Advertisement

সম্পাদকীয়: মমতার নির্বাচনী প্রজ্ঞা ঈশ্বরপ্রদত্ত

01:58 PM May 08, 2021 |
Advertisement
Advertisement

জয়ন্ত ঘোষাল: আজ আপনাদের কাছে এক অজানা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প শোনাতে চাই। দর্শনে বলে, অবভাস এবং বাস্তবতার মধ্যে সহস্র যোজন দূরত্ব। রাজনেতা, জননেতা বা সেলিব্রিটিদের সম্পর্কে মিডিয়া-সংস্কৃতির আধিপত্য যে ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করে, তা ভাঙতে চাওয়া হয় না। কিন্তু সত্য হল, যে-কোনও সাধারণ মানুষের মতো রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীর প্রকৃতিতেও অনেক স্তর থাকে।

Advertisement

[আরও পড়ুন: সম্পাদকীয়: কোভিড ২.০ এবং ঠেকে শেখা]

১৯৮৪ সালে প্রথম দেখেছিলাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। এরপর কত বছর কেটে গিয়েছে। সেদিনের মমতার রাজনৈতিক চরিত্রের মৌল ডিএনএ অপরিবর্তিত আছে। আবার এবারের বিধানসভা নির্বাচনে বিগত তিনমাসের মহাযুদ্ধের নায়িকাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। ভোটের ফল প্রকাশের পর বারবার মনে হচ্ছে, মমতার নির্বাচনী রাজনীতির প্রজ্ঞা প্রশ্নহীন। একবার তিনি বলেছিলেন, জনসভায় মানুষের চোখ দেখে বুঝতে পারি ভিড়ের ‘পাল্‌স’।

নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ-র মতো দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা, যাঁদের জন্য নাকি বাঘে-গরুতে জল খায়, তাঁরা বুঝতে পারেননি বঙ্গবাসীর মনোভাব, ব্রিগেডের সভার ভিড় দেখে বিভ্রান্ত হল আলিমুদ্দিন স্ট্রিটও। মমতাকে আক্রমণ করে টিভিতে প্রচার পাওয়ায় আহ্লাদিত আবদুল মান্নান, অধীর চৌধুরী, সুজন চক্রবর্তীরা বুঝতেই পারলেন না জনগণেশের ‘মন’!

শুভেন্দু অধিকারী তখন করোনা-আক্রান্ত। হাসপাতালে। আমি তৃণমূল নেত্রীকে বললাম, শুভেন্দুকে ফোন করেছিলেন? তিনি বললেন, ওকে পাইনি। ওর বাবার সঙ্গে কথা বলেছি। আবার ফোন করব। কয়েকদিন পর আবার শুভেন্দু-প্রসঙ্গ পাড়লাম। ততদিনে টিভিতে খবর শুরু হয়ে গিয়েছে, শুভেন্দু কি বিজেপির পথে? বললাম, একবার শুভেন্দুকে ডেকে কথা বলবেন না কি? তিনি বললেন, সৌগতদা, এমনকী অভিষেক ও আরও অনেকে ওর সঙ্গে দেখা করে কথা বলছে। তবে একটা কথা জেনে রাখুন, শুভেন্দু ওদের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে অনেকদিন থেকেই যোগাযোগ রাখছে। ও চলে যাচ্ছেই। আমি মনে করি, যে চলে যেতে চায়, সে চলে যাক। কাউকে জোর করে ধরে-বেঁধে তো রাখা যায় না। ওকে দল কিছু কম দিয়েছে? ও এখন ভাবছে, বিজেপি ক্ষমতায় আসবে। আসল কারণ তো সেটাই। ওই অনুমান, ওই উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে আমি অসত্য প্রমাণ করে দেব। সেদিন, সত্যি কথা বলছি, আমারও মনে হয়েছিল, এটা কি তৃণমূল নেত্রীর ‘ইগো’? রাজনীতিতে তো আপস করতে হয়। পরে বুঝলাম, ‘ইগো’ নয়, এটা ওঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা।

আমাদের, সাংবাদিকদের, নেতাদের জ্ঞান দেওয়ার একটা প্রবণতা তৈরি হয়। আমার সাংবাদিক-জীবনের আদিগুরু বলেছিলেন- জয়ন্ত, মমতাকে জ্ঞান দিতে যাবে না। ওকে ফলো করো। উপদেষ্টা হয়ো না। রাজনীতিটা ও আমাদের সকলের চেয়ে বেশি জানে। ওটা ওর ইনস্টিংকট্। ঈশ্বরপ্রদত্ত!

