দেবীপক্ষমহানগররাজ্যবিদেশখেলালাইফস্টাইল

২২ হাজার কোটির দায়, সাড়ে ৬ কোটিতেই নিষ্কৃতি! সুভাষ চন্দ্রের ঘটনায় আতসকাচের তলায় ঋণ-মকুব নীতি

একযুগে দেশান্তরী ঋণখেলাপী ৫৪ ব্যবসায়ী! সুভাষ চন্দ্র অবশ্য আরও ব্যতিক্রমী– তাঁর পক্ষে রয়েছে সরকারি নিদান।
Biswadip Dey
04:08 PM Sep 02, 2026 IST
একযুগে দেশান্তরী ঋণখেলাপী ৫৪ ব্যবসায়ী! সুভাষ চন্দ্র অবশ্য আরও ব্যতিক্রমী– তাঁর পক্ষে রয়েছে সরকারি নিদান।
সুভাষ চন্দ্র। ফাইল ছবি

বাদল অধিবেশনে রাজ্যসভায় অর্থপ্রতিমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধুরীর পেশ করা তথ্য জানাচ্ছে, গত এক যুগে ঋণের টাকা শোধ না করে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন ৫৪ জন ব্যবসায়ী। এঁদের একজনেরও টিকি সরকার ছুঁতে পারবে কি না সন্দেহ। সুভাষ চন্দ্র অবশ‌্য আরও ব‌্যতিক্রমী– তাঁর পক্ষে রয়েছে সরকারি নিদান। 

শেষ পর্যন্ত কী হবে কেউ জানে না, তবে ৭৫ বছর বয়সে থেমে না গিয়ে ‘এসেল গ্রুপ’-এর চেয়ারম্যান ও মিডিয়া ব্যারন সুভাষ চন্দ্র নতুনভাবে জীবন শুরু করবেন জানিয়েছেন। বন্ধুর সংস্থায় কাজ নেবেন। আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে ২-৪ কোটি টাকা ধার নিয়ে ফের প্রমাণ করবেন ফুরিয়ে যাননি।

Advertisement
দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

ক’-দিন ধরেই সুভাষ চন্দ্র খবরের শিরোনামে। ২২ হাজার কোটি টাকারও বেশি বকেয়া ঋণ থাকা কোনও ব্যক্তি বা তাঁর সংস্থা মাত্র সাড়ে ৬ কোটি জমা দিয়ে পার পেয়ে গেলে খবর হওয়ারই কথা। এ দেশের করগোনা কিছু মানুষ এমনই ভাগ্যবান। যদিও সুভাষিত উবাচ– ফতুর হয়ে গিয়েছি, কিন্তু ফুরিয়ে যাইনি। যে-বন্ধুর সংস্থায় কাজ নেবেন ভেবেছেন, তিনি সুইজারল্যান্ডে থাকেন। এই ইঙ্গিতের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট নয় অতঃপর তিনিও দেশত্যাগী হচ্ছেন কি না। হলে সেটা হবে তাঁর প্রতি এদেশের প্রাতিষ্ঠানিক বদান্যতার কারণে। কেননা, ‘জাতীয় কোম্পানি আইন ট্রাইব্যুনাল’ (এনসিএলটি) তাঁর পক্ষে রায় দিয়েছে। অতএব, অন্য ঋণখেলাপিদের মতো রাতের অন্ধকারে মুখ লুকিয়ে তাঁকে দেশ ছাড়তে হবে না। যেতে হলে যাবেন মাথা উঁচু করে।

ক’দিন ধরেই সুভাষ চন্দ্র খবরের শিরোনামে। ২২ হাজার কোটি টাকারও বেশি বকেয়া ঋণ থাকা কোনও ব্যক্তি বা তাঁর সংস্থা মাত্র সাড়ে ৬ কোটি জমা দিয়ে পার পেয়ে গেলে খবর হওয়ারই কথা। এ দেশের করগোনা কিছু মানুষ এমনই ভাগ্যবান।

