Advertisement

সম্পাদকীয়: কোভিড ২.০ এবং ঠেকে শেখা

05:01 PM May 07, 2021 |
Advertisement
Advertisement

রাজদীপ সরদেশাই: বিগত সাত বছর ধরে, তাঁরা ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ জুটি হিসাবে পরিচিত- নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপির প্রধান নির্বাচনী কৌশলবিদ অমিত শাহ। তাঁদের জুটির আভা যেন অদম্যতার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। যদিও সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তাঁদের এই যৌথ ভাবমূর্তিতে খানিক আঘাত হেনেছে। কোভিড ২.০ সংকট যদি প্রধানমন্ত্রীর প্রশাসনের রীতিকে গুরুতর প্রশ্নের মুখে ফ্যালে, তবে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির পরাজয় অমিত শাহের অপরাজেয়তার অহংকারকে খণ্ডন করল।

Advertisement

[আরও পড়ুন: সম্পাদকীয়: টু ছিঃ অর নট টু ছিঃ]

কোভিড ২.০ অতিমারীর কোনও সহজ সমাধান নেই, এ কাউকেই ছাড়ে না। কিন্তু তবুও কি এটা অস্বীকার করা যায় যে, কোভিডের বাড়বাড়ন্তে কেন্দ্রের রাজনৈতিক কার্যনির্বাহকের ভূমিকা তলানিতে? কুম্ভমেলার মতো সম্ভাব্য সুপার স্প্রেডার আয়োজনই হোক কি চরম বিভ্রান্তিমূলক ভ্যাকসিন নীতি বা অক্সিজেন সরবরাহে ব্যর্থতা- বিপর্যয়ের প্রতিটি বাঁকেই মোদি সরকারের অক্ষমতাই অভিযুক্ত। একটি সর্বশক্তিমান সরকার, যা মাইক্রো ম্যানেজমেন্টে পারদর্শী বলে দাবি করে, তা সমন্বয়, যোগাযোগ স্থাপন ও এক জাতীয় নীতিকে বাস্তবায়নের বিষয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে। কেন্দ্রকে দ্রুততার সঙ্গে কাজ করায় উদ্দীপনা দিতে কোর্টকে বারংবার হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। এই ঘটনা আসলে আমলাতান্ত্রিক শৈলীর ব্যর্থতার প্রকাশ করে, যা আত্মতৃপ্তি এবং ঔদ্ধত্যের নিজস্ব প্রতিধ্বনির গহ্বরে আটকা পড়েছে। বিজেপির সদাসক্রিয় আইটি সেল দ্বারা প্রায়শই ‘পাপ্পু’ বলে উপহাসিত রাহুল গান্ধী কোভিড লড়াইয়ের ক্ষেত্রে বেশিরভাগই সঠিক পদক্ষেপের কথা বলছেন, যা আরও বিব্রত হওয়ার কারণ। এমনকী, বহু প্রশংসিত গুজরাট মডেলেও দেখা যাচ্ছে হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুল্যান্সের সারি। উন্নয়নের এমন দৃষ্টান্তে জনগণের স্বাস্থ্যে যে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ হয়নি, সেই অন্ধকার দিকের এক ভয়ানক স্মৃতি হয়ে থাকল গুজরাট।

প্রচারের সঙ্গে বাস্তবের বিরোধ ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গেও। বিজেপি নির্বাচনে এসেছিল সর্বস্তরে বিজয়ী সেনাবাহিনীর মতো পদার্পণ করতে করতে। সঙ্গে ছিল বিপুল সামর্থ্য, প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন ও মিডিয়ার ঝটিকা অভিযান, যারা বলেছিল, ল্যান্ডস্লাইড ভিক্ট্রি আসছে। ২০১৯ সালের বাংলা নির্বাচনে তাদের প্রাপ্তির নিরিখে বিজেপি নিশ্চিত ছিল, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহজেই পরাজিত হবেন। শাহর কাছে বাংলা বিজয় ছিল ব্যক্তিগত জয়, জাতীয় সংকটে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে তাঁর ভূমিকাটি হেরে গিয়েছিল আক্রমণাত্মক দলীয় প্রচারকের ব্যক্তিত্বের কাছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে যখন তাঁর উচিত ছিল কোভিড বিষয়ে সমস্ত রাজ্যের সঙ্গে সমন্বয় স্থাপন করা, তখন তাঁর সর্বস্ব তৎপরতা ছিল একটি বিরোধী-শাসিত রাজ্য জয় নিয়ে। যখন তাঁর উচিত ছিল মন্ত্রণালয়ে কাজে ডুবে থাকা, তখন তিনি বাংলায় তেড়ে পথসভা করছেন, যেখানে মাস্ক নেই, নেই দূরত্ববিধি।

পুনরায়, এখানেও, সাংঘাতিক বেপরোয়াভাব প্রকাশিত হল বিধানসভার নির্বাচনী তরজায়। কিন্তু, তারা ভুলে গেল, লোকসভা আর বিধানসভার ময়দান এক নয়। তীব্রভাবে বিভেদ সৃষ্টিকারী ‘জয় শ্রীরাম’-এর যুদ্ধ-চিৎকার ২০১৯-এ কাজে দিলেও, আঞ্চলিক রাজনীতির ময়দানে তা তালকাটা ও কটু হয়েই কানে আসছিল। শক্তিশালী, প্রতিশ্রুতিমান কোনও মুখের অভাব তো ছিলই, এমন অবস্থায় মুখ্যমন্ত্রীর তৎকালীন প্রধান সেনাপতিদের নিজেদের দলে টেনে ‘আসল পরিবর্তন’ আনার পরিকল্পনায় আসলে নিজেদেরই সীমাবদ্ধতা ও অবিমৃষ্যকারিতা প্রকাশ পাচ্ছিল। ফলে দেখা গেল- একা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হুইল চেয়ার বনাম বিজেপির পেশিবহুল রথের চাকা- যা বাংলার উপ-জাতীয়তাবাদের ভাষ্যকে আরও জোরদার করল। মাটিতে পা রাখা এবং বাংলাভাষী একজন জননেত্রী বনাম হিন্দিভাষী ‘বহিরাগত’ হয়ে উঠল এই নির্বাচনের তরজা।

তাহলে, এই ‘জোড়ি নম্বর ওয়ান’ কি পশ্চাদপসরণের দিকে? হ্যাঁ, এবং না-ও। অতিমারী সামলানো বিষয়ে মোদি সরকার তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হলেও, প্রধানমন্ত্রী এখনও অত্যন্ত জনপ্রিয় নেতা হয়ে রয়েছেন দেশবাসীর কাছে- যে আবেশ রাতারাতি উবে যাওয়ার নয়। একইসঙ্গে, অমিত শাহও দিন-রাত এক করে উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনে কোমর বেঁধে নামবেন। তাঁদের আসন্ন রাজনৈতিক পতন নিয়ে একটু বেশিই বাগাড়ম্বর হচ্ছে। একুশের বাংলা নির্বাচন আর ’২৪-এ লোকসভা নির্বাচন এক নয়। প্রত্যেকটা নির্বাচনেরই এদেশে পৃথক রূপ, এবং তিন বছর এই ভারতীয় রাজনীতিতে অনেকটা সময়। বহু কিছু ঘটে যাবে।

এরপরেও, ধসে যাওয়া স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কারণে জনগণের জমতে থাকা ধিকি ধিকি আক্রোশকে উপেক্ষা করা মানে তা রাজনৈতিক হঠকারিতাই। এমন স্বাস্থ্য সংকট যেখানে লক্ষাধিক মানুষকে ভেন্টিলেশনে ঢুকিয়ে ছেড়েছে, সেখানে (দিল্লি হাই কোর্টের ভাষায় বললে) কেন্দ্রীয় সরকারের ‘আইভরি টাওয়ার’ অর্থাৎ সুবিধাবাদী আড়ালে থাকাটা একদমই মানায় না। মানুষ যেখানে অক্সিজেন আর আইসিইউ বেড-এর খোঁজে হয়রান, সেই পরিস্থিতিতে তাদের দুর্দশা বোঝা বা তাদের কাছে পেঁৗছনোর সহমর্মী সৎ প্রয়াস খুবই জরুরি। সেখানে আমলা মারফত দুঃখপ্রকাশ বা গা-ছাড়া ব্যবস্থাপনা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বৈরতান্ত্রিক মনোবৃত্তি, যা, যে কোনও সমালোচনাকে ‘দেশ-দ্রোহিতা’ রূপে দাগিয়ে দেয়, সেই মনোভাব এমন অক্সিজেনের আকালে আরও ভয়ংকর। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে তাহলে দেশজুড়ে চিকিৎসাক্ষেত্র থেকে শুরু করে বিজ্ঞান-বাণিজ্য-রাজনীতি বিভিন্ন ক্ষেত্রের মনোজ্ঞ মানুষদের নিয়ে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করার উপায় নিয়ে একজোট হতে বাধা দিচ্ছে কোন বিষয়? এখনই কি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বিকেন্দ্রীকরণের সময় নয়? এখনই কি সময় নয়, বিরোধভাব থাকলেও, এমন সংকটময় সময়ে সকলকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সুরক্ষা সেতু নির্মাণের?

কিন্তু, রাজনৈতিক নেতৃত্বভঙ্গিমায় কঠোর পুরুষালি ভাব থাকা মানেই, সেই নেতৃত্ব ভুল স্বীকার করবে না ও দায়িত্ব গ্রহণে অনিচ্ছুক হবে, এমন কিন্তু নয়। এ-ওর ঘাড়ে দোষ চাপানোর খেলা থেকে সরে এসে এই জুটির উচিত ভুল সংশোধনে ব্রতী হওয়া এবং সেসব স্বীকার করে, পরিবর্তন কীভাবে আনা যায়, সেদিকে সচেষ্ট হওয়া। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী, ড. হর্ষবর্ধন কি পারবেন তাঁর বলা কথার দায়িত্ব নিতে? গত মাসের কথা- রাজ্যগুলি জুড়ে যেখানে ভ্যাকসিনের আকাল নিয়ে শোরগোল উঠেছে, সেই অবস্থায় তিনি ঘোষণা করলেন, ভ্যাকসিনের কোনও অভাবই নাকি নেই! আবার, ইনিই সেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী যিনি কিনা মার্চের শুরুতে বুক বাজিয়ে দাবি করেছিলেন যে, এই অতিমারী নাকি শেষের মুখে! এমন মন্ত্রীসমূহ ও তাঁদের কোর টিমের পদত্যাগ বা বদলি করে আর যাই হোক, ভাইরাসের বিস্তার কমবে না, কিন্তু অন্তত মোদি সরকার যে মানুষের আবেগ নিয়ে চিন্তিত- সেটুকু প্রকাশ করতে পারবে। ‘অ্যচ্ছে দিন’-এর বুদবুদ এতদিনে দেশজোড়া লাশের আগুন আর ছাইয়ে শতছিদ্র হয়ে গিয়েছে- দেশ জানতে চায়, এই অকল্পনীয় ট্রাজেডির দায় কে বহন করবে?

পুনশ্চ কী কী বিষয় আগে গুরুত্ব দিতে হবে, তা কোভিড ২.০ নতুন করে আপৎকালীন তৎপরতায় আহ্বান করছে। গত সপ্তাহের শুরুর দিকে, ক্রিকেটের সর্বোচ্চ ব্যয়বহুল উদ্‌যাপন আইপিএল, মুলতবি হল, কিছু ক্রিকেটারের কোভিড পজিটিভ ধরা পড়ার পর। এমন অতিমারীর সময়ে এমন হাই প্রোফাইল ক্রীড়া উদ্যোগ সবসময়েই তীব্র ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে আরও একটা প্রস্তাব: দেশের রাজধানীতে সেন্ট্রাল ভিস্তা-র এই নির্মাণকার্যই বা থামানো হয় না কেন? এমন মহাড়ম্বরময় দর্পের প্রকল্প, এই স্বাস্থ্য সংকটের দিনে নির্মাণকর্মীদের স্বাস্থ্যের কথা ভেবে সর্বাগ্রে মুলতবি রাখা উচিত নয় কি?

[আরও পড়ুন: সম্পাদকীয়: মমতার হ্যাট্রিক, বাংলার নব জাগরণ]

Advertisement
Next