তাই সৌগতদা, অভিষেক, প্রশান্ত কিশোর শুভেন্দুর সঙ্গে বৈঠক করে ‘গুড জেশচার’ দেখিয়েছিলেন বটে, কিন্তু শুভেন্দু বিজেপিতে যোগ দেওয়ার দু’-তিনমাস আগেই মমতা জানতেন, শুভেন্দু চলে যাবে। এটা প্রশান্ত কিশোরের ইনপুট বা মমতাকে দেওয়া গোয়েন্দাদের রিপোর্ট নয়। এ হল মমতার রাজনৈতিক অ্যাসেসমেন্ট। শুভেন্দু চলে যাচ্ছে বলে মমতা যে খুশি ছিলেন- তা নয়। কিন্তু উনি একবার বললেন, দেখুন প্রতিটি ভোটেই সব দলের কেউ না কেউ জার্সি বদল করে। এ তো শুধু এরাজ্যে নয়, সব রাজ্যেই হয়। চিরকাল হয়েছে। ভবিষ্যতেও হবে। তবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে যুদ্ধের সময় নিজস্ব ডিফেন্স মেকানিজম, বা পালটা দাবার চাল দেওয়ার প্রজ্ঞা মমতার ছিল।

এতক্ষণে নিশ্চয়ই আপনারা বুঝতে পারছেন, আমার প্রতিপাদ্য বিষয় কী? খুব সহজ কথা, কোনও রকেট বিজ্ঞান নয়। মূল বক্তব্য হল, ’৮৪ সাল থেকে এক দীর্ঘ সময় আমরা বলে এসেছি, মমতা আবেগের রাজনীতি করেন। তিনি আবেগতাড়িত হয়ে তাৎক্ষণিকতার শিকার হন, মানুষকে ফেস ভ্যালুতে নিয়ে ঠকেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই স্বতঃস্ফূর্ততার মেঠো রাজনীতিই হল মমতার শক্তির আধার। হাওয়াই চটি, সাধারণ সুতির শাড়ি, ওঁর কথা বলার ভাষা ও ভঙ্গি, নবান্নে জেলায় জেলায় প্রশাসনিক বৈঠকে চণ্ডীমণ্ডপের স্টাইল- এসবই হল মমতার ‘মমতাত্ব’। ভাবুন তো, মমতা যদি স্মৃতি ইরানির মতো সিল্কের শাড়ি পরা শুরু করেন, বৃন্দা কারাটের মতো বড় টিপ, আর সোনিয়া গান্ধীর মতো কালো নিউকাট- তাহলে কেলেঙ্কারি হত কি না! একেই বলে রাজনৈতিক ব্র্যান্ডের পারসেপশন।

কিন্তু এই যে ‘গার্ল নেক্সট ডোর’ ভাবমূর্তি, যা তাঁকে ‘বাংলার নিজের মেয়ে’-তে আবার প্রতিষ্ঠিত করল ২০২১-এ, তার নেপথ্যেও আছেন এক মহিলা চাণক্য। মমতার সেই অজানা-অচেনা স্তরটি আমরা সবাই জানি না। অমিত শাহ-কে চাণক্য বলা হয়, তাঁর সাম-দান-দণ্ড-ভেদ নীতির প্রয়োগ নিয়ে টিভি তো কত ফুটেজ খরচ করেছে, সংবাদমাধ্যম দিল্লি গিয়ে তো কত নিউজপ্রিন্ট খরচ করে পাতাজোড়া সাক্ষাৎকার নিয়েছে- কিন্তু সেসময় মমতা কীভাবে জেলায় জেলায় চুপচাপ ‘চাণক্য’-র মতোই মাইক্রো ম্যানেজমেন্ট করেছেন, তা না সাংবাদিকরা জানত, না বিজেপির শীর্ষ নেতারা। প্রভুভক্ত গোয়েন্দারা অমিত শাহ-কে মমতা সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র জনমতের কথা জানিয়ে যখন নিয়মিত রিপোর্ট পাঠাচ্ছে, মমতা তখন উত্তরবঙ্গে গিয়ে, ঝাড়গ্রামে গিয়ে অন্য ধরনের অপারেশনে ব্যস্ত ছিলেন।

মমতা বলেছিলেন, দেখবেন এবার উত্তরবঙ্গের মানুষ অন্যরকমভাবে ভোট দেবে। ভোটের তিনমাস আগেই কোন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা থেকে একথা বলেছিলেন? আসলে ২০১৯-এ বিজেপির ভোট বৃদ্ধি মমতার জন্য শাপে বর হয়। সেসময় থেকেই তিনি ওই আসনগুলিতে কাজ শুরু করে দেন। একাজে দলের চেয়েও বেশি প্রশান্ত কিশোরের উপর নির্ভর করেছেন, তাতে গোপনীয়তাও বেশি রক্ষা পেয়েছিল। দেখুন, গতবার সুরিন্দর আলুওয়ালিয়া রাজবংশী-কামতাপুরীদের সঙ্গে সখ্য করে তৃণমূলবিরোধী রাজনীতিতে সফলতা অর্জন করেন। এবারও স্বঘোষিত রাজবংশী মহারাজা অনন্ত মহারাজের সঙ্গে অসমের উপমুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা যোগাযোগ করে তাঁকে খুশি করে রাখেন, অসমে এক অজানা ডেরায় তাঁকে রাখা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে এত মামলা থাকা সত্ত্বেও, ভোটের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ অসমে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। মমতা কিন্তু ওঁর সঙ্গে দেখা করেননি। কিন্তু দেখা গেল, অনন্ত মহারাজ অসম থেকে রাজ্যে ফিরে এসে তৃণমূলের হয়ে নীরবে প্রচার শুরু করলেন। তাঁকে মোদির জনসভায় মঞ্চে বসানো হল। কিন্তু শীতলকুচিতে গুলি চলার পর অমিত শাহর মৃত রাজবংশী হিন্দু সম্পর্কে বিবৃতির পালটা বিবৃতি করলেন অনন্ত মহারাজ। কী বললেন তিনি? বললেন, রাজবংশীদের মধ্যে ধর্মীয় মেরুকরণ অনুচিত। রাজবংশীদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান কেন? অনন্ত মহারাজের এহেন অবস্থান বদল, ২০১৯ আর ২০২১-এর এই ফারাক হল কী করে?

ঠিক যেমন ‘গুরুং অপারেশন’। মমতা বুঝেছিলেন, দার্জিলিংয়ের শুধু তিনটি আসন নয়, আসলে উত্তরবঙ্গে প্রায় ১৫টি ‘হোয়াইট ট্রাইবাল’-অধ্যুষিত আসনে গুরুংয়ের প্রভাব আছে। এই সুবিধা মমতা এবার ভোটের ফলে পেয়েছেন। আসন ধরে ধরে দেখুন, বুঝতে পারবেন।
বিজেপি যখন কমিশনকে দিয়ে একের পর এক অফিসার বদল করে উল্লাসধ্বনি দিচ্ছিল, তখন মমতাকে খুব উদ্বিগ্ন দেখিনি। সবশেষে যখন ওঁর নিজের নিরাপত্তা অফিসার অশোক চক্রবর্তীকেই কমিশন সরিয়ে দিল, তখন আমি বিস্মিত হয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে বললাম, এটা তো অদ্ভুত ব্যাপার। আমি দিল্লিতে থেকে এত রাজ্যের ভোট দেখেছি ৩০ বছর ধরে। মুখ্যমন্ত্রীর মত না নিয়ে তাঁর নিজের ব্যক্তিগত অফিসারকে সরানো- এ তো পিতা-পিতামহর জন্মকালেও শুনিনি। আপনি কমিশনের কাছে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে প্রতিনিধি দল পাঠাবেন না? মমতা বললেন, এ তো ঘোর অন্যায়। শুধু আমার ব্যক্তিগত অফিসার বদলের জন্য কেন বলব? সব বদলই তো অগণতান্ত্রিক! তবে ভাল কি জানেন? বিজেপি ভাবছে, আমি পুলিশ দিয়ে ভোট করি। ওরা তাই ভাবুক। আসল ভোট তো আমাকে দেয় মানুষ। এসব বদলি আপনার যেমন ভাল লাগছে না, সব মানুষেরও তাই।

