Advertisement

Ray Series Review: কর্পোরেট পোশাকে কতটা মানানসই হল সত্যজিৎ রায়ের ৪টি গল্প?

04:24 PM Jun 26, 2021 |
Advertisement
Advertisement

নির্মল ধর: সত্যজিৎ রায়ের (Satyajit Ray) ছোটগল্পের শুধু কেন, তাঁর অধিকাংশ লেখা অভীষ্ট পাঠক কৈশোর ও যৌবনসুলভ মনের রসদ জোগায়। তাঁর লেখায় ভয় থাকে না, থাকে কৌতূহল, যৌনতার অর্চনা থাকে না, থাকে ভালবাসা, আর সেই ভালবাসার মধ্যে মিশে থাকে প্রেম আর ধূসর মনস্তত্ত্ব। স্ট্রিমিং জায়েন্ট নেটফ্লিক্সের (Netflix) কর্পোরেট আধিকারিকরা যখন সত্যজিৎ রায়ের কাহিনিতে হাত রেখেছেন, তখনই প্রশ্ন জেগেছিল তাঁর গল্পের অন্তর্নিহিত বক্তব্য ও সারবত্তা কতটা আর বজায় থাকবে? সেই আশঙ্কা অসত্য হয়নি, তবে মুখরক্ষা হয়েছে অনেকটাই। বিশেষকরে, দু’টি অধ্যায় – ‘বিপিন চৌধুরীর স্মৃতিভ্রম’ অবলম্বনে তৈরি সৃজিত মুখোপাধ্যায়  (Srijit Mukherji) পরিচালিত ‘ফরগেট মি নট’ (Forget Me Not) এবং ‘বারীন ভৌমিকের অসুখ’ অবলম্বনে তৈরি  অভিষেক চৌবের  ‘হাঙ্গামা কিউ হ্যায় বরপা’। দু’টি এপিসোডে লেখকের রচনার মেজাজ, রসিকতার টুইস্টগুলি পরিচালকরা সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন ক্যামেরার সামনে।

Advertisement

প্রথমে সৃজিতের ছবির কথাই বলি। বারীন নয়, তরুণ ঈপ্সিতের কাহিনি বলেছেন পরিচালক। ইপ্সিতের স্মরণ শক্তি কম্পিউটারকেও হার মানায়, এমন বিশ্বাস তাঁর সহকর্মী এবং স্ত্রী, বান্ধবীদের। সেই ঈপ্সিত হঠাৎ একদিন স্মৃতি হারিয়ে ফেলে। আচমকা সাত বছর আগের এক ক্রাশ (অনিন্দিতা) হাজির হয়ে তাঁদের অজন্তা গুহা ভ্রমণের ‘গল্প’ শোনালে সে কিছুই মনে করতে পারে না। আর এখান থেকেই ঈপ্সিতের মানসিক অসুখের শুরু। শেষ পর্যন্ত তাঁকে প্রায় পাগল হয়ে যেতে হয়। সাজিদের চিত্রনাট্য সত্যজিতের ছোট্ট গল্পের যে পরিবর্ধন করেছে, তা অনেকটাই মূলানুগ। সবচাইতে বড় কৃতিত্ব সৃজিতের। তাঁর সাবলীল নির্দেশনার সঙ্গে আধুনিক সিনেমা ব্যাকরণের সুন্দর ব্লেন্ডিং ছবিকে অন্য চেহারা দিয়েছে। নায়কের মানসিক ভারসাম্যহীনতা বোঝাতে সেটকে কী অসাধারণ ভঙ্গিতে তৈরি ও ব্যবহার করেছেন সৃজিত। প্রতীকী ব্যঞ্জনায় এই ছবি বুদ্ধিমান দর্শককে ভাবাবে। মানুষের মনের অন্ধকার জগৎটাকে ধরতে তিনি সিনেমার মুভিং ইমেজকে সুন্দর ব্যবহার করেছেন। অভিনয়ে আলি ফজল (Ali Fazal), অনিন্দিতা বসু, শ্বেতা বসুপ্রসাদ পরিচালকের কাজটি অনেক সহজ করে দিয়েছেন।

[আরও পড়ুন: এক হাতে জড়ানো ফুলের গজরা, অন্য হাতে মদ, শ্রাবন্তীর বিরহে দেবদাস হলেন রোশন!]

