জ্ঞানেশ বিতর্কে শাসক-বিরোধী দাবার চাল, সর্বক্ষণ জল মাপা যে জন্য
Kishore Ghosh
বুধবার সকালে এই নিবন্ধ যখন পড়ছেন, তখনও স্পষ্ট নয়, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের (Gyanesh Kumar) অপসারণের দাবিতে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ কী কী কর্মসূচি গ্রহণ করতে চলেছে। কারণ, গুরুত্বপূর্ণ সেই বৈঠক শুরু হতে এখনও কিছু সময় বাকি। এত দিন ধরে যা হয়ে এসেছে, এবারও তা হতে চলেছে কি না, আন্দোলনের প্রকৃতি নিয়ে প্রত্যেকে সহমত হতে পারবে কি না, সেই সংশয় ক’-দিন ধরেই উঁকি মারছে। এত মোক্ষম একটা হাতিয়ার পাওয়া সত্ত্বেও বিরোধীরা তার সদ্ব্যবহার কতটা করতে পারবে কিংবা আদৌ পারবে কি না– সেই সন্দেহ প্রথম দেখা দেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র ভোট বয়কট করার প্রস্তাবে কেউ সাড়া না দেওয়ায়।
দ্বিতীয় সন্দেহ জাগে সমাজবাদী পাটির নেতা অখিলেশ যাদবের আচরণ এবং আম আদমি পার্টি ও ডিএমকে-র মতো আপাত বিজেপি-বিরোধীদের মনোভাবে। উত্তরপ্রদেশে ভোট আছে বলে অখিলেশ ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠকে যোগ দিতে পারবেন না, কেজরিওয়াল ও স্ট্যালিনও ‘ইন্ডিয়া’-র বাইরে থাকছেন! বিরোধীরা এত ঠেকেও শিখল না কীভাবে জোট বঁাধতে হয়।
আরও পড়ুন:
কমিশনের বিবৃতিই প্রমাণ করেছে, গত ১০ মাস ধরে দুই কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশিকে এড়িয়ে এবং বলতে গেলে অন্ধকারে রেখে জ্ঞানেশ ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
পাশাপাশি বিজেপিকে দেখুন, নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিয়ে রাহুল গান্ধীকে ভুল প্রতিপন্ন করতে কীভাবে তাদের একডজন মুখ্যমন্ত্রী একই সময় নিজ নিজ রাজ্যে একযোগে প্রেস কনফারেন্স করলেন! বিরোধীদের বোঝা উচিত, বিজেপি আর যা-ই হোক তুড়ি মেরে পগাড় পার করার মতো দল নয়।
‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ সাংবাদিক ঋতিকা চোপড়া ইসি-র কাজকর্ম সম্পর্কে যেসব তথ্য জানিয়েছেন, জ্ঞানেশ কুমারের কর্তৃত্ববাদী চরিত্রকে যেভাবে বেনকাব করেছেন, তা যে অক্ষরে অক্ষরে সত্যি, ইসি-র সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনের গৃহীত সিদ্ধান্ত ও সেই সংক্রান্ত বিবৃতিই তার প্রমাণ। ওই বিবৃতিই প্রমাণ করেছে, গত ১০ মাস ধরে দুই কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশিকে এড়িয়ে এবং বলতে গেলে অন্ধকারে রেখে জ্ঞানেশ ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ‘ইআরও’দের অধিকার কেড়ে ‘ইসিআইনেট’-কে দিয়ে ভোটারদের নাম তোলা ও বাদ দেওয়ার ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেছেন। কমিশনের বৈঠকের অ্যাজেন্ডা সান্ধু ও যোশিকে আগাম জানাতেন না জ্ঞানেশ। বৈঠকের কার্যবিবরণী বা ‘মিনিটস’ও বিলি করতেন না।
জ্ঞানেশ কুমার, সান্ধু ও যোশি যদি পদত্যাগ না করেন, তাহলে ইমপিচমেন্ট ছাড়া অন্য কোনওভাবে তঁাদের সরানো যাবে না।
এমনকী, ফর্ম ৬-এও পরিবর্তন এনেছিলেন নিজের ইচ্ছামতো। সান্ধু ও যোশি ১০ মাস ধরে এসব অভিযোগই তো করে আসছিলেন। ঋতিকার স্টোরিই তো তা নিয়েই। তাই না? তা যদি সত্যি না হবে তা হলে কমিশনের বিবৃতিতে এই সব অবশ্যকর্তব্য অতঃপর পালন করা হবে বলে কেন জানানো হল? এই বিবৃতিই বুঝিয়ে দিচ্ছে ১০ মাস ধরে ইসি-তে যা চলছিল তা জ্ঞানেশ কুমারের একনায়কতন্ত্র ছাড়া অন্য কিছু নয়।
আরও দুটো কথা বলা জরুরি। জ্ঞানেশ কুমার, সান্ধু ও যোশি যদি পদত্যাগ না করেন, তাহলে ইমপিচমেন্ট ছাড়া অন্য কোনওভাবে তঁাদের সরানো যাবে না। আর, ইমপিচমেন্ট করার অনুমতি লোকসভার স্পিকার বা রাজ্যসভার চেয়ারম্যান যে দেবেনই, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। দ্বিতীয়ত, এই সরকারের তৈরি আইন তিনজন কমিশনারকে এক চমৎকার ‘ইমিউনিটি’ বা রক্ষাকবচ দিয়েছে। আইন অনুযায়ী, নির্বাচন সংক্রান্ত কোনও সিদ্ধান্তের জন্য তঁাদের বিরুদ্ধে কোনও ফৌজদারি বা দেওয়ানি মামলা করা যাবে না। এমন রক্ষাকবচ দেশের রাষ্ট্রপতি ও রাজ্যপালদেরও কিন্তু নেই! তঁাদের রক্ষাকবচ যত দিন তঁারা ওই পদে থাকছেন তত দিন পর্যন্ত। সারা জীবনের জন্য নয়। রাষ্ট্রপতির যে-রক্ষাকবচ নেই, ইসি সদস্যদের তা দেওয়া হল কেন? নিরপেক্ষতা বিসর্জনের জন্য? প্রশ্নটা উঠে গিয়েছে।
এ কারণেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র প্রস্তাব প্রণিধানযোগ্য। যুক্তিপূর্ণও বটে। অভিজিৎ দিপকে বলেছেন, নির্বাচন পরিচালনা ও ব্যবস্থাই যখন কারচুপিতে ভরা, উদ্দেশ্য যখন শাসক বিজেপিকে জেতানো, তখন সেই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অর্থ তাকে মান্যতা দেওয়া।
বৈধতা দেওয়া। কাজেই সব বিরোধী দলের উচিত এই নির্বাচন-নির্বাচন খেলা বয়কট করা। গড়াপেটা খেলাকে বৈধতা দেওয়ার মানে হয় না।
সর্বোচ্চ আদালত সাহসী হলে সেক্ষেত্রে গত ১০ মাসে হওয়া নির্বাচনগুলি বাতিলও করতে পারে, যেহেতু কমিশনের সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত ছিল না।
যুক্তি অকাট্য হলেও ভোট বয়কটের রাস্তায় হঁাটতে কিন্তু কেউ রাজি নয়। রাজি থাকলে কোনও না কোনও দলের নেতা ওই প্রস্তাবে সায় দিতেন। ফলে এটা ধরে নেওয়া যেতে পারে, ভোট-রাজনীতিতে থাকার বাধ্যবাধকতা মেনেই বিরোধীরা আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করবেন। তা কতটা কার্যকর হবে সেটা অবশ্য অন্য বিষয়।
এটা অনস্বীকার্য, জ্ঞানেশের ইস্তফা দেওয়া না-দেওয়ার বিষয়টি তঁার একার মর্জির উপর নির্ভর করে না। নির্ভরশীল তঁার নিয়োগকর্তার উপর। কেন্দ্র কী করবে, তা নির্ভর করবে বিরোধীরা কতটা চাপ সৃষ্টি করতে পারছে তার উপর। এক্ষেত্রে ‘যন্তর মন্তর ১.০’,
মানে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের ঘটনাটা মাথায় রাখতে হবে। তবে দ্বিতীয় একটি সম্ভাবনাও মনে রাখা প্রয়োজন। জ্ঞানেশদের নিযুক্তি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের হয়েছে। জ্ঞানেশ-বিরোধীদের প্রমাণ করতে হবে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন শতভাগ সত্য, গত ১০ মাসে জ্ঞানেশের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলি অগণতান্ত্রিক, অসাংবিধানিক ও একতরফা ছিল, ফলে তা সংবিধান পরিপন্থী।
সর্বোচ্চ আদালত সাহসী হলে সেক্ষেত্রে গত ১০ মাসে হওয়া নির্বাচনগুলি বাতিলও করতে পারে, যেহেতু কমিশনের সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত ছিল না। সেগুলো ছিল একজনের খেয়ালখুশি মতো নেওয়া। জল্পনা রয়েছে আরও একটি বিষয় নিয়ে। কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের
ডিজি সীমা খান্না, যঁার বিরুদ্ধে সান্ধু ও যোশি ভোটার তালিকায় নাম তোলা ও বাদ দেওয়ার ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার গুরুতর অভিযোগ এনেছেন, তঁার বিরুদ্ধে মামলা করা হলে কী হতে পারে? তিন কমিশনারের মতো আইনি রক্ষাকবচ বা ইমিউনিটি সীমা খান্নার নেই। আদালতে তিনি যদি বলেন, যা করেছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের হুকুমে– তাহলে?
এমন সংকটে মোদি সরকার আগে পড়েনি। জ্ঞানেশ তঁার শঁাখের করাত। তঁাকে ধরে রাখা কঠিন, আবার তঁাকে সরালে বিপদ বাড়বে বই কমবে না।
ঘটনাপ্রবাহ আগামী দিনগুলোয় কোন খাতে বইবে এখনও অজানা। সব পক্ষ, বিশেষ করে বিজেপি ও তার শরিকেরা পরিস্থিতির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে। সবাই বুঝছে– সংকট গুরুতর। বিহার নির্বাচনের আগে রাহুল যখন ভোট চুরির অভিযোগে সরব হয়েছিলেন, তখনকার চেয়ে পরিস্থিতি এখন অনেক বেশি জটিল। তখন পরাজয়ের চিন্তা মমতার মাথায় আসেনি। তেজস্বী সরকার গড়ার স্বপ্নে বুঁদ ছিলেন। স্ট্যালিন ল্যাজেগোবরে হবেন কল্পনা করেননি। রাহুলকে দাবিয়ে রাখাও সহজতর ছিল। এখন বিরোধীদের পাশাপাশি নাগরিক সমাজও বিদ্রোহী। এর চেয়েও বড় কথা, ১০ মাস আগে ‘জেন জি’ বা ‘জেন আলফা’ জাগ্রত ছিল না। বিরোধী রাজনীতিতে তারা এখন ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার হয়ে চোখ রাঙাচ্ছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত তাদের সমীহ করছেন!
৫-৬ মাস আগে পশ্চিমবঙ্গে মমতা অ্যান্ড কোং যখন এসআইআর নিয়ে নিত্য চিলচিৎকার করছিলেন, সুপ্রিম কোর্টের দরজায় মাথা কুটছিলেন, তখন যঁাদের টনক নড়েনি, এখন তঁারা নড়েচড়ে বসেছেন ‘ঘরে’ আগুন লেগেছে দেখে। দিল্লিতে এসআইআর প্রথম কোপে ৪৮ লাখ নাম কেটেছে। মোট ভোটার ১ কোটি ৪৫ লাখ থেকে নামিয়ে ৯৭ লাখে নিয়ে এসেছে। সেই ৯৭ লাখের মধ্যে ৩৩ লাখকে ‘লজিকাল ডিস্ক্রিপেনসি’-র নোটিস ধরানো হয়েছে, যাদের মধ্যে নবতিপর আদবানি থেকে জয়শঙ্কর, রেখা গুপ্ত, জগদীপ ধনখড়, কেজরিওয়ালদের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনার সান্ধুও রয়েছেন। এখন ভিআইপিরা আক্রান্ত।
ফলে অবাক ওপিনিয়ন মেকারেরা বলতে শুরু করেছেন, ডাল মে জরুর বহুত কুছ হি কালা হ্যায়। এমন সংকটের মুখে মোদি সরকার আগে পড়েনি। জ্ঞানেশ তঁার শঁাখের করাত। তঁাকে ধরে রাখা কঠিন, কারণ, তিনি একাই নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা জলাঞ্জলি দিয়েছেন। মানুষ আস্থা হারিয়েছে। আবার তঁাকে সরালে বিপদ বাড়বে বই কমবে না। বিরোধীরা আক্রমণ তীব্রতর তবে। আপাতত প্রতি ক্ষণে জল মাপা হচ্ছে।
(মতামত নিজস্ব)
saumyabandyo@gmail.com