স্থানাভাবে সব কথা বলা আজই সম্ভব নয়। শুধু দু’টি কথা বলে শেষ করি। প্রথমত, কংগ্রেস ও সিপিএমের সঙ্গে মমতার ভোটের আগে বোঝাপড়া করা উচিত ছিল- এমনটা অনেকেই মনে করেছেন। আমারও একটা সময় মনে হয়েছিল, যদি ভোটের পর জোট সরকার গঠনের জন্য বাম-কংগ্রেসকে প্রয়োজন হয়? সেজন্য সোনিয়া, সীতারাম ইয়েচুরি, বিমান বসু- এঁদের সঙ্গে মমতা কোনও যোগাযোগ তৈরি করেছেন? দার্জিলিংয়ের রাজভবনে আবদুল মান্নান রাজ্যপালের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেছেন। তার আগে রাজ্যপাল হুগলিতে ওঁর বাড়ি গিয়েছিলেন। চিরকালের কমিউনিস্ট-বিরোধী অধীর চৌধুররী আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে গিয়ে বৈঠক করেছেন। কিন্তু মমতার সঙ্গে কথা বলে দেখলাম, ওঁর প্রাক-নির্বাচনী বোঝাপড়ায় কোনও আগ্রহ নেই। মমতা বললেন, ওঁদের একটা আসনও দেব কেন? ওঁদের মানুষ সম্পূর্ণ বর্জন করেছে। এটা আমার অ্যাসেসমেন্ট। ওঁদের আরও বেশি করে রাজ্যপালের কাছে যেতে বলুন। রাজ্যপাল ভোটটা করে দেবেন ওঁদের হয়ে। এই ব্যঙ্গ, এই রসিকতা দেখে, সত্যি বলছি, সেদিন মনে হয়েছিল, এটা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস নয় কি? এখন বুঝতে পারছি, এই জোট হলে হয়তো বিজেপির আসন বাড়ত। মমতার আসন কমত। এটা আবেগতাড়িত রাজনীতি নয়। এ হল নির্বাচনী প্রজ্ঞা। মাওবাদী-অধ্যুষিত এলাকা থেকে ছত্রধর মাহাতোকে ভোটের সময় গ্রেপ্তার করার পরও তাঁর বৈদান্তিক উদাসীনতা দেখে অবাক হলাম। বললেন, ছত্রধর দশ বছর জেল খেটেছে। এখন ভোটের সময় গ্রেপ্তার করে কী হবে? দেখুন, এর ফলও উলটো হবে।

আসলে দু’ধরনের রাজনৈতিক নেতা হন। একটা ধরন হল, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আপস করো। পিছিয়ে এসে গোপনে কৌশল রচনা করে। প্রণব মুখোপাধ্যায়, অরুণ জেটলির মতো নেতারাও এই বর্গের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কিন্তু মমতা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও রক্ষণাত্মক না হয়ে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। অতীতেও তিনি সিপিএম বিরোধী লড়াই লড়তে গিয়ে একা হয়ে গিয়েছিলেন। জ্যোতি বসু-নরসিমা রাও-সীতারাম কেশরী-সোমেন মিত্র একদিকে, অন্যদিকে তিনি একা। এবারও দেখলাম, মমতা বনাম সব্বাই। একবার একটি বাংলা চ্যানেলে গিয়ে বলেছিলাম, সমবেতভাবে ওঁকে অভিমন্যুর মতো চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু অভিমন্যু চক্রব্যূহ থেকে বেরনোর পথ খুঁজে পাননি। এটাই দেখার, মমতা এই অসম লড়াইয়ে জেতেন কি না। তিনি দেখিয়ে দিলেন, তাঁর রাজনৈতিক নির্বাচনী প্রজ্ঞা আজ আরও বেশি পরিণত। মমতা হলেন এক জনপ্রিয় চাণক্য। এখানে চাণক্য এক লিঙ্গ-নিরপেক্ষ শব্দ।

[আরও পড়ুন: সম্পাদকীয়: কোভিড ২.০ এবং ঠেকে শেখা]

Advertisement
Next