অসীম সাহস, কর্তব্যে অবিচল! মচ্ছরের বীরত্ব বদলে দিচ্ছে 'বীরপুরুষ'-এর সংজ্ঞা?
Subhodeep Mullick
স্মিত মচ্ছরের (Smit Machchhar) মতো পাইলটের বাস্তববোধ, সাহস আর মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই কি বদলে দিচ্ছে 'বীরপুরুষ'-এর পুরনো সংজ্ঞা?
বীরপুরুষ' শব্দটির অনুষঙ্গে অধিকাংশ বাঙালির মনে আসে রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত কবিতা বীরপুরুষ: যে-কবিতায় একটি ছোট্ট ছেলে কল্পনা করছে, সে তার মাকে নিয়ে যাচ্ছে অনেক দূরে। মা যাচ্ছে পালকিতে, দরজা দুটো একটু ফাঁক করে। আর বীরপুরুষ ছেলে যাচ্ছে রাঙা ঘোড়ায় চড়ে, মায়ের পাশে পাশে। এমন সময় সন্ধে হল। সূর্য নামল পটে। দূরে দেখা দিল মরা নদীর সোতা। বেশ গা-ছমছমে ভাব। এমন সময় রব উঠল, হারে রে রে রে রে! একদল ডাকাত এল তেড়ে। মা পালকির মধ্যে ভয়ে চিৎকার করে বলল, যাস না খোকা ওরে। তারপর মা ভয়ে কাঁপছে পালকির মধ্যে। আর ঠাকুর-দেবতা স্মরণ করছে। অর্থাৎ নারীর সাবেকি মূর্তিটি তুলে ধরেছেন রবীন্দ্রনাথ: ত্রাসিত, অসহায়, ভাগ্যের হাতে পুতুল, পুরুষের শক্তি, সাহস, দাপটের কাছে অবনত। ছেলে একা দস্যুদের সঙ্গে যুদ্ধ করে তাদের হারিয়ে দেয়। মাকে উদ্ধার করে। এবং কবিতার শেষে বীরপুরুষ যা বাসনা করে পুরুষশাসিত সমাজে, পৌরুষের যে-স্বীকৃতি সে চায়, ঠিক তাই নিয়ে এলেন রবীন্দ্রনাথ: মা ছোট্ট ছেলেকে কোলে তুলে চুমু খেয়ে বলল- ভাগ্যে খোকা সঙ্গে ছিল!
আরও পড়ুন:
উত্তম-সুচিত্রার প্রথম সুপারহিট ছবি 'অগ্নিপরীক্ষা'-র একটি দৃশ্য ভাবা যেতে পারে। রাত্রে একটি বাগানবাড়িতে পার্টি চলছে। সেই পার্টিতে হঠাৎ কিছু দুর্বৃত্ত ঢুকে পড়ে। তাদের দৃষ্টি সুচিত্রার প্রতি। সুচিত্রার অপমান ও অপহরণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে গিয়ে যারপরনাই অপদস্থ হন জহর রায়। তারপর হিরো উত্তমকুমারের আবির্ভাব এবং দু'-একটা প্রবল ঘুসিতে ডাকাতরা কুপোকাত। সুচিত্রা এগিয়ে এসে বলেন উত্তমকে, আজ বীরের রূপে দেখলাম তোমাকে। নারী বীরের পূজারিনি- এই ভাবটি বিশ্ব সাহিত্যে, সমাজে, সংসারে জাগিয়ে রাখা হয়েছে যুগে যুগে। 'বীরপুরুষ' শব্দটি উচ্চারিত হলেই জেগে ওঠে পৌরুষের জয়ধ্বনি এবং নারীর রোম্যান্টিক কল্পনায় সেই জয়ধ্বনির রণন ও অভিঘাত। এই প্রসঙ্গে মনে এল লর্ড অ্যালফ্রেড টেনিসনের 'দ্য লেডি অফ শ্যালট' কবিতাটি। লেডি অফ শ্যালট বন্দিনী এক দুর্গের মধ্যে। বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই। তার সামনে একটি আয়না। বাস্তবের ছায়া পড়ে সেই আয়নায়।
কিন্তু একদিন তার সামনে ওই মুকুরমায়ায় ঝলসে ওঠে এক বীরপুরুষের আগ্নেয় রূপ। এবং তার মনে হয়, এই বীরের জন্যই তার এত দিনের অপেক্ষা, এই বীরপুরুষই তার নিয়তি। আসল কথাটা হল, ওই বীরপুরুষের সমস্ত শৌর্য-বীর্যের শেষ সার্থকতা নারীর প্রেম, অপেক্ষা ও অর্থের মধ্যেই। তবে এই ভাবধারাকে উল্টে দিয়েছেন বার্নার্ড শ' তাঁর নাটক 'আর্মস অ্যান্ড দ্য ম্যান'-এ। এই নাটকের বীরপুরুষ অত্যন্ত প্র্যাকটিকাল, বাস্তবমুখী আধুনিক হিরো, যে চটজলদি সিদ্ধান্ত নিয়ে, প্রাণের মায়া না করে, অন্যের প্রাণ বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে, হয়ে ওঠে 'ম্যান অফ অ্যাকশন। যেমন, এই মুহূর্তে 'ফ্লাই দুবাই'-এর ভারতীয় বিমানচালক স্মিত মচ্ছর! তিনি নায়ক তাঁর বাস্তববোধ, সাহস, বিদ্যুৎগতি এবং ফ্লায়িং স্কিলের অনন্যতার কারণে। তিনি পুরুষশাসিত সমাজের কাল্পনিক সৃষ্টি নন।