কী করবেন এখনও তা অস্পষ্ট হলেও দেশবাসীর প্রতি সুভাষ চন্দ্র এক বার্তা দিয়েছেন। বলেছেন, কীভাবে মাত্র ১৭ টাকা সম্বল করে এক সময় তিনি দেশের সেরা ১০ ধনীর একজন হয়েছেন, অর্ধশতাব্দী ধরে তাঁর গড়ে তোলা সাম্রাজ্য দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে, ৫০-৬০ হাজার কোটি টাকা সুদ দিয়েছেন, ৮ হাজার পরিবারের অন্নসংস্থান করেছেন। আর বলেছেন, এখন তিনি কপর্দকশূন‌্য। তাঁর একটা ছোট্ট বাড়ি আছে। সেই বাড়ির একাংশের ভাড়ায় দিন গুজরান হচ্ছে। পাওনাদারদের বকেয়া সাড়ে ৬ কোটি টাকা মিটিয়ে পরিবারের কারও কাছ থেকে ২-৪ কোটি ঋণ নিয়ে কোনও ‘স্টার্ট আপ’ খুলবেন। ফের ভাগ্য পরীক্ষায় নামবেন। ওই বন্ধু ভারতে লগ্নি করলে তদারকি করবেন। হারবেন না। কারণ, তিনি পথিকৃৎ। আবার পথ দেখাবেন। পথ খুঁজে নেবেন।

ভিডিও বার্তাটি বড়ই মোলায়েম। তাঁর কথা শুনতে শুনতে, শরীরী-ভাষা দেখতে দেখতে, সুইজারল্যান্ড চলে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা ভাবতে ভাবতে কারও মনে সেই জনপ্রিয় হিন্দি বাগ্‌ধারাটির উদয় হতেই পারে, ‘শ চুহা খা কর বিল্লি চলি হজ কো।’ এনসিএলটি-র রায় অবশ্যই প্রশ্নাতীত নয়। বরং প্রবলভাবে বিতর্কিত। সেই কারণেই তারা সোমবার রাতে ৫ সদস্যের বেঞ্চ তৈরি করেছে।

শেষ পর্যন্ত কী হবে কেউ জানে না, তবে ৭৫ বছর বয়সে থেমে না গিয়ে ‘এসেল গ্রুপ’-এর চেয়ারম্যান ও মিডিয়া ব্যারন সুভাষ চন্দ্র নতুনভাবে জীবন শুরু করবেন জানিয়েছেন। বন্ধুর সংস্থায় কাজ নেবেন।

সংস্থার ইতিহাসে এই প্রথম এমন সিদ্ধান্ত। ঋণদাতাদের একাংশ– যেমন: এলআইসি হাউসিং ফিনান্স, এইচডিএফসি ব্যাঙ্ক, কানাড়া ব্যাঙ্ক, অ্যাক্সিস ব্যাঙ্ক, ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক, আরবিএল ব্যাঙ্ক বকেয়া মকুব নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। তারা উচ্চতর আপিল আদালতে যাবে, মামলা করবে জানিয়েছে। সুভাষ চন্দ্রর নানা সংস্থাকে দেওয়া ঋণের টাকা অন্যত্র সরানো হয়েছে কি না, ভুয়ো সংস্থা খুলে টাকা লোপাট করা হয়েছে কি না কিংবা ঋণগ্রহীতা ‘ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি’ বা ‘উইলফুল ডিফল্টার’ কি না তা নির্ধারণে ফরেনসিক অডিটের দাবি জানানো হয়েছে। মনে রাখতে হবে, এনসিএলটি-র ১৪৪ পৃষ্ঠার রিপোর্ট স্পষ্ট জানাচ্ছে, সুভাষ চন্দ্রর পরিবারের ঘনিষ্ঠ ৫ সংস্থার ভোটেই এসেল গোষ্ঠীর ৯৯.৯৭ শতাংশ ঋণ মকুব হয়েছে।

