পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চের ইতিহাসে নটী বিনোদিনীর মতো কেউ আসেননি

03:15 PM Jan 01, 2022 |
Advertisement

শংকর: স্টার থিয়েটার ও গিরিশচন্দ্র ঘোষের (Girish Chandra Ghosh) সঙ্গে নাট্যকার হিসেবে একদা জড়িত পিতৃদেবের কল্যাণে নটী বিনোদিনীর (Noti Binodini) অভিনয় জীবনের নানা কথা বহু বছর ধরে শুনে আসছি। নাট্যজগৎ সম্বন্ধে বীতস্পৃহ মদীয় পিতৃদেব চাননি তাঁর কোনও সন্তান এই বিপজ্জনক পেশায় আগ্রহী হয়ে উঠুক। কিন্তু ভাগ্যের এমনই রসিকতা, একসময় আমি নাট্যমঞ্চের বিচিত্র জীবন কথার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে ‘সম্রাট ও সুন্দরী’ নামক উপন্যাস রচনা করেছিলাম, যা দুখ ভারাক্রান্ত কয়েকজন নটীর হৃদয় স্পর্শ করে এবং যথাসময়ে নাট্যায়িত হয়ে প্রায় সহস্র রজনী অতিক্রম করে।

Advertisement

এই উপন্যাসের পটভূমি সন্ধানকালে আমি শুনি নটী বিনোদিনীর বিস্তারিত কথা। যিনি ১৯৪১ সাল পর্যন্ত বেঁচেছিলেন এবং রঙ্গমঞ্চ থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসনে চলে গেলেও একসময় তিনি স্টার থিয়েটারে প্রায়ই চলে আসতেন। অভিজ্ঞরা স্টার থিয়েটারের (Star Theatre) দারোয়ানদের বলতেন, উনি বিনোদিনী, ওঁকে কিছু বলবে না, উনি না থাকলে, স্টার থিয়েটার হত না।

এমন আত্মকথা খুব বেশি পাওয়া যায় না

আরও মুখে মুখে শুনেছি, পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চের ইতিহাসে এমন নটী বেশি হয়নি, নিজের কথা নিজে লিখে গিয়ে তিনি যা করে গিয়েছেন তার কোনও তুলনা বিশ্বের প্রায় কোথাও তেমন নেই। একমাত্র তুলনা চলে বিবেকানন্দ-অনুরাগিণী ভুবনবিজয়িনী সারা বার্নাহার্ডের সঙ্গে, যিনি চারশো পাতার আত্মজীবনী ‘মাই ডবল লাইফ’ লিখে সবাইকে বিস্মিত করেছিলেন। দুই ফরাসি অভিনেত্রী সারা বার্নহার্ড ও এমা কালভে সারা মার্কিন দেশকে পায়ের তলায় রেখে, লক্ষ লক্ষ ডলার হেলায় উপার্জন করেও ব্যক্তিগত শান্তির সন্ধানে সন্ন্যাসী বিবেকানন্দের আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন (যেমন করেছিলেন নটী বিনোদিনী ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের পদতলে)। আরও আশ্চর্য, সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ এই দুই রূপলাবণ্যের উর্বশী সম্বন্ধে পরম উৎসাহে কলম ধরেছিলেন এবং একজনের বিশিষ্ট অতিথি হয়ে স্পেশাল ট্রেনে ভ্রমণসঙ্গী হয়েছিলেন।

Advertising
Advertising

আমাদের বিনোদিনীও ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের পরম স্নেহের পাত্রী হবার দুর্লভ সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। আর ফরাসি মনমায়াবিনী এমা যখন বিবেকানন্দ-মহাপ্রস্থানের প্রায় এক দশক পরে কলকাতায় আসেন তখন (১৯১০) স্বয়ং বিবেকানন্দ গর্ভধারিণী ভুবনেশ্বরী দত্ত তাঁকে বেলুড় মঠে নিয়ে গিয়েছিলেন। এবং এমা কালভে সেখানে গান গেয়েছিলেন। আমাদের নটী বিনোদিনীর তেমন সৌভাগ্য হয়েছিল কিনা আমরা ঠিক জানি না। তবে তিনি যে অসুস্থ শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখার জন্য মেমসায়েবের ছদ্মবেশে শ্যামপুকুরে চলে গিয়েছিলেন তার বিবরণ রয়েছে। আরও কিছু কিছু হৃদয়স্পর্শী খবর রয়েছে যা বিনোদিনীর জীবনবৃত্তান্তকে অতুলনীয় করে রেখেছে একালের মানুষের কাছে।

