যুদ্ধ করে করবি কী তা বল

02:58 PM Nov 19, 2022 |
Advertisement

২০২৩ সালে ‘জি-২০’-র প্রধান কান্ডারি ভারত। বালিতে সদ‌্য হয়ে যাওয়া ‘জি-২০’ সম্মেলনে দেখা গেল, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ-ই সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়। এই সম্মেলনকে কেন্দ্র করে মোদি ২০২৩ সালে রাজ্যে-রাজ্যে ২০০টি ইভেন্ট করবেন। দেশের ভিতর উৎসব-অনুষ্ঠান হোক, কিন্তু তার চেয়ে নরেন্দ্র মোদির কাঁধে অনেক বেশি দায়িত্ব ন’-মাস ধরে চলতে থাকা এই যুদ্ধের অবসানে শান্তির সমাধান-সূত্র বের করতে সাহায‌্য করা। লিখছেন জয়ন্ত ঘোষাল

Advertisement

googletag.cmd.push(function() { googletag.display('div-gpt-ad-1652782001027-0'); });

ক রুশ সাংবাদিক সে-দেশের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে বলেন, সৌদি আরব তো চিরকাল-ই আমেরিকার বন্ধু, শরিক। পুতিন জবাব দেন- চিরকাল? অলওয়েজ?

window.unibots = window.unibots || { cmd: [] }; unibots.cmd.push(()=>{ unibotsPlayer('sangbadpratidin'); });

‘চিরকাল’ শব্দটির-ই আসলে কোনও অস্তিত্ব নেই। ‌‘Always does not exist.’ সৌদির সঙ্গে রাশিয়া সুসম্পর্ক স্থাপন করতে চাইছে ২০১৮ থেকে। পুতিন সৌদি রাষ্ট্রনেতা মহম্মদ বিন সলমনের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন। ৭৭ বছরের ব্রিটিশ সাংবাদিক ও পেশাদার জীবনীকার ফিলিপ শর্ট সম্প্রতি পুতিনের এক জীবন-কাহিনি রচনা করেছেন। তাঁর সে-বইতে ফিলিপ শর্ট পুতিনের এই মন্তব‌্যটি উল্লেখ করেছেন, ‘Always does not exist.’ তারপর ইউক্রেন যুদ্ধ প্রসঙ্গে ফিলিপ বলছেন, পুতিন মনে করেন এ যুদ্ধও চিরস্থায়ী হবে না। মস্কোর সঙ্গে কিয়েভেরও বোঝাপড়া হবেই। এমনকী, আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যেও তিক্ততা কমবে।

Advertising
Advertising

googletag.cmd.push(function() { googletag.display('div-gpt-ad-1652782050143-0'); });

প্রশ্ন হল, সেই তিক্ততাহীন বন্ধুত্ব আবার কতদিন টিকবে? ১৮৪৮ সালে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী লর্ড পামারস্টোন বলেছিলেন, এ পৃথিবীতে ‘স্থায়ী বন্ধু’ বা ‘স্থায়ী শত্রু’ বলে কিছু হয় না। ২০২২-এ ইউক্রেন যুদ্ধের পরেও পুতিন সেই একই কথা বলেছেন। ইন্দোনেশিয়ার বালিতে ‘জি-২০’ রাষ্ট্রনায়কদের সম্মেলন হয়ে গেল।

[আরও পড়ুন: গোধরা-মোরবির মতো ইস্যু কি হারিয়ে যায় মেরুকরণের রঙে?]

২০২৩ সালে এই ‘জি-২০’-র প্রধান কান্ডারি ভারত। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইডোডো-র কাছ থেকে প্রতীকী একটি হাতুড়ি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করলেন মোদি (Narendra Modi)। সকল রাষ্ট্রনায়ক তাঁকে এই দায়িত্ব গ্রহণের জন‌্য স্বাগত জানালেন। তবে এবার ২০২৩-এ মোদির দায়িত্বও অনেক বেশি। ‘জি-২০’-র এবারের সম্মেলনে দেখা গেল, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ-ই সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়। যুদ্ধ কোনও দেশই সমর্থন করে না, কিন্তু রাশিয়ার ইউক্রেন অভিযানের প্রশ্নে উত্তর-দক্ষিণ ভেদাভেদ স্পষ্ট হল। পশ্চিম, এমনকী, ইউরোপের সঙ্গে মস্কোর বিরোধ প্রবল হয়ে উঠল। স্বয়ং পুতিন বালিতে এলেন না। তাঁর বিদেশমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ-কে পাঠালেন। তা, সেই বিদেশমন্ত্রী ঝাঁজালো কণ্ঠে ইউক্রেন আক্রমণের পক্ষে যুক্তি দিলেন। বললেন, এই যুদ্ধ নিয়ে রাজনীতি করবেন না। বালির ঘোষণাপত্রে বলা হল, আন্তর্জাতিক আইনকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে সাফল্যের সঙ্গে। পরমাণু অস্ত্রের ব‌্যবহার হুমকিকে কেউ সমর্থন করবে না।

সেপ্টেম্বর মাসে মোদি পুতিনকে বলেছিলেন, এটা যুদ্ধের যুগ নয় (This is not the era of war)। ভারত বারবার বলছে, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক টেনশন কমাতে হবে। অর্থনৈতিক বৃদ্ধি-হ্রাসের প্রবণতাকে রুখতে হবে। খাদ‌্য ও এনার্জির দাম বৃদ্ধি আটকাতে হবে। মহামারির কুফল দূর করতে হবে। তা নয় আমরা যুদ্ধ করছি। তোরা যুদ্ধ করে করবি কী তা বল?

‘জি-২০’ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে মোদি ২০২৩ সালে রাজ্যে-রাজ্যে ২০০টি ইভেন্ট করবেন। ইতিমধ্যে জয়রাম রমেশের মতো কংগ্রেস নেতা বলেছেন, ভোটের আগে ‘ইভেন্ট ম‌্যানেজার’ দেশজুড়ে ‘জি-২০’ উৎসব পালনের মধ‌্য দিয়ে শক্তিশালী ভারতের অপার মহিমা তুলে ধরার পরিকল্পনা নিয়েছেন। আমার মনে হয়, দেশের ভিতর উৎসব-অনুষ্ঠান হোক, কিন্তু তার চেয়ে নরেন্দ্র মোদির কাঁধে অনেক বেশি দায়িত্ব ন’-মাস ধরে চলতে থাকা এই যুদ্ধের অবসানে শান্তির সমাধান-সূত্র বের করতে সাহায‌্য করা।

ন’-মাস ধরে যুদ্ধ চলছে। রাশিয়া খেরসন থেকে সেনা প্রত‌্যাহার করেছে। ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কি ওই এলাকা পুনর্দখল করেই ঘোষণা করেছেন ‘যুদ্ধ-শেষের শুরু’। ‘ন‌্যাটো’ সমর্থক ইউক্রেন বাহিনীর চূড়ান্ত সাফল‌্য অবশ‌্য আসেনি। সমুদ্র উপকূলে, সাইবার স্পেস, আকাশে ও নানা টার্গেট প্রতিষ্ঠানে বোমাবাজির যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে রাশিয়া।

রাশিয়ার পাশে চিন থাকায় রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদও কার্যত ‘ঠুঁটো’। সাধারণত দেশের অভ‌্যন্তরীণ অর্থনীতি, রাজনীতিজনিত প্রধান সমস‌্যাবলি আর সেসব নিয়ে দেশের মানুষের অভিমত বিদেশনীতিকে প্রভাবিত করে। এজন‌্য মোদি যখন ‘জি-২০’-তে ‘এক পৃথিবী-এক পরিবার-এক ভবিষ‌্যৎ’-এর বার্তা রাখেন, তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। ভারতের বহুত্ববাদী সনাতন দর্শনের শিকড়ের সঙ্গে তা যুক্ত, যদিও দেশে মোদির বিরুদ্ধে এই পরমত গ্রহিষ্ণুতার প্রতি অবহেলার অভিযোগ আছে।

