ঘোল খাইয়ে ছাড়ল 'বিজয় সালগাঁওকর', টানটান উত্তেজনায় শেষ 'দৃশ্যম' ফ্র্যাঞ্চাইজি, পড়ুন রিভিউ
Sandipta Bhanja
দেবত্রী ঘোষ: 'ফিল্মো কা সচ হোনা জরুরি নহি হ্যায়, উনকা সচ লাগনা জরুরি হ্যায়'– আমরা যা শুনি, তা ভুললেও ভুলতে পারি, কিন্তু যা দেখি, তা ভুলে যাওয়া অসম্ভবের শামিল। তাই চোখের সামনে দৃশ্যপট তৈরি করার প্রভাব আলাদাই। চতুর্থ শ্রেণির গণ্ডি পেরতে না পারা, সিনেমা-পাগল বিজয় সালগাওকর (অজয় দেবগন) কেবলমাত্র দৃশ্যের সারি রচনা করে এমন গল্পের ফাঁদ পেতেছে, যার জালে কাবু পুলিশ থেকে আইন সকলেই।
এই ফ্র্যাঞ্চাইজির বারবার ফিরে আসার উদ্দেশ্য একটাই– অশিক্ষিত, খেটে খাওয়া মানুষ যদি প্রভাবশালী পরিবারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তখন তার বারবার আইনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে জিতে যাওয়া মেনে নেওয়া যায় না।
পরপর দুটো ছবি হয়ে যাওয়ার পর (দুটিই মালয়ালম ছবি 'দৃশ্যম'-এর রিমেক), দর্শকের মনে হতেই পারে, তৃতীয় কিস্তিতে আর কী-ই বা নতুন থাকবে? সেখানেই পরিচালক অভিষেক পাঠক কিস্তিমাত করলেন। মালয়ালম ছবি 'দৃশ্যম ৩'-এর পথে না হেঁটে হিন্দি 'দৃশ্যম: দ্য কনক্লুশন' (Drishyam 3 Movie Review)-এর গল্প সাজালেন নতুন করে। এই ফ্র্যাঞ্চাইজির বারবার ফিরে আসার উদ্দেশ্য একটাই– অশিক্ষিত, খেটে খাওয়া মানুষ যদি প্রভাবশালী পরিবারের (এখানে মীরা ও মহেশ দেশমুখ, অভিনয়ে তাবু ও রজত কাপুর) বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তখন তার বারবার আইনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে জিতে যাওয়া মেনে নেওয়া যায় না। যদিও আত্মরক্ষার্থে কাউকে মেরে ফেলা আইনি অপরাধ নয়, তবু ছেলে শ্যামের জন্য বিচার চাইতে মীরা ও মহেশ হাল ছাড়তে নারাজ।
আরও পড়ুন:
জিতু জোসেফ–মোহনলাল জুটি মালয়ালম ছবির গল্পকে অনেকটাই টেনে বড় করেছেন এবং সেখানে নৈতিকতার দায় টেনে আনা হয়েছে শেষে গিয়ে। সেই তুলনায় এই ছবি অনেক বেশি টানটান ও উত্তেজনাপূর্ণ। আমিল কিয়ান খান ও অভিষেক পাঠকের চিত্রনাট্যে বিশেষ কোনও ফাঁকফোকর নেই। গল্পের বুনোট বাঁধতেও তাঁরা বেশি সময় নেননি। মামলা নতুন করে খোলার সঙ্গে সঙ্গেই বিজয়ের মুখোমুখি ক্রাইম ব্র্যাঞ্চের নতুন আইপিএস রাজবীর সিং তোমর (জয়দীপ আহলাওয়াত)। এর আগে যা নজর এড়িয়ে গিয়েছে, সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে নারাজ রাজবীর নতুন করে অনুসন্ধান শুরু করে এই কেসের অন্যতম পুলিশ সদস্য লক্ষ্মীকান্ত গাইতোন্ডেকে (কমলেশ সাওয়ান্ত) নিয়ে। বিজয় ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা লড়তে আসে দুঁদে উকিল ইন্দ্রজিৎ শেঠি (প্রকাশ রাজ)। দর্শক, যারা সবসময় চান বিজয়ের যাতে কোনও শাস্তি না হয়, তাঁরা বারবার উত্তেজিত হয়ে পড়বেন এই ভেবে, যে এই নিশ্ছিদ্র জাল থেকে বিজয়, তার স্ত্রী ও দুই মেয়ে এবার আর রক্ষা পাবে না হয়তো। আমিল কিয়ান খানের সংলাপে কেবল এই ছবির 'থ্রিল'ই বজায় থাকেনি, বরং মাঝেমধ্যেই এত উত্তেজনার মধ্যে হালকা কমেডির ছোঁয়া দিয়েছে গাইতোন্ডের মাধ্যমে।
এই ছবিতে অভিনয় করলেন জয়দীপ আহলাওয়াত। পর্দায় দেখলে মনে হবে, রাজবীরের চরিত্র তাঁর চেয়ে ভালো আর কেউ করতে পারত না। প্রকাশ রাজ ও কমলেশ সাওয়ান্তকেও ভালো লাগে।
পরিচালক ছবির নামের মাধ্যমেই জানিয়ে দিয়েছেন, হিন্দি 'দৃশ্যম'-এর গল্প এখানেই শেষ। আর নতুন কোনও কিস্তি আসবে না। তাই হয়তো এই কিস্তির নতুন সংযোজনের জন্য সেরা অভিনেতাদের দলে টেনেছেন। শুটিং শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই শোনা গিয়েছিল দ্বিতীয় কিস্তির পুলিশের চরিত্রে অভিনয় করা অক্ষয় খান্না এই ছবি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। আর তার বদলে এই ছবিতে অভিনয় করলেন জয়দীপ আহলাওয়াত। পর্দায় দেখলে মনে হবে, রাজবীরের চরিত্র তাঁর চেয়ে ভালো আর কেউ করতে পারত না। প্রকাশ রাজ ও কমলেশ সাওয়ান্তকেও ভালো লাগে। বিজয়ের চরিত্রে অজয় দেবগন অনেক বেশি সংযত। বারবার আদালতে হাজিরা দিতে দিতে খানিক ক্লান্ত, কিন্তু সে যে সকলের চেয়ে এক-কদম এগিয়ে, সেই আত্মবিশ্বাস তাঁর চোখে-মুখে পরিষ্কার। শ্রিয়া শরণ, ঈশিতা দত্ত, ও ম্রুণাল যাদব তাঁদের ছোট্ট পরিসরে পরিণত। শুধু খারাপ লাগে তাব্বুর মতো শক্তিশালী অভিনেতার চরিত্র যখন গল্পের খাতিরে ক্রমশ মলিন হতে থাকে। আসলে একটা সময় পুলিশি দৌরাত্ম ঘুচে গিয়ে, কেবল পড়ে থাকে এক সন্তানহারা মায়ের শূন্যতা। সুধীর চৌধুরির চিত্রগ্রহণে গোয়া এক নিখুঁত থ্রিলারের প্রেক্ষাপট হয়ে উঠেছে।
২০১৩ সালে জিতু জোসেফের প্রথম ‘দৃশ্যম’ যখন মুক্তি পায়, তখন অনেকেই বিখ্যাত জাপানি থ্রিলার লেখক কেইগো হিগাশিনোর উপন্যাস ‘দ্য ডিভোশন অফ সাসপেক্ট এক্স’-এর প্লট ও নির্যাসের সঙ্গে মিল খুঁজে পেয়েছিলেন। পরিচালক অবশ্য কোনও ধরনের অভিযোজনের কথা অস্বীকার করেন। বই থেকে ছবি তৈরি হয় হামেশাই। ‘দৃশ্যম’-এর ক্ষেত্রে অবশ্য উলটোটাই ঘটে। বিজয় সালগাওকারের গল্পই উপন্যাসের আকার নেয় লেখক মুরাক আলির (সৌরভ শুক্লা) হাত ধরে। এও এক ধরনের 'লাইফ হ্যাজ কাম আ ফুল সার্কেল' বইকি!