অন্ধভক্তির চেনা প্রেক্ষাপটে রুখে দাঁড়ানোর কাহিনি, কেমন হল ‘হুঙ্কার: দ্য রোর’?
Kasturi Kundu
মানুষের সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে এই একবিংশ শতকের আধুনিক সময়েও সমাজে গুরু প্রজাতির বাড়বাড়ন্ত ক্রমবর্ধমান। তার থেকেই জন্ম নেয় কিছু আসারাম বাপু কিংবা রাম রহিম বাবা। তেমনই এক ঘটনার ছায়া অবলম্বনে ‘জিও হটস্টার’-এ মুক্তি পেয়েছে ছয় এপিসোডের সিরিজ ‘হুঙ্কার: দ্য রোর’। পরিচালনায় নিত্য মেহরা, করণ ডি কাপাডিয়া এবং হিরাজ মরফটিয়া।
মধ্যপ্রদেশের ওরছা জেলার সাবুরি জনপদ। ১৭ বছরের মিনু রাওয়াত থানায় এসে শারীরিক অত্যাচারের অভিযোগ জানায় আধ্যাত্মিক গুরু সুনীল চাকোসি ওরফে বাপজির নামে। বাপজির তৈরি স্কুলের ছাত্রী সে। সেখানে তাকে ১৫ মিনিট ধরে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ। শ্রদ্ধেয় বাপজির বিরুদ্ধে পুলিশ প্রাথমিকভাবে অভিযোগ নিতে অস্বীকার করলেও এসিপি জসলিন সিংয়ের হস্তক্ষেপে অভিযোগ লিখিত হয়। প্রত্যাশামতোই গর্জে ওঠে বাপজির ভক্তকুল।
আরও পড়ুন:
এমনকী, প্রশাসনের ওপরমহল থেকেও অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট ইস্যু করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রায় যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে গ্রেফতার করা হয় বাপজিকে। অবশেষে কোর্টে মুখোমুখি হয় দুই পক্ষ। মিনু কি সুবিচার পাবে? বিভিন্ন ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অনীত পড্ডা, ফতিমা সানা শেখ, রঘুবীর যাদব, জিশান আইয়ুব, অর্জুন মাথুর, রাম কাপুর, রাজেশ শর্মা, চারু শঙ্কর। অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর আধারিত এই সিরিজ। বছরের পর বছর ধরে হয়ে চলা অত্যাচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোই সবচেয়ে কঠিন কাজ।
যেখানে ধর্ষণ প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিতে ঘটেনি এবং মেডিক্যাল পরীক্ষাতেও ধরা পড়েনি সেই জায়গা থেকে কোর্টে দাঁড়িয়ে লড়াই করা এক কঠিন পরিস্থিতিকে সামনে আনে। নির্যাতিতা মেয়েটিকে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে প্রতিদিন অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয় তার সত্যতার। কল্পনা করে শিউরে উঠতে হয় সেই সব মেয়ের কথা ভেবে যারা কোথাও না কোথাও শারীরিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছে। সেদিক দিয়ে এই সিরিজ সমাজকে নির্মমভাবে আয়না দেখানোর কাজ করে।
কিন্তু গল্পের বুননে অজস্র ফাঁক থেকে গিয়েছে। তিনজন পরিচালকের দায়িত্বে থেকেও গল্পের খুঁত ঢাকা যায়নি, ফলে অভিনেতাদের দুরন্ত পারফরম্যান্সের পরেও সফল সিরিজ হয়ে উঠল না ‘হুঙ্কার’। অজস্র সাবপ্লট, কাহিনির যুক্তিহীনতা দর্শককে হতাশ করবে। ধর্ষণের অভিযোগে পুলিশ নিজেই যেখানে কোর্টে মামলা করছে সেখানে প্রসিকিউশনের উকিল তো সরকারকেই দিতে হবে। মিনুর বাবাকে কেন উকিল খুঁজে আনতে হল? গল্পের মাঝেই হঠাৎ পাল্টে গেল ডিফেন্স উকিল, এমনকী, বিচারকও। ধর্ষিতার পরিচয় গোপন রাখা পুলিশ ও মিডিয়ার কর্তব্য হওয়া সত্ত্বেও মিনুকে লোকে চিনে গেল কীভাবে?
আশা যখন তার স্টেটমেন্ট রেকর্ড করল এবং তা ভাইরালও হল তার পরেও পুলিশ তার জন্য প্রোটেকশনের ব্যবস্থা করল না কেন? একা কাশ্যপকে ধরতে পুলিশ সাইরেন বাজিয়ে কেন যাবে, যেখানে সে সতর্ক হয়ে গেলে প্রমাণ লোপাট হতে পারে! ছোট ছেলেটির নিরুদ্দেশ হওয়ার রহস্য কেন সামনে আনা হল না? এই সব প্রশ্নের কোন যুতসই ব্যাখ্যা নেই সারা সিরিজ জুড়ে। তবে চিত্রনাট্যে খামতি থাকলেও অভিনয়ের কারণেই সিরিজের কাহিনি মনে দাগ কাটতে বাধ্য। মিনুর ভূমিকায় অনীত ও জসলিনের ভূমিকায় ফতিমা, দুজনেই অসাধারণ। দুই চরিত্রায়নেই কোথাও অভিনয় নেই।
মিনুর বাবা-মায়ের ভূমিকায় রাজেশ ও চারুর অসহায়তা চোখে জল আনতে বাধ্য। সিনেমা-সিরিজে দেখানো কোর্টরুমের অতিনাটকীয়তা বর্জন করে জিশান ও রামের সওয়াল জবাব মেদহীন এবং বিশ্বাসযোগ্য। সাংবাদিক অমিতাভ সিনহার ভূমিকায় অর্জুন মাথুর তাঁর শরীরী ভাষায় অনবদ্য। চরম দুর্নীতিগ্রস্ত গুরুর ভূমিকায় রঘুবীর যাদব যেমন ভয়ংকর তেমনই অসামান্য! চিত্রনাট্যে যতই খুঁত থাকুক বাপজির ভূমিকায় তাঁকে ভোলা যাবে না অনেকদিন।