shono
Advertisement

শরৎচন্দ্রের ক্লাসিক থেকে ওয়েব সিরিজ, ‘শ্রীকান্ত’কি মন জিতল দর্শকের?

'চরিত্রহীনে'র পরে ফের শরৎচন্দ্রের কাহিনি ওটিটি মঞ্চে।
Posted: 06:47 PM Apr 17, 2022Updated: 11:33 PM Apr 17, 2022

বিশ্বদীপ দে: শ্রীকান্ত। বিভূতিভূষণের ‘অপু’র মতোই শরৎচন্দ্রের (Sarat Chandra Chattopadhyay) ভবঘুরে, হৃদয়বান এই চরিত্রটিও বাঙালির বড় আপন। একদিকে যুক্তি, অন্যদিকে কবিত্ব ও আশ্চর্য উদাসীনতার মিশেল তাকে এমন এক মহিমা দিয়েছে যাকে কয়েক দশকেও বাঙালি পাঠক ভুলতে পারেনি। আর তাই হালফিলের বাংলা ওয়েব সিরিজেও ফিরে আসতে দেখা গেল শরৎবাবুর ‘সেলফ প্রোজেকশন’ শ্রীকান্তকে। তবে ‘হইচই’-এর সাম্প্রতিক ওয়েব সিরিজ কি আদৌ ছুঁতে পারল আইকন চরিত্রের চিরন্তন আবেদনকে?

Advertisement

এর আগে শরৎচন্দ্রের ‘চরিত্রহীন’কে আমরা ওয়েব সিরিজ হিসেবে দেখেছি। সম্প্রতি ম্যাকবেথকে দেখেছি ‘মন্দার’ হয়ে ফিরে আসতে। পরিচালক সানি ঘোষ রায় তাঁর শ্রীকান্তকেও নিয়ে এসেছেন নতুন আঙ্গিকে। একেবারে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে। শ্রীকান্তের ভূমিকায় ঋষভ বসু (Rishav Basu)। সোহিনী সরকার (Sohini Sarkar) হয়েছেন রাজলক্ষ্মী। অভয়ার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মধুমিতা সরকার (Madhumita Sarcar)।

[আরও পড়ুন: ভাইয়ের পর দিদি? ‘রণলিয়া’র বিয়ে মিটতেই দ্বিতীয়বার সাতপাকে বাঁধা পড়ার ইঙ্গিত করিশ্মার!]

গল্পকে নিজের মতো করে গড়েপিটে নিয়েছেন পরিচালক। তাছাড়া হয়তো উপায়ও ছিল না। চার পর্বের বৃহৎ আখ্যানে লেখা ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র রাজলক্ষ্মী। অভয়ারও নিজস্ব গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে তাদের নিয়ে আসতে গেলে গল্পে আমূল বদল দরকার। কেননা মাঝের সময়টায় পৃথিবীই যে বদলে গিয়েছে। কাজেই পরিবর্তন কাঙ্ক্ষিতই ছিল।

গল্প বলা হয়েছে মোটামুটি চারটে টাইমলাইনে। ২০০৬, ২০০৮, ২০২০ ও বর্তমান সময়। শুরুতে হালিশহরের কিশোর শ্রীকান্ত ও তার ইন্দ্রজিৎদার কথোপকথন। বছর কয়েকের বড় পাড়ার রাজলক্ষ্মীদির প্রেমে সে পাগল। কিন্তু যেদিন সে ঠিক করে মনের কথা বলবে, সেদিনই বাবার বদলির ফলে রাজলক্ষ্মীর পাড়া ত্যাগ। এরপর তাদের দেখা হয় বহু বছর পরে। দু’জনের জীবনেই ততদিনে নাটকীয় বদল এসেছে। যেন সম্পূর্ণ আলাদা দু’জন মানুষ। শ্রীকান্ত একটা বুটিকে চাকরি করে। সেখানে সে ডিজাইনার। আর রাজলক্ষ্মী তার ক্লায়েন্ট। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে পুরনো সম্পর্ক জাগল। তৈরি হল প্রেম। প্রেম নাকি নিখাদ সেক্স? শরীর প্রেমের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ নিশ্চয়ই। কিন্তু এখানে শ্রীকান্ত ও রাজলক্ষীর মধ্যে যা তৈরি হয়েছে তাতে শরীরই সিংহভাগ হয়ে থাকে যেন।

[আরও পড়ুন: সাধারণের উপরে বাড়তে পারে করের বোঝা! তুলে দেওয়া হচ্ছে জিএসটির ৫ শতাংশের ধাপ]

রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্তর প্রেমের মধ্যে উঁকি দিয়ে যায় রাজলক্ষ্মীর অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যানি। অনেক পরে গল্পে আসে অভয়া তথা অ্যাভি। এই নারীদের মাঝখানে উদভ্রান্ত যৌবন নিয়ে শেষ পর্যন্ত কোথায় পৌঁছয় শ্রীকান্ত? স্পয়লার থেকে বাঁচতে সেসব কথা থাক। তার চেয়ে এই প্রশ্নটুকু তোলা যাক, এই সিরিজে কি আদৌ খুঁজে পাওয়া যায় বাঙালির চিরকেলে আপন চরিত্রটিকে? নাকি স্রেফ নামগুলি ছাড়া কোথাওই নেই শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের কোনও চিহ্ন?

আসলে শুধু শ্রীকান্ত কেন, রাজলক্ষ্মী কিংবা অভয়া বললে যে ছবি ভেসে ওঠে সেদিকে যাননি সানি। ‘অ্যাডাপটেশন’ যখন, তখন নিজের মতো করে কাহিনিটি পুনর্নির্মাণ, বিনির্মাণ তিনি করতেই পারেন। কিন্তু শরৎচন্দ্রের গল্পের মূল স্পিরিটটুকু তো থাকা দরকার ছিল। উপন্যাসে রাজলক্ষ্মী ৮-৯ বছর বয়সে ভালবেসেছিল তার কান্তদাকে। পরে কুমার বাহাদুরের শিকার পার্টিতে দেখেই সে চিনতে পেরে গিয়েছিল তার বাল্যপ্রেমকে। এখানে বিষয়টা উলটো। শ্রীকান্ত ছোট। সেই হাবুডুবু খেয়েছে রাজলক্ষ্মীদির প্রেমে। দরজার ফাঁকে প্রেমিকের সঙ্গে তাকে দেখে ফেলার পরে আহত হৃদয় নিয়ে সে লাফিয়ে পড়ে প্রতিশোধস্পৃহায়।

পরে বড় হয়ে নেশার ঝোঁকে কেরিয়ার নষ্ট করতে করতে ফিরে এসে নতুন করে জীবনের লড়াই শুরু করে শ্রীকান্ত। একটু থিতু হতে না হতে তার জীবনকে ঝড়ের মতো উড়িয়ে নিয়ে যেতে হাজির হয় রাজলক্ষ্মী। কিন্তু শ্রীকান্ত মানে কি কেবল নারীর প্রেমপ্রত্যাশী এক যুবক? তার জীবনে অন্য সংকট রয়েছে। কিন্তু সেসব ফুটে উঠল কোথায়? তার পারিবারিক জীবন হোক কিংবা তার রিহ্যাবের লড়াই, কিছুই সেভাবে পাওয়া গেল না। যতটুকু পাওয়া গেল, তাতে মন ভরল না। রাজলক্ষ্মীও কেন নিজের জীবনকে অন্যখাতে বইয়ে দিল, সেই যুক্তিই বা জোরাল হল কই। আর অভয়ার উপস্থিতি এতই সামান্য যে তাকে ঠিক ভাবে বুঝতেই পারা যায় না। সব মিলিয়ে গল্প যেন এলোমেলো ঘুরপাক খেতেই থাকে। মনে হয় পরিচালক নিজেও হয়তো খানিক সংশয়ে ছিলেন। তাই শেষ পর্যন্ত শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের নামে তিনি একেবারে অন্য কিছু তৈরি করেছেন। একে ‘শ্রীকান্ত’র অ্যাডাপটেশন হিসেবেই চিনতে পারা মুশকিল। বোধহয় অসম্ভবও।

অভিনয়ে সোহিনী সরকার তাঁর যথাসাধ্য করেছেন। শরীরী ভাষা থেকে চাপা উচ্চারণশৈলী, চরিত্রটিকে ফুটিয়ে তুলতে কোনও কসুর করেননি। কিন্তু চিত্রনাট্যের দুর্বলতা তাঁকে সফল হতে দিল কই? শ্রীকান্তর চরিত্রে ঋষভ বসুর অভিনয় বেশ দুর্বল। কিছু দৃশ্যে উতরে গেলেও অনেক জায়গাতেই তাঁকে আড়ষ্ট লেগেছে। মধুমিতার চরিত্রটিই এমন, মনে দাগ তো কাটেই না, উপরন্তু কয়েকটি দৃশ্য বিরক্তির উদ্রেক করে। তিনি ভাল অভিনেত্রী, কিন্তু এখানে তাঁর কিছু করার ছিল না।

ছবির সিনেমাটোগ্রাফি বেশ ভাল। ব্রিজের উপরে দাঁড়ানো কিশোর শ্রীকান্ত তাকিয়ে রয়েছে রাজলক্ষ্মীর ট্রেনের চলে যাওয়ার দিকে কিংবা সমুদ্রের নীল জলে শ্রীকান্তর ভেসে থাকা- মুগ্ধ করে। ‘আমাকে নাও’ ও ‘ও রাধে রাধে’র মতো গান বেশ শ্রুতিমধুর। কলেজছাত্রী রাজলক্ষ্মীর ভূমিকায় অঙ্গনা রায়কে বেশ লেগেছে। জুন মালিয়াও যতটা সুযোগ পেয়েছেন ভালই করেছেন। তবে তাঁর চরিত্রটিকে আরও একটু জায়গা হয়তো দেওয়াই যেত। কিন্তু এই সব ‘ভাল’ মিলেও শেষরক্ষা হয়নি।

এই ওয়েব সিরিজ একটা প্রশ্ন তুলে দিল। বিখ্যাত চরিত্র, জনপ্রিয় ক্লাসিককে নতুন করে ফিরিয়ে আনতে গেলে আরও হোমওয়ার্ক করা কি দরকার নয়? শ্রীকান্ত গত একশো বছর ধরে বাঙালির কাছের। একটু চুমু, একটু নেশা, খানিক উদভ্রান্তি ঢুকিয়ে দিলেই তাকে নির্মাণ বা বিনির্মাণ কোনওটাই করা যায় না। আর যদি শ্রীকান্ত নামটাও সরিয়ে রাখি, তাহলেও ঢিমেতালের এই ওয়েব সিরিজ কোনও ভাবেই মনকে ছুঁতে পারে না।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

Advertisement