাক্ত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ মানসিক দক্ষতার অনুশীলন রয়েছে।

জটিল ও নিয়মবদ্ধ পাঠপদ্ধতি
বৈদিক মন্ত্র সংরক্ষণের জন্য শুধু সরল আবৃত্তি নয়, বিভিন্ন নিয়মবদ্ধ পাঠপদ্ধতি গড়ে উঠেছিল। সংহিতাপাঠ, পদপাঠ, ক্রমপাঠ, জটাপাঠ ও ঘনপাঠ তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এসব পদ্ধতিতে শব্দের ক্রম, উচ্চারণ ও স্বর নির্ভুলভাবে বজায় রাখা হত।
সহজভাবে শব্দের ক্রম যদি হয়–১-২-৩-৪

তাহলে জটাপাঠে পাশাপাশি দু’টি শব্দকে সামনে, পিছনে এবং আবার সামনে পাঠ করা হয়:
১-২-২-১-১-২
২-৩-৩-২-২-৩
৩-৪-৪-৩-৩-৪
এই ধরনের নিয়ম মেনে বারবার শব্দের ‘ক্রম’ মনে রাখা ও পুনর্গঠন করা আধুনিক দৃষ্টিতে মনোযোগ, কার্যকর স্মৃতি, ক্রমবোধ (sequencing) এবং ‘প্যাটার্ন রেকগনিশন’-এর চর্চা হিসাবে দেখা যেতে পারে।

উচ্চতর স্তরের শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনা, প্রশ্নোত্তর ও বিতর্কের চর্চা ছিল।

সংস্কৃত ব্যাকরণ ও নিয়মভিত্তিক চিন্তা
‘গুরুকুল’ শিক্ষায় ব্যাকরণ শুধু ভাষা শেখার মাধ্যম ছিল না। এর মাধ্যমে নিয়ম মেনে চিন্তা করা, যুক্তি দিয়ে সমস্যা সমাধান করা এবং ধাপে ধাপে কোনও কাজ সম্পন্ন করা শেখানো হত। এই দিক থেকে মহর্ষি পাণিনির ‘অষ্টাধ্যায়ী’ একটি অসাধারণ উদাহরণ। পাণিনির ‘অষ্টাধ্যায়ী’-তে প্রতিটি সূত্র

নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে। তাই এগুলিকে আধুনিক ‘রুল-বেস্‌ড সিস্টেম’ বা নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা যায়। একটি মূল শব্দ বা ধাতু থেকে কীভাবে বিভিন্ন প্রত্যয় যোগ করে নতুন শব্দ তৈরি হয়, সংস্কৃত ব্যাকরণে তার নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। শিক্ষার্থীরা এই নিয়মগুলি অনুসরণ করে ধাপে ধাপে শব্দ গঠন করতে শেখে। এর ফলে তাদের ক্রম অনুসরণ, নিয়ম প্রয়োগ এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা তৈরি হয়।

ধ্যান, প্রাণায়াম এবং আবেগীয় নিয়ন্ত্রণ
উচ্চতর মেধার জন্য কেবল বুদ্ধি থাকা-ই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন আবেগীয় স্থিতিশীলতা এবং স্থির মন। গুরুকুল ব্যবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোযোগ নিয়ন্ত্রণকে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে মনে করা হত প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় ধ্যান ও প্রাণায়াম করানো হত। প্রাণায়াম মস্তিষ্কে অক্সিজেনের সরবরাহ বৃদ্ধি করত এবং স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত রাখত।

শাস্ত্রার্থ ও যুক্তিচর্চা
উচ্চতর স্তরের শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনা, প্রশ্নোত্তর ও বিতর্কের চর্চা ছিল। শাস্ত্রের কোনও বিষয় নিয়ে নিজের মতামত ও যুক্তি প্রকাশ করার পাশাপাশি অন্যের বক্তব্য মন দিয়ে শোনা এবং তার যুক্তির দুর্বলতা খুঁজে বের করাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই ধরনের বিতর্ককে ‘শাস্ত্রার্থ’ বলা হত। এর ফলে শিক্ষার্থীরা শুধু নিজের কথা বলতে নয়, অন্যের কথা বুঝতে, প্রশ্ন করতে এবং যুক্তি দিয়ে উত্তর দিতে শিখত। ‘হেত্বাভাস’ বা ভুল যুক্তি চিহ্নিত করার চর্চার মাধ্যমে তারা বুঝতে পারত যে, কোনও বক্তব্য শুনলেই সেটিকে সত্য বলে মেনে নেওয়া উচিত নয়; তার পিছনে যথেষ্ট যুক্তি বা প্রমাণ আছে কি না, সেটিও দেখতে হয়।

শিক্ষার্থীরা যে-জ্ঞান বই বা শাস্ত্র থেকে শিখত, তার ব্যবহারিক দিকও বুঝতে পারত।

প্রমাণের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই
ভারতীয় জ্ঞানচর্চায় কোনও বিষয় ‘সত্য’ কি না– তা বোঝার জন্য প্রমাণ বা জ্ঞানের নির্ভরযোগ্য উৎস নিয়ে আলোচনা করা হত।
প্রত্যক্ষ: নিজের ইন্দ্রিয়র মাধ্যমে সরাসরি কোনও বিষয় জানা বা দেখা।
অনুমান: যুক্তি ও পূর্বজ্ঞান থেকে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো।
উপমান: কোনও পরিচিত জিনিসের সঙ্গে তুলনা করে অজানা বিষয়কে চেনা বা বোঝা।
শব্দ: নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি বা গ্রহণযোগ্য শাস্ত্রের বক্তব্য থেকে জ্ঞান লাভ। এই ধরনের চিন্তার অভ্যাস শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে, তথ্য যাচাই করতে এবং যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে পারে।

জীবনকেন্দ্রিক শিক্ষা
গুরুকুলের শিক্ষা কেবল একটি ঘরের মধ্যে বই পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষার সঙ্গে দৈনন্দিন জীবন, প্রকৃতি, সমাজ এবং ব্যবহারিক কাজের একটি সম্পর্ক ছিল।

তত্ত্ব ও প্রয়োগের সমন্বয়সাধন
শিক্ষার্থীরা যে-জ্ঞান বই বা শাস্ত্র থেকে শিখত, তার ব্যবহারিক দিকও বুঝতে পারত। যেমন– জ্যামিতি ও মাপজোখের জ্ঞান শুল্বসূত্রের মাধ্যমে যজ্ঞবেদি নির্মাণের মতো কাজে ব্যবহৃত হত। একইভাবে প্রকৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে থাকার ফলে গাছপালা, পশুপাখি এবং ঔষধি, উদ্ভিদ সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি হত।
সুতরাং এ কথা বলা যায় যে, আধুনিক শিক্ষা যখন দীর্ঘকাল ধরে তথ্য মুখস্থ করা এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক ফলাফলের উপর নির্ভর করে এসেছে, ‘গুরুকুল’ ব্যবস্থা জোর দিয়েছিল শিশুর ‘উচ্চতর চিন্তাশক্তি’ (Higher Cognitive Skills) গড়ে তোলার উপর। ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’-র যুগে মানব বুদ্ধিমত্তাকে ক্ষুরধার করার জন্য এই পদ্ধতিগুলি যোগ্য হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

(মতামত নিজস্ব)
লেখক গবেষক
goswami.dwaita@gmail.com

Advertisement
দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Tags :
Education
Advertisement
Tags :
Education

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন