Advertisement

কণ্ঠে অসামান্য সুর, মেতে থাকতেন নানা শখে, সাহিত্যসত্তার বাইরের Buddhadeb Guha-কে চেনেন?

06:42 PM Aug 30, 2021 |
Advertisement
Advertisement

সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক: ‘এ কোন সকাল/ রাতের চেয়েও অন্ধকার’। সোমবার সকালটা যেন নেমেছিল এভাবেই। তার আগেই সাহিত্য জগতে নেমেছিল অন্ধকার। রবিবার রাত প্রায় সাড়ে ১১ টা নাগাদ এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছেন সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ (Buddhadeb Guha)। সাহিত্য জগতে নেমে এসেছে অকস্মাৎ আঁধার।কিন্তু শুধুই কি সাহিত্য জগতে নেমেছে বিষণ্ণতা? তিনি তো কেবল সাহিত্য জগতের মানুষ ছিলেন না। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী।

Advertisement

সুপুরুষ। অভিজাত। ঋজুদেহী। ব্যক্তিত্ববান। সরল। মেধাবী। কীর্তিমান। এই সবক’টি বিশেষণই প্রযোজ্য  বুদ্ধদেব গুহর ক্ষেত্রে। এক হাতে বাবার তৈরি বিশাল চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (CA) ফার্ম সামলাতেন। অন্য হাতে মেলে ধরেছিলেন সাহিত্যকীর্তি। এক হাতে শিকারের রাইফেল, অন্য হাতে টেনিস র‌্যাকেট। সবটাই অনায়াস দক্ষতায়। একটা মন বলে, চল জঙ্গলে পালাই, আরেকটা মন উসকে দেয় সর্বক্ষণ কাজে ডুবে থাকি। এমনই ছিলেন তিনি। ঘনিষ্ঠরা বলেন, দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ ঘণ্টাই তিনি ব্যস্ত থাকতেন। আর তাই তো লেখালেখির বাইরে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলাতে পেরেছেন বুঝি। অত্যন্ত সরল, মিশুকে, আড্ডাবাজ ছিলেন বুদ্ধদেব গুহ। তাঁর দরবারে সকলের ছিল অবাধ যাতায়াত। উঠতি লেখক-লেখিকাদের অসীম প্রশ্রয় যেমন দিতেন, তেমনই শিক্ষকের মতো শিখিয়ে দিতেন সাহিত্যরচনার খুঁটিনাটি।

[আরও পড়ুন: Exclusive: ‘অরণ্যের মতো সুগন্ধী নারী আর দেখিনি’, একান্ত সাক্ষাতে বলেছিলেন বুদ্ধদেব গুহ]

বাংলার সাহিত্য জগতের তরুণ সাহিত্যিক সায়ন্তন ঠাকুর এই অভিজ্ঞতায় সম্পৃক্ত। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, প্রথম উপন্যাস রচনার আগে কীভাবে সংলাপ লেখা নিয়ে গাইড করেছিলেন বুদ্ধদেব গুহ। তা পরবর্তীকালে তাঁকে কীভাবে সমৃদ্ধ করেছে, সে কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠ কিছুটা কেঁপে গেল। প্রকৃতিপ্রেম, জঙ্গলের প্রতি অমোঘ আকর্ষণ এবং একইসঙ্গে শিকারের নেশা – এ সব মিলিয়েই বুদ্ধদেব গুহ। সায়ন্তন ঠাকুরই এ বিষয়ে জানাচ্ছিলেন তাঁর সঙ্গে সাহিত্যিকের কথোপকথন। আড্ডা চলাকালীন বুদ্ধদেব গুহ তাঁকে দেখিয়েছিলেন শিকারের বন্দুকটি। দু’টি রাইফেলের মধ্যে একটি তিনি অভিনেতা ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়েছিলেন। সেটাও বলেছিলেন। শুনিয়েছিলেন তাঁর শিকার করা ‘ট্রফি’গুলির কথাও। যা নাকি এখনও সাজিয়ে রাখা বসন্ত রায় রোডে, বুদ্ধদেবের পৈতৃক বাড়িতে। গভীর থেকে গভীরতর অরণ্যের শব্দ, গন্ধ, সৌন্দর্য তিনি অনুভব করতেন মর্মে মর্মে। আর সে সব গল্পের ভিতরের গল্প তিনি বলে যেতেন অনর্গল, আপন মনে, সামনে বসে থাকা মানুষটিকে শোনাতেন।

‘শিকারি’র পরিচিত টুপিতে বুদ্ধদেব গুহ

আর ছিল সংগীতের প্রতি অসীম টান। ‘দক্ষিণী’র ছাত্র হলেও কোনওদিন সা-রে-গা-মা-পা’র সপ্তসুরে বেঁধে রাখেননি নিজের সংগীতচর্চা। পুরাতনী গান, রবীন্দ্রসংগীতের চর্চা করে গিয়েছেন আমৃত্যু। এই ‘দক্ষিণী’তে গিয়েই তাঁর সঙ্গে আলাপ প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ঋতু গুহর। সতীর্থের সঙ্গে পূর্বরাগ পর্ব পেরিয়ে শেষমেশ প্রেম, পরিণয়। শোনা যায়, যুবক বুদ্ধদেবের ফরসা-টকটকে রং আর অভিজাত চেহারা দেখে ঋতুদেবীই নাকি বলেছিলেন, পুরুষের এত উজ্জ্বল রং ভাল লাগে না। টেনিস খেলার পরামর্শও দিয়েছিলেন। সঙ্গিনীর কথা শুনেই তিনি টেনিস খেলতে ছুটেছিলেন। ঋতুদেবীর মৃত্যুর পর বড় একলা হয়ে গিয়েছিলেন। বলতেন, ”ওকে সময় দিতে পারিনি। যেদিন এই ঘর থেকে ওকে নিয়ে বেরিয়ে গেল সবাই, সেদিন এক কোনে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে বলেছিলাম, আমার ভুল-ত্রুটি থাকলে ক্ষমা করে দিতে।”

প্রেয়সী ঋতু গুহর সঙ্গে সাহিত্যিক

[আরও পড়ুন: Buddhadeb Guha: বন্ধুর পিঠে খাওয়ার গল্প শোনালেন শীর্ষেন্দু, স্মৃতিমেদুর বাণী বসু, শংকরও]

প্রাণশক্তিতে ভরপুর অশীতিপর এক মানুষের দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হচ্ছিল বছর কয়েক ধরে। বই পড়তে চাইতেন না, শুনতে চাইতেন নবীন লেখকদের রচনা। পরামর্শও দিতেন। তরুণ সাহিত্যিক সায়ন্তন ঠাকুরের কথায়, ”সব দিক থেকে অভিজাত বলতে যা বোঝায়, তার শেষতম ব্যক্তিটি বুদ্ধদেব গুহ।” তাই তাঁর গমনপথও বোধহয় আভিজাত্যে ভরপুর।

Advertisement
Next