ঋণদাতারা ওই ৫ সংস্থার ভোটাধিকারের বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু তা মানা হয়নি। ফলে ৮০.৮১ শতাংশের ভোটে ঋণ মকুবের প্রস্তাবটি এনসিএলটিতে পাস হয়। যার ফলে ২২ হাজার ৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকার বকেয়া ঋণ মকুব হয়ে যায় মাত্র সাড়ে ৬ কোটির বিনিময়ে!
সুভাষ চন্দ্রর দাবি, তিনি ঋণগ্রহীতা নন, ব্যক্তিগত জামিনদার মাত্র। অতএব ওই ২২ হাজার কোটির দায় তাঁর নয়। তাঁর বকেয়ার পরিমাণ ৩ হাজার ৯৯২ কোটি, যার অনেকটা মেটানো হয়েছে, বাকিটাও হবে। ‘মারি তো গণ্ডার, লুটি তো ভাণ্ডার’-তুল্য এমন অসাধ্যসাধন কীভাবে হয়, কী ধরনের উর্বর মস্তিষ্ক এমন সোনার ফসল ঘরে তুলতে পারে, কারা এই সুবিধাভোগী, কোন হিং-টিং-ছট জাদুতে বুক ফুলিয়ে ঋণখেলাপি কেষ্ট-বিষ্টুরা মাথা উঁচু রেখে সমাজে ঘোরাফেরা করে– এসব প্রশ্নে ক’-দিন ধরেই সামাজিক মাধ্যম তোলপাড়। এনসিএলটি-র মূল দুই সদস্যের বেঞ্চ এই মামলায় সহমত হয়নি।

বিরোধীরা বলেছেন, যা হল তা চুল ছাঁটা নয়, মস্তক মুণ্ডন! পলাতক শিল্পপতি বিজয় মালিয়া পর্যন্ত কটাক্ষ করতে ছাড়েননি। সুভাষ চন্দ্রকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, ‘আমার ঋণ ছিল ৬ হাজার ২০৩ কোটি টাকা, কিন্তু আদায় করেছে ১৪ হাজার ১০০ কোটি।’

দু’জন আলাদা মত প্রকাশ করায় মামলাটি যায় তৃতীয় ব্যক্তির কাছে। ‘ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাঙ্করাপসি কোড’-এর অধীন এনসিএলটির বিচার বিভাগীয় সদস্য নীলেশ শর্মা এই বিচার করেছেন। তাঁর নিদান ঋণদাতাদের পাশাপাশি বিস্মিত করেছে আমজনতাকেও। বিরোধীরা এই বিচারে হতবাক ও ক্ষুব্ধ। ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে মিটমাটের জন্য যে-ব্যবস্থাটি প্রচলিত, যাকে অর্থনীতির পরিভাষায় ‘হেয়ার কাট’ বা ‘চুল ছঁাটা’ বলা হয়, তাও লজ্জায় মুখ ঢেকেছে। বিরোধীরা বলেছেন, যা হল তা চুল ছাঁটা নয়, মস্তক মুণ্ডন! পলাতক শিল্পপতি বিজয় মালিয়া পর্যন্ত কটাক্ষ করতে ছাড়েননি। সুভাষ চন্দ্রকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, ‘আমার ঋণ ছিল ৬ হাজার ২০৩ কোটি টাকা, কিন্তু আদায় করেছে ১৪ হাজার ১০০ কোটি।’

সুভাষ চন্দ্র কী করে এমন ভাগ্যবান হলেন সেই ময়নাতদন্ত কিছু দিন চলবে। নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রী হওয়া ও তাঁকে টিকিয়ে রাখার পিছনে ‘জি নেটওয়ার্ক’-এর সমর্থন বহুচর্চিত। এহেন আচরণ থেকেই ‘গোদি মিডিয়া’ শব্দদ্বয়ের জন্ম। ২০১৬ সাল সুভাষ চন্দ্রর জীবনের এক উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। ওই বছর জানুয়ারিতে তাঁর আত্মজীবনী ‘দ্য জেড ফ্যাক্টর: মাই জার্নি অ্যাজ দ্য রং ম্যান অ্যাট দ্য রাইট টাইম’ প্রকাশ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং। ওই বছরের আগস্টেই হরিয়ানা থেকে বিজেপি সমর্থিত নির্দল প্রার্থী হিসাবে তিনি রাজ্যসভায় আসেন। শাসক দলের সঙ্গে মিডিয়া ব্যারনের ঘনিষ্ঠতা প্রাতিষ্ঠানিক বদান্যতার কারণ কি না সেই চর্চাও দিন কয়েক চলবে। তারপর সব আলোচনা একদিন থিতিয়েও যাবে। ঠিক যেভাবে এখন আর চর্চা হয় না বিজয় মাল‌্য, ললিত মোদি, নীরব মোদি, মেহুল চোকসি, সঞ্জয় ভান্ডারি, চেতন ও নীতিন স্যানডেসারা কিংবা যতীন মেহতাদের মতো বাঘা বাঘা ঋণখেলাপি দেশত্যাগীদের নিয়ে। কেউ আর জানতেও চায় না আদৌ ওই পলাতকদের কাউকে দেশে ফেরানো যাবে কি না।

সংসদের বাদল অধিবেশনে রাজ্যসভায় অর্থপ্রতিমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধুরীর পেশ করা তথ্য জানাচ্ছে, গত এক যুগে ঋণের টাকা শোধ না করে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন ৫৪ জন ব্যবসায়ী। এঁদের একজনেরও টিকি সরকার ছুঁতে পারবে কি না সন্দেহ। সুভাষ চন্দ্র অবশ্যই এঁদের মতো নন। সরকারি নিদান এখনও তাঁর রক্ষাকবচ। হয়তো একদিন দেখা যাবে সুইজারল্যান্ড থেকে নবরূপে তিনি আবির্ভূত হলেন, দেউলিয়ার ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে, ফিনিক্স পাখির মতো!
এই অবিশ্বাস্য ঋণ মকুব ও এনসিএলটি-র রায় নিয়ে বিজেপির কেউ রা কাড়েনি। অখুশি পাওনাদারদের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাঙ্কও রয়েছে। তারাও উচ্চতর আপিল আদালতে যাবে ঠিক করেছে। বিজেপির নীরবতা বোঝাচ্ছে, নিয়ম-নীতি অনুযায়ী যা হওয়ার হোক। তারা পক্ষে বা বিপক্ষে কোনও দিকেই নেই। এ নিয়ে কিছু বলা বিপজ্জনক।

কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন ২০২৫ সালের মার্চে লোকসভায় জানিয়েছিলেন, গত ১০ বছরে ১৬ লক্ষ ৩৫ হাজার কোটি টাকার অনাদায়ী শিল্প ঋণ মকুব করা হয়েছে। তুলনায় কৃষি ঋণ মকুবের পরিমাণ বড়জোর ৩ লাখ কোটি। এক যুগ ধরে প্রধানমন্ত্রীকে শুনতে হচ্ছে, শিল্প তাঁর সুয়োরানি, দুয়োরানি কৃষি। ১১ বছর আগে তাঁর সরকারকে ‘সুট-বুট কি সরকার’ কটাক্ষ শুনতে হয়েছিল। ২২ হাজার কোটির এই উপাখ্যান সরকারের শিল্প-ঋণ ও ঋণ-মকুব নীতিকে ফের আতসকাচের নিচে দাঁড় করাবে।

(মতামত নিজস্ব)

Advertisement
দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Tags :
Fraud
Advertisement
Tags :
Fraud

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন