ক্রমশ কমছে উৎপাদন ও রপ্তানি, বিশ্বমানের গৌরব ধরে রাখতে পারবে দার্জিলিং চা?
Suhrid Das
আবহাওয়ার পরিবর্তনের জেরে শুধু হিমবাহ গলছে না। উদ্বেগজনকভাবে কমছে 'শ্যাম্পেন অব টি' নামে বিশ্বে সমাদৃত দার্জিলিং চায়ের উৎপাদন। একদিকে উৎপাদনে মার। অন্যদিকে দোসর হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি দেশ ক্রমশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় উদ্ভুত পরিস্থিতি। দুয়ের সাঁড়াশি আক্রমণে কমেছে চায়ের রপ্তানিও। চা বণিকসভাগুলো সূত্রে জানা গিয়েছে, পাহাড়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে দু'মাস 'ফার্স্ট ফ্লাশ'-এর পাতা তোলা হয়। ওই পাতা থেকে অন্তত দুই মিলিয়ন কেজি চা তৈরি হয়। এটি মোট উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ। এটাই মরশুমের সেরা দার্জিলিং চা। ওই চা জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ডে রপ্তানি হয়ে থাকে। কিন্তু সময় মতো বৃষ্টির অভাবে পাতা মিলছে না। ওই কারণে ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাসে চা উৎপাদন পুরোপুরি মার খাচ্ছে।
কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিজের ভাইস চেয়ারম্যান সতীশ মিত্রুকা বলেন, "গত দু'দশকে প্রায় ২০ শতাংশ বৃষ্টি কমেছে দার্জিলিং পাহাড়ে। আবহাওয়ার পরিবর্তনের জেরে দার্জিলিং চায়ের উৎপাদন উদ্বেগজনকভাবে কমেছে। ১৯৭০ সালে উৎপাদন ছিল ১৪ মিলিয়ন কেজি, সেখান থেকে এখন সেটা ৫.৩০ মিলিয়ন কেজিতে নেমেছে।" জানা গিয়েছে, গত বছরের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত রাজ্যের দার্জিলিং পাহাড়, তরাই ও ডুয়ার্সে চা উৎপাদন হয়েছে ৪১১.১৮ মিলিয়ন কেজি। ২০২৩ সালে উৎপাদন ছিল ৪৩৩.৫৪ মিলিয়ন কেজি। দার্জিলিং চা গত বছর ৫.৩০ মিলিয়ন কেজি উৎপাদন হয়েছে। ২০২৪ সালে উৎপাদন ছিল ৫.৭১ মিলিয়ন কেজি। ২০২৩ সালে ছিল ৬.০১ মিলিয়ন কেজি।
আরও পড়ুন:
টি রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশনের বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রতি বছর ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে উত্তরে পাহাড়-সমতলে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হয়ে থাকে। ফেব্রুয়ারি থেকে ঠান্ডার প্রকোপ কমতে থাকে। এখন নভেম্বর থেকে পাহাড়-সমতলে বৃষ্টি নেই। ফলে চা উৎপাদনের প্রতিকূল আবহাওয়া দেখা দিয়েছে। শুধু উৎপাদন কমেছে সেটাই নয়। চা বণিকসভাগুলো সূত্রে জানা গিয়েছে, ভারতীয় অর্থডক্স ও সিটিসি চায়ের বিরাট বাজার রয়েছে ইরান, সৌদিআরব, ইউএই, ইরাকে। গত বছর ইরাকে ৯.২৫ মিলিয়ন কেজি চা রপ্তানি হয়েছে। যার অর্থ মূল্য ছিল ২৮৯.৪২ কোটি টাকা। এবার রপ্তানির পরিমাণ বেড়ে ১২ মিলিয়ন কেজি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।
একইভাবে ২০২৫ সালে সৌদি আরবে ৭.৭৩ মিলিয়ন কেজি, ইউএইতে ৪৩.৪৮ মিলিয়ন কেজি এবং ইরাকে ৪১ মিলিয়ন কেজি রপ্তানি হয়েছে। সেটাও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি দেশ ক্রমশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি ঘোরালো হয়েছে। এতদিন দুবাই ছিল নিরাপদ ট্রানজিট পয়েন্ট। এখান থেকে ভারতীয় চা রপ্তানি হয়েছে ওমান, কাতার, পাকিস্তান, রাশিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান-সহ বিভিন্ন দেশে। আজারবাইজান, কাজাখস্তানে রপ্তানি হয়ে থাকে প্রায় ২৬২ মিলিয়ন কেজি চা। কিন্তু ট্রানজিট পয়েন্ট দুবাই আক্রান্ত হওয়ায় ভারতীয় চা বণিকসভাগুলোর কর্তাদের কপালে চিন্তার ভাজ ফেলেছে। কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান স্মল টি গ্রোয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বিজয়গোপাল চক্রবর্তী বলেন, "২০২৫ সালে ভারত থেকে ২৮০ মিলিয়ন কেজি চা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রপ্তানি হয়েছে। কিন্তু ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের ফলে যোগাযোগ ব্যহত হতে শুরু করে। অনেক অফিস বন্ধ হয়ে যায়। ভারত থেকে ইরানে চা রপ্তানি সম্ভব হয়নি। ওই কারণে রপ্তানি কমেছে।"
ভারতীয় চা পর্ষদ সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১৫ সালে প্রায় ৪০ লক্ষ কেজি দার্জিলিং চা রপ্তানি হয় গোটা বিশ্বে। ২০২৫ সালে সেটা নেমে দাঁড়ায় প্রায় ২১.৫০ লক্ষ কেজিতে। মাত্র এক দশকে রপ্তানি কমেছে প্রায় ৪৬ শতাংশ। উদ্বেগজনকভাবে দার্জিলিং চায়ের রপ্তানি কমে ২০১৬-২০১৭ সাল নাগাদ। গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের জন্য ওই সময় প্রায় তিন মাস পাহাড়ে চা উৎপাদন বন্ধ ছিল। সেটার প্রভাব পড়ে চা রপ্তানি বাণিজ্যে। ইউরোপ এবং পশ্চিম এশিয়ায় ভারতের চায়ের বাজার দখল করে কেনিয়ার মতো দেশ। এরপর ২০১৮ সালে রপ্তানি বেড়ে হয় প্রায় ৩৭ লক্ষ কেজি। করোনা মহামারীর সময় ফের রপ্তানি কমে। ২০২৩ সালে প্রায় ২৫ লক্ষ কেজি রপ্তানি হয়। পরের বছর কিছুটা বাড়লেও ২০২৫ সালে ফের উৎপাদন নেমে দাঁড়ায় ২১.১৫ লক্ষ কেজিতে। ওই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, আবহাওয়ার খামখেয়ালিতে দার্জিলিং চা কি পারবে নিজের বিশ্বমানের গৌরব ধরে রাখতে?