১৯৭১ থেকে আমেরিকায় বেদান্তবাণী প্রচারে নিযুক্ত শ্রীরামকৃষ্ণ মঠের সন্ন্যাসী স্বামী চেতনানন্দ সেন্ট লুইস বেদান্ত সোসাইটি থেকে গিরিশচন্দ্র ঘোষ সম্পর্কে একটি বৃহৎ জীবনকথা ১৯০৯ সালে ইংরেজিতে প্রকাশ করেন। নাট্যকার ও রামকৃষ্ণভক্ত গিরিশ ও তাঁর অভিনয় জগৎ সম্পর্কে এই বইটি নানা কারণে আজও তুলনাহীন। এই বইটির রচনাকালে লেখকের সঙ্গে কিছু ভাব বিনিময়ের সৌভাগ্য হয়েছিল। সেখানে বিনোদিনী দাসীর কথা স্বাভাবিকভাবেই এসেছিল এবং চেতনানন্দের আমেরিকান সহযোগীদের কথাও এসে গিয়েছিল। সম্পাদনায় সহকারিণীরা সে সময় লেখক চেতনানন্দকে বেশ বিপদে ফেলে দিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, বিনোদিনীর জন্ম ১৪৫ কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটে, উত্তর কলকাতার ‘রেডলাইট’ অঞ্চলে। কিন্তু তাকে তো বেশ্যা বলা যায় না কিছুতেই। বিনোদিনী, তারাসুন্দরী, তিনকড়ি এঁরা পতিতাপল্লিতে জন্মালেও কেউই বেশ্যা বলতে যা বোঝায় তা অবশ্যই ছিলেন না।

সারা বানহার্ড

সারা বার্নহার্ডের জীবনীকাররা বলেছেন তিনি জারজ সন্তান, তাঁর জার্মান-ডাচ জননী যে বৃত্তি অবলম্বন করেন তার টেকনিক্যাল নাম ‘ডেমিমন্ডেন’৷ এই শব্দটির অর্থ ঠিক গণিকা পর্যায়ে পড়ে না। অথচ ধনীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে লিপ্ত মহিলা অথবা সন্দেহজনক চরিত্রের বা কিছুটা হীন সামাজিক অবস্থানের স্ত্রীলোক। সেকালের বাংলায় এঁদের বোধহয় বলা হত ‘কেপ্ট’ অথবা ‘রক্ষিতা’। সারা বানার্ডকে বলা হয় উনিশ শতকের সর্বোত্তম ‘ডেমিমন্ডেন’৷
বিনোদিনীর বিচিত্র অভিনয়ধারার বর্ণনা প্রসঙ্গে এসে যায় সারা বার্নহার্ডের কখনও-পুরুষ, কখনও-মহিলার ভূমিকায় অভিনয়ের বিস্ময়কর কথা। নাটকের অন্তিম দৃশ্যে সারার অভিনয় দেখবার জন্য নাট্যপ্রেমীরা চলে আসতেন দূর-দূরান্ত থেকে। বলা হয়, এতবার স্টেজে মৃত্যুবরণ আর কোনও অভিনেত্রী করেনি। লেখা হত: ‘স্টেজে সারার মৃত্যু হয়েছে অন্তত ১০ হাজার বার। এর মধ্যে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছেন ৭ হাজার বার। মাথায় রিভলবারের গুলি লেগেছে পাঁচ হাজার বার।’ ছত্রিশ বছর বয়সে (১৮৮০) তিনি আমেরিকায় প্রথম অভিনয় করতে আসেন, শেষ অভিনয় করেন ৭৪ বছর বয়সে।

আমাদের বিনোদিনীর বিচিত্র অভিনয়জীবনও কম নয়। সেকথায় আমরা আসব, কিন্তু মার্ক টোয়েনের মতামতটা বলে রাখা প্রয়োজন- ‘পৃথিবীতে পাঁচ রকমের অভিনেত্রী আছে। খারাপ অভিনেত্রী, মন্দ নয় অভিনেত্রী, ভালো অভিনেত্রী, মহান অভিনেত্রী এবং অবশ্যই সারা বার্নহার্ড।’ সারার শেষ অভিনয় প্যারিসে ১৯২২ সালে, জীবনের সমস্ত যন্ত্রণা থেকে তাঁর চিরমুক্তি ২৬ মার্চ ১৯২৩ সালে, আমাদের বিনোদিনী তখনও কলকাতায় স্বেচ্ছা নির্বাসিতা হয়ে জীবনযাপন করছেন।

আজকের স্টার থিয়েটার

আরও মিল আছে সারা বার্নহার্ড ও বিনোদিনী দাসীর৷ সারা অভিনেত্রী, চিত্রশিল্পী, নাট্যকার ও লেখিকা। বিনোদিনীও অবিস্মরণীয় আত্মজীবনীর লেখিকা, কবি ও অনন্যা অভিনেত্রী।
সারা বার্নহার্ড, এমা কালভে ইত্যাদি স্বামীজির পঞ্চ মায়াবিনীর কথা আমার ‘আশ্চর্য বিবেকানন্দ’ বইতে এক সময় বিস্তারিত ভাবে লিখেছিলাম, তবে বিনোদিনীর ও গিরিশচন্দ্রের বিস্তারিত কাহিনির জন্য আমি স্বামী চেতনানন্দের ইংরিজি বইয়ের উপরে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল, তিনি বিনোদিনীর আত্মকথার উপর নির্ভর করে ইংরেজিতে অনেক মূল্যবান সংবাদ সরবরাহ করেছেন।

প্রথম খবর, বিনোদিনী ও নরেন্দ্রনাথ দত্তের কলকাতায় জন্ম একই বছরে ১৮৬৩ সালে। বিবেকানন্দের জন্ম সিমুলিয়ার বিত্তবান দত্ত বংশে। বিনোদিনীর মা নিতান্তই গরিব, তবে বস্তিতে দিদিমার ছোট ছোট কয়েকটি কুঁড়েঘর যার ভাড়াই পরিবারের একমাত্র সম্বল। সামান্য ভাড়ায় সংসার চলে না, ফলে পরিবারের সমস্ত গহনা বিক্রি হয়ে যায়। বিনোদিনীর যখন ছ’বছর বয়স, তখন তাঁর ছোটভাইয়ের (বয়স ৫ বছর) বিয়ে হয়ে যায়, পাত্রীর বয়স ২১ বছর৷ বিবাহে কিছু যৌতুক পাওয়া গিয়েছিল।

ছোটভাইয়ের মৃত্যুসম্বন্ধে বিনোদিনী যা লিখে গিয়েছেন তা স্বামী চেতনানন্দ ইংরাজিতে বিশ্ববাসীকে জানিয়েছেন। মা ও দিদিমা শোকে পড়েছেন, ভাইয়ের চিকিৎসার আর্থিক সঙ্গতি ছিল না। বিনোদিনী ও তার ভ্রাতৃবধূকে বাড়িতে ফেলে রেখে তাঁরা চ্যারিটেবল হাসপাতালে পড়ে রইলেন। পড়শিরা বাড়ির দুটো মেয়েকে খাওয়া দিয়ে বাঁচিয়ে রাখলেন। ভয় ছিল মৃতদেহকে কাটাছেঁড়ার জন্য মর্গে নিয়ে যাওয়া হবে, তাই আদরের নাতিকে বুকে নিয়ে দিদিমা ছুটলেন শ্মশান ঘাটে৷ সেখানে আর একজন ডাক্তার বললেন, বোধহয় মৃত্যু হয়নি এখনও, পরীক্ষা করতে হবে। একটু অপেক্ষা করতে হবে।একঘণ্টা মৃতদেহকে বুকে জড়িয়ে দিদিমা পড়ে রইলেন, তারপর কাশী মিত্র ঘাটে দাহ শুরু হল। মায়ের অবস্থা তখন উন্মাদের মতন, তিনি এসে গঙ্গায় ডুব দিলেন, অজানা আশঙ্কায় বালিকা কন্যা বিনোদিনী তাঁর শাড়ি জড়িয়ে ধরলেন। দিদিমাও ততক্ষণে ছুটে এসেছেন নিজের মেয়েকে রক্ষা করতে।