‘হাঙ্গাবা হ্যায় কিউ বরপা’র (Hungama Hai Kyon Barpa) মাধ্যমে অভিষেক চৌবে একেবারে সত্যজিতের মেজাজেই যেন ধরেছেন। ওঁর আগের ছবি দু’টির তুলনায় এই ছবির গল্প অনেক বেশি শাটল এবং পরতে পরতে মজার ফুলঝুরি লুকোনো। অভিষেক একেবারেই গল্পের সেই শর্ত মেনে চিত্রনাট্য সাজিয়েছেন। দুই ক্লিপ্টোম্যানিয়্যাকের গল্পের সঙ্গে মজারু সাসপেন্স জড়িয়ে রাখাটা কম কঠিন কাজ নয়। সেই কঠিন কাজটি অভিষেক নিপুণভাবে করেছেন, মানিকি কৌশলেই। এক দীর্ঘ ট্রেন যাত্রায় দুই মুখ্য চরিত্রের অনেক বছর পর দেখা। দু’জনেই একে অন্যের প্রিয় জিনিস চুরি করেছিলেন। এরপর দু’জনার জীবনেই পরিবর্তন ঘটেছে। পুনরায় দেখা হওয়ায় সেই চৌর্যবৃত্তির মাধ্যমে যে যাঁর জিনিস ফেরত পান ঠিকই, কিন্তু ছবির শেষে আরও একটা চমক থাকে! সেটা ‘রে’ সিরিজে (Ray Series) নেওয়াই ভাল। এই এপিসোডটি ভাল ও উপভোগ্য হয়ে ওঠার পেছনে পরিচালকের সঙ্গে দুই অভিনেতা মনোজ বাজপেয়ী এবং গজরাজ রাওয়ের কমিক টাইমিংয়েই কৃতিত্ব দিতে হবে। 

‘বহুরূপী’ অবলম্বনে তৈরি সৃজিতের দ্বিতীয় ছবি ‘বহুরূপিয়া’ (Bahrupiya)।  প্রথমটির তুলনায় এ গল্প একটু বেশি অন্ধকারময়। মেকআপ আর্টিস্ট ইন্দ্রাসিশ কিছুটা খামখেয়ালি। একজন অতি সাধারণ সাধাসিধে মানুষ বাড়িওয়ালা ও অফিস বসের বাজে ব্যবহারের প্রতিশোধ নিতে প্রস্থেটিক মেকআপ ব্যবহার করে। আর তা করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেরই সর্বনাশ ডেকে আনে।  তবে সিরাজ ও সৃজিত এই চরিত্রের মধ্যে যৌনতার যে তীব্র আসক্তির দৃষ্টগুলো আনলেন, সেটা ইন্দ্রসিশকে বোধহয় খাটোই করে দিল। মনে হচ্ছিল, কর্পোরেট প্রযোজক সংস্থার পরোক্ষ চাপেই এমনটি ঘটিয়েছেন সৃজিত। যেটার প্রয়োজন ছিল না। তবে এই ছবিতেও কে কে মেনন ( Kay Kay Menon) এবং মৌলবির ভূমিকায় দিব্যেন্দু (Dibyendu Bhattacharya) সত্যিই অনন্য।

সিরিজের শেষ এপিসোড ‘স্পটলাইট’-এর (সত্যজিৎ রচিত গল্পের নামও স্পটলাইট) গল্পকে  আসল কাহিনি থেকে অনেকটাই সরিয়ে নিয়েছেন পরিচালক হাসান বালা। একজন উঠতি ফিল্ম স্টারের ক্যারিশমা সঙ্গে সংঘাত প্রায় অদেখা এক ধর্মীয় গুরুগিন্নি ‘দিদি’র সঙ্গে। একই হোটেলে উঠেছেন দু’জনে। একজন নতুন ছবির শুটিং করতে, অন্যজন এসেছেন অগণিত শিষ্যশিষ্যা পরিবৃতা হয়ে পবিত্র প্রার্থনার উদ্দেশ্যে। একজন শিল্পীর আবেগ, নাকি একজন ধর্মীয় গুরুর প্রভাব – কোনটা বেশি শক্তিধর, সেটা নিয়ে দুর্দান্ত স্যাটায়ার তৈরি করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। কিন্তু পরিচালক হাসান বালা অন্তর্নিহিত আর্থটাকেই হয়তো অনুধাবন করতে পারেননি। ফলে, ছবিটি এক ধরনের খিচুড়ি হয়েছে – যাতে না আছে হাস্যরস, না আছে ব্যঙ্গ রস, না হয়েছে স্যাটায়ার। নায়ক কথিত ছবির অবস্থা সত্যিই “কাফকেস্ক”ই বটে!
সত্যজিৎ রায়ের গল্পের বাহ্যিক আবরণ ভেদ করে ভেতরের রসিক মেজাজটাই আসল। সেটার কাছাকাছি পৌঁছানো খুব সহজ নয়। বাণিজ্যিক মন আর কর্পোরেট সংস্কৃতি নিয়ে সেই স্তরে পৌঁছানো যাবে না। সৌভাগ্য, সৃজিত ও অভিষেক কিছুটা পেরেছেন। এবং প্রায় প্রত্যেকটা ছবিতেই সত্যজিৎকে ট্রিবিউট দিতে তাঁর তৈরি আবহ, পোশাক, সংলাপের ইঙ্গিতপূর্ণ ব্যবহার চোখে পড়ার মতো।

[আরও পড়ুন: ‘ফ্যামিলি ম্যান’ সিরিজের সাফল্যের পরও অর্থকষ্টে অভিনেতা, ছেড়েছেন মুম্বইয়ের ফ্ল্যাটও]

Advertisement
Next