ফিলিপ শর্ট পুতিনের জীবনীতে বলেছেন, রাশিয়ায় কিন্তু যুদ্ধ দেশের ভিতর জাতীয়তাবাদী প্রভাব ফেলে। স্তালিন, ক্রুশ্চেভ, ব্রেজনেভ সব জমানাতে তা-ই হয়েছে। আমেরিকা, চিন, রাশিয়া এই ‘বিগ থ্রি’-র সম্পর্ক রাশিয়ার কাছে তাই গুরুত্বপূর্ণ। ’৭১ সালের নিক্সনের চিন সফরের সময় এখন অতীত। পুতিন মনে করেন, চিন এখন উত্থিত শক্তি। আমেরিকা আগের চেয়ে দুর্বল। এখনই বরং আমেরিকার সঙ্গে ধীরে ধীরে রাশিয়ার বোঝাপড়া সম্ভব।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক এই ধুলোঝড়ে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ‘জি-২০’ তে মোদি কেন শি জিনপিংয়ের সঙ্গে করমর্দন করলেন- এই অভিযোগ দেশের ভিতর যাঁরা তুলছেন, অর্বাচীনের মতো আচরণ করছেন। মোদি ‘জি-২০’ সম্মেলনের কান্ডারি। তিনি এবার ‘সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন’ (এসসিও)-এরও হোতা। চিন ভারতে ‘জি-২০’ ও ‘এসসিও’-তে সরাসরি আসবে, না কি বিদেশমন্ত্রীকে পাঠিয়ে দেবে অথবা ভার্চুয়াল পর্দায় সম্মেলনে যোগ দেবে- তা দেখার। সম্মেলনের ‘হোস্ট’ হিসাবে মোদির কর্তব‌্য প্রত্যেক অতিথিকে সম্মান প্রদর্শন, যাতে আলোচনার সুষ্ঠু পরিবেশ গড়ে ওঠে। শি জিনপিং আর বাইডেন বৈঠক করলেও পারস্পরিক সংঘাত থেকে যায়। কোয়াড গোষ্ঠীর সদস‌্য ভারত। এই বৈঠক দেখে আমাদেরও বুঝতে হবে সংঘাত যতই থাক, এটা পারস্পরিক ‘এনগেজমেন্ট’। আলোচনার পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখা জরুরি। কোয়াড্রিল‌্যাটারাল সিকিউরিটি নিয়ে আলোচনা হয় অস্ট্রেলিয়া, ভারত, জাপান ও আমেরিকার মধ্যে। এই গোষ্ঠী চিনের শিরঃপীড়ার কারণ।

দেখুন, তারপরও বাইডেন-জিনপিং বৈঠক তো হচ্ছে। ভারতকেও এই পথে এগোতে হবে। মোদি ন‌্যাটো-র সদস‌্য না হয়েও আমেরিকার সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করছেন। পুতিনের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করেও যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিচ্ছেন। ইউরোপ-ইজরায়েলের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে যুদ্ধে মধ‌্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ। আবার সৌদি থেকে ইরান, তুরস্ক সকলের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখছেন। একে বলা হচ্ছে ‘ভারত প্রথম’ বিদেশনীতি। ভারতের সার্বভৌম স্বার্থ রক্ষা প্রথম কাজ। আমার তো মনে হয়, এটাই হল সেই সুপ্রাচীন জোট নিরপেক্ষ বিদেশনীতি, যাকে আমরা বলতাম নেহরুর ‘ন‌্যাম’ (নন-অ‌্যালাইন্ড মুভমেন্ট)। তবে এই শব্দটি পরিত‌্যক্ত, কারণ, নেহরু জোট নিরপেক্ষতার কথা বললেও বাস্তবে ভারত ঠান্ডা যুদ্ধে সোভিয়েত শক্তির শরিকস্বরূপ একটি সেফটি ভাল্‌ভ হয়ে ওঠে। ইন্দিরা যুগেও বিদেশনীতিতে এই ভারসাম‌্যহীনতা ছিল।

‘লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স অ‌্যান্ড পলিটিক‌্যাল সায়েন্স’-এর আন্তর্জাতিক ইতিহাসের অধ‌্যাপক টেলর সি শেরম‌ান সম্প্রতি প্রকাশিত ‘নেহরুস ইন্ডিয়া: আ হিস্ট্রি ইন সেভেন মিথস’ গ্রন্থে বলেছেন, নেহরুর জোট নিরপেক্ষ নীতি যে আসলে জোট নিরপেক্ষ নয়, তা প্রমাণিত হয় ঠান্ডা যুদ্ধের দীর্ঘ সময়ে। তাই কার্যত এ নীতি ব‌্যর্থ হয়। তাঁর ভাষায়, ভারতীয় বিদেশনীতি যদি হয় ছ’-গজের একটি শাড়ি, তবে তার আঁচল আর পাড়ে জরির কাজটুকুই ছিল ‘ন‌্যাম’। বাকি কাপড়টা ছিল অন‌্যরকম। ‘জি ২০’ সম্মেলনে মোদির আশু কর্তব‌্য, প্রকৃত জোট নিরপেক্ষ হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধানে সাহায‌্য করা।

[আরও পড়ুন: গোধরা-মোরবির মতো ইস্যু কি হারিয়ে যায় মেরুকরণের রঙে?]

Advertisement
Next