স্বামী চেতনানন্দ লিখেছেন, খুব কমবয়সে বিনোদিনীর নামকাওয়াস্তে বিয়ে হয়েছিল৷ বিনোদিনীর আত্মকথা থেকে উদ্ধৃতি, ‘আমি শুনেছি, এক ফুটফুটে ছেলের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছিল, কিন্তু সে হঠাৎ অদৃশ্য হল, শুনেছি তার খুড়িমা তাকে নিয়ে চলে যায় এবং আবার তার বিয়ে দেন।’

কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটের এক ফ্রি স্কুলে স্বামীপরিত্যক্তা বিনোদিনী দাসী কিছুটা ইংরিজি শেখেন।
৯ বছর বয়সে বিনোদিনীর আলাপ নতুন পড়শি গঙ্গামণির সঙ্গে, সেও অনাথা, কিন্তু প্রতিভাময়ী গাইয়ে এবং এর কাছেই বিনোদিনীর সংগীত শিক্ষা। কয়েকজন ভদ্রলোক এই গঙ্গামণির কাছে মাঝে মাঝে আসতেন, এঁরা বিনোদিনীর সঙ্গে কথা বলতেন এবং সেই সূত্রেই নাটকে বিনোদিনীর আগ্রহ৷

পূর্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও ব্রজনাথ সাহা প্রায়ই গঙ্গামণির গান শুনতে আসতেন, এঁরা তখন ‘সীতার বিবাহ’ সংগীত নাটকের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাঁরাই দিদিমাকে বললেন, আপনার নাতনিকে থিয়েটারে দিন, সামান্য হাতখরচ পাবে, পরে ভালো মাইনে হবে৷

১১ বছর বয়সে নতুন জীবন শুরু হল বিনোদিনীর। তখন ন্যাশনাল থিয়েটারে চারজন অভিনেত্রী রাজা, ক্ষেত্রমণি, লক্ষ্মী ও নারায়ণী। বালিকা বিনোদিনী ভাবতেন, তিনিও এক বিখ্যাত নাট্যশিল্পী হবেন। এঁদেরই একজন নতুন মেয়েকে দুটি ফ্রক কিনে দিয়েছিলেন। শীতবস্ত্র বলতে তখন আর কিছু ছিল না।

সেইসময় বেণীসংহার (শত্রুসংহার?) নাটকের রিহার্সাল চলছিল। বিনোদিনীকে ছোট্ট একটি পার্ট দেওয়া হল- রানী দ্রৌপদীর সখী। ড্রেস রিহার্সালের তারিখ ১২ ডিসেম্বর ১৮৭৪। বিনোদিনীর মনে ভীষণ দুশ্চিন্তা। কিন্তু মা বলে দিয়েছেন, যখনই ভয় পাবে তখনই শ্রীহরিকে স্মরণ করবে। ‘যখন মঞ্চ ছেড়ে চলে আসছি তখন দর্শকদের প্রবল হাততালি, আমি জানতাম না, ভালো অভিনয় হলে হাততালি পড়ে’ লিখেছেন বিনোদিনী তাঁর আত্মকথায়। এর পরের নাটক ‘হেমলতা’-র নায়িকা রাজকুমারী। তখন বিনোদিনীর অঙ্গে রাজনন্দিনীর বেশ, বিনোদিনীর আনন্দের শেষ নেই৷

এরপরই থিয়েটারের কর্তারা পশ্চিমে শো দিতে চললেন। এবার বিনোদিনীর মাসিক মাইনে বাড়াল এবং ঠিক হল তাঁর সঙ্গে গর্ভধারিণী মা যাবেন। ১৮৭৫ সালে কলকাতার বাইরে লখনউয়ে প্রথম অভিনীত নাটকের নাম ‘নীল দর্পণ’, এরপর দিল্লি এবং লাহোর। তিনি কখনও রাধিকা (সতী কলঙ্কিনী), কখনও কামিনী (তপস্বিনী), কখনও কাঞ্চন (সধবার একাদশী), কখনও বা ‘বিয়ে পাগলা বুড়ো’র নায়িকা৷ তখন তাঁর বয়স ১১/১২ বছর৷ সেই সময়কার রসিকতা বিনোদিনী ভোলেননি। বড্ড ছোট্ট, আমরা কামারশালায় নিয়ে গিয়ে ওকে পিটিয়ে একটু লম্বা করে নেব৷

বিনোদিনীর লেখা থেকে স্বামী চেতনানন্দ উদ্ধৃতি দিয়েছেন, ‘এই সময় (লাহোরে) গোলাপ সিং নামে এক ধনবান জমিদার আমাকে বিয়ে করতে চাইলেন এবং মাকে অনেক টাকা দিতে চাইলেন। মা খুব ভয় পেয়ে গেলেন এবং আমাকে নিয়ে তাড়াতাড়ি বৃন্দাবনে চলে এলেন এবং সেখান থেকে কলকাতায়।’

এবার বেঙ্গল থিয়েটারে নতুন চাকরি, মাইনে মাসে ২৫ টাকা। এবার তিনি ‘মৃণালিনী’ নাটকে মনোরমা, ‘কপালকুণ্ডলা’ নাটকে কপালকুণ্ডলা, ‘দুর্গেশনন্দিনী’-তে তিলোত্তমা। মৃণালিনীর অভিনয় দেখতে এসেছিলেন স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র, তিনি মুগ্ধ।

এরপরই অভিনয় জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা। সময় ১৮৭৭ সালের শেষ দিকে, স্বয়ং গিরিশচন্দ্র ঘোষের সান্নিধ্য৷ তখন বিনোদিনীর বয়স ১৪। গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারের মালিক কেদারনাথ চৌধুরী ও তাঁর ম্যানেজার গিরিশ এলেন ‘কপালকুণ্ডলা’ নাটক দেখতে। মুগ্ধ গিরিশ শরৎ ঘোষকে বললেন, বেঙ্গল থিয়েটার থেকে ওকে ছেড়ে দাও, নতুন জায়গায় ওর মাইনে অনেক বেড়ে যাবে। তখন সময় খারাপ, বেঙ্গল থিয়েটার থেকে নিয়মিত মাইনেও পাওয়া যায় না। নতুন থিয়েটারে বিনোদিনীর অভাবনীয় প্রস্ফুটন।এবার তিনি খ্যাতির হিমালয়শিখরে৷ স্বামী চেতনানন্দ লিখছেন তাঁর ইংরিজি গিরিশজীবনীতে- অভাবনীয় ঘটনা, একই ‘মেঘনাদ বধ’ নাটকে পৃথক সাতটি ভূমিকা- চিত্রাঙ্গদা, প্রমীলা, বারুনী, রতি, মহামায়া ও সীতা। ‘মৃণালিনী’ নাটকে গিরিশ তখন পশুপতির ভূমিকায় এবং বিনোদিনী মনোরমা৷

পরবর্তীকালের সাবধানী নাট্য গবেষকরা জানিয়েছেন, বিনোদিনীর প্রথম মঞ্চাবতরণ ১৮৭২-এ নয়, ১৮৭৪-এ। এবং তাঁর শেষ অভিনয় ‘বিবাহবিভ্রাট’ নাটকে বিলাসিনী কারফারমার ভূমিকায়। ‘বেল্লিক বাজার’ নাটকে তিনি রঙ্গিনীর ভূমিকায়। আরও কিছু ভ্রম সংশোধন আছে। ‘মেঘনাদ বধ’ নাটকে তিনি সাতটি নয় ছ’টি ভূমিকা অবতীর্ণ হয়েছিলেন। অন্য কোথাও হয়েছিল বিনোদিনীর সপ্তভূমিকায় অভিনয়। এসব ছোটখাটো বিষয় এড়িয়ে রেখে বলা যায়, বিনোদিনী ৮০টির বেশি নাটকে কম বেশি ৯০টি চরিত্রে অভিনয় করেছেন, তাঁর ১২ বছরের অভিনয়জীবনে। ১৮৭৪ সালের ডিসেম্বরে ‘শত্রুসংহার’ নাটকের দ্রৌপদীর সখী থেকে ১৮৮৭ সালের শেষ অভিনয়ে তিনি দময়ন্তী ও রঙ্গিনীর ভূমিকায়।

বিনোদিনীর অভিনয় জীবনের নানা বর্ণনায় বহু গ্রন্থ এখন মুখরিত। সেসবের বিবরণ দিতে গেলে পুরো একটা বই হয়ে যায়। স্বল্প আকারের এই লেখায় আমরা কেবল দুটি ঘটনার উল্লেখ করতে চাই। বিনোদিনীর অভিনয়জীবনে ধনী রাজস্থানী ব্যবসায়ী গুর্মুখ রায়ের বিস্ময়কর ভূমিকা এবং ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের থিয়েটার দেখতে এসে বিনোদিনীকে আশীর্বাদ।
অভিনেতা নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাই কর্তৃক প্রলোভিত হয়ে গুর্মুখ রায় নামে মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের এক ধনাঢ্য যুবক গিরিশচন্দ্রের কাছে নতুন এক থিয়েটার খুলবার প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন। কিন্তু শর্ত হচ্ছে বিনোদিনীকে গুর্মুখের আশ্রয় গ্রহণ করতে হবে।

অনেকের অনুরোধে, ‘বিনোদিনী তাঁর পূর্ব রক্ষকের আশ্রয় ত্যাগ করে গুর্মুখের আশ্রয় গ্রহণ করেন।’ গুর্মুখ বিডন স্ট্রিটে এক পাকা নাট্যশালা তৈরি করান। কথা ছিল বিনোদিনীর নামানুসারেই নাট্যশালার নাম হবে ‘বি থিয়েটার’৷ কিন্তু কয়েকজনের চক্রান্তে নাট্যশালাটি ‘স্টার থিয়েটার’ নামে রেজিস্ট্রিকৃত হয়। এবং ১৮৮৩-র ২১ জুলাই গিরিশচন্দ্রের ‘দক্ষযজ্ঞ’ দিয়ে স্টার থিয়েটারের দ্বারোদঘাটন হয়।

‘এই বছরের শেষের দিকে ভগ্ন স্বাস্থ্যের কারণে গুর্মুখ তাঁর অর্ধেক স্বত্ব বিনোদিনীকে দিতে চান৷’ কিন্তু গিরিশচন্দ্রের প্রতিবন্ধকতায় বিনোদিনী স্টারের স্বত্ব পেলেন না। মাত্র ১১০০০ টাকায় গুর্মুখ তখন স্টারের স্বত্ব চারজনকে বিক্রি করলেন। ‘সহকর্মীদের দুর্ব্যবহারে বাংলার নাট্যজগত থেকে বিনোদিনী চিরবিদায় নিলেন।’

২১ সেপ্টেম্বর ১৮৮৪ শ্রীরামকৃষ্ণ ‘চৈতন্যলীলা’র অভিনয় দেখতে আসেন। ওই বছরের ১৪ ডিসেম্বর তিনি আবার দেখেন ‘প্রহ্লাদ চরিত্র’ নাটক। ইংরেজি গিরিশ জীবনীতে স্বামী চেতনানন্দ লিখছেন, এক সময় গুর্মুখ তাঁর রক্ষিতাকে ৫০ হাজার টাকা দিতে চেয়েছিলেন৷ বিনোদিনী থিয়েটারের পালা চুকিয়ে দেন, কিন্তু অভিনয়জীবন বিনোদিনী থেকে সরে আসতে চাননি৷ আরও জানা যাচ্ছে, শ্রীরামকৃষ্ণ যখন থিয়েটার দেখতে এলেন তখন বিনোদিনীর বয়স ২০৷

১৮৮৬-এর আগস্ট মাসে শ্রীরামকৃষ্ণের মহানির্বাণ এবং পরের বছরের শুরুতেই নটী বিনোদিনীর মঞ্চ ত্যাগ। ১৮৯০ সালে তাঁর কন্যার জন্ম, তার অকালমৃত্যু ১৯০৩ সালে। যে ধনপতির আশ্রয়ে বিনোদিনী তখন ছিলেন তাঁর দেহাবসান ১৯১২ সালে। বিনোদিনীর মৃত্যু ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪১ সালে। শোনা যায়, পরবর্তীকালে প্রখ্যাত অভিনেত্রী তারাসুন্দরী ও তিনকড়িকে তিনিই বেলুড় মঠে প্রথম নিয়ে যান। মঠাধ্যক্ষ স্বামী ব্রহ্মানন্দ তাঁদের সস্নেহে গ্রহণ করেন। বিনোদিনী জীবনের শেষ প্রান্তে প্রতি সন্ধ্যায় বাড়ির কাছে স্বামী অভেদানন্দ প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠে যেতেন, জানিয়েছেন স্বামী চেতনানন্দ৷ ঠাকুরের ছবির সামনে বাংলা নাট্যজগতের সম্রাজ্ঞী কাঁদছেন, দেখেছেন স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ।

শ্রীরামকৃষ্ণের পদপ্রান্তে নিজেকে নিবেদন করলেও চিরদুখী বিনোদিনী দাসী যে নাট্যজগৎকে ভুলতে পারেননি তার উল্লেখ রয়েছে অভিনেতা অহেন্দ্র চৌধুরীর স্মৃতিকথায়। ‘বিনোদিনী প্রায়ই থিয়েটার দেখতে আসতেন, যথেষ্ট বৃদ্ধা হয়েছেন, কিন্তু থিয়েটার দেখবার আগ্রহটা যায়নি। নতুন বই হলে তো উনি আসতেনই…মুখে হাতে তখন তাঁর শ্বেতী বেরিয়েছে, একটা চাদর গায়ে দিয়ে আসতেন। এসে উইঙ্গসের ধারে বসে পড়তেন। কথা বলতেন খুবই কম… শুনেছি বাড়িতে পুজো-অর্চনা লেগেই আছে, তবু থিয়েটার দেখতে ওঁর ঠিক আসা চাই৷’

বিনোদিনী বিচিত্র জীবনের বর্ণনা শেষ হতে চায় না। এক পতিতার আত্মজীবনী এমনভাবে আর কখনও এদেশের দুখিনীদের ইতিহাস বর্ণনা করেনি। আপন প্রতিভায় তিনি নাট্যসম্রাজ্ঞীর সিংহাসনে আরোহণ করেছেন, থিয়েটারের জন্য দেহ বিক্রয় করেছেন। আবার প্রতারিত হয়েছেন। বিধাতার বিধানে তিনি আবার আশ্রয় খুঁজেছেন এবং পেয়েছেন, কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণকে ভুলতে পারেননি। এক কথায় তাঁর জীবনগাথার সঙ্গে একমাত্র তুলনা চলে সারা বার্নহার্ডের। এঁদের যোগসূত্র স্বামী বিবেকানন্দ। শ্রীরামকৃষ্ণ ছাড়াও বিনোদিনীর অভিনয় কয়েকবার দেখেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। বিস্ময়কর বিনোদিনীর সব কঠিন কথা একদিন আমরা সহজ ভাষায় শুনতে চাই। সেদিন কবে গো? কবে?

Advertisement
Next