সঠিক উপায়ে কপি চাষে প্রচুর লাভের সুযোগ, উপায় বাতলালেন বিশেষজ্ঞরা

01:52 PM Sep 29, 2022 |
Advertisement

প্রায় সারাবছরই বিভিন্ন প্রকার কপি পাওয়া যায়। ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকোলি ইত্যাদির চাহিদাও সারাবছরই থাকে। অসময়ে কপি চাষ করে কৃষক লাভবান হলেও বিভিন্ন কারণে লোকসান হওয়ার আশঙ্কাও থাকে প্রবল। বিশেষ করে শীতের আগে ‘জলদি কপি’ চাষে, অধিক গরম ও ঘন বর্ষার কারণে বীজতলা ও মূল জমিতে বিভিন্ন ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। একই সমস্যা দেখা যায় শীতকালীন কপি চাষেও। ফসল সংরক্ষণের সমস্ত অগ্রিম প্রস্তুতি ছাড়াও সঠিক সময়ে সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ফলন ও বাজার মূল্য কমে যায়। বেড়ে যায় উৎপাদন খরচও। লিখেছেন বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের গবেষক গোপাল চৌধুরী।

Advertisement

googletag.cmd.push(function() { googletag.display('div-gpt-ad-1652782001027-0'); });

দ্বিতীয় পর্ব

window.unibots = window.unibots || { cmd: [] }; unibots.cmd.push(()=>{ unibotsPlayer('sangbadpratidin'); });

ডাঁটা পচা রোগের কারণ ও লক্ষণ: স্ক্লেরোটিনিয়া স্ক্লেরোসিওরাম নামক ছত্রাকের আক্রমণের ফলে এই রোগের সৃষ্টি হয়। স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া এই রোগের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। জমিতে, পরিবহনকালে এমনকী গুদামেও এই রোগের প্রভাব দেখা যায়। মাটি সংলগ্ন কাণ্ডে, নীচের দিকের পাতায় কিংবা পাতার যে অংশ মাটিকে স্পর্শ করে সেখান থেকে সংক্রমণ শুরু হতে পারে। পাতার বোঁটা ও কাণ্ডের সংযোগস্থলে প্রথমে ভেজা দাগ দেখা যায় পরে তা সাদা হয়ে যায়। কাণ্ডের ভিতরে পচতে শুরু করে এবং পাতা হলুদ হয়ে ঝরে পড়ে।

Advertising
Advertising

googletag.cmd.push(function() { googletag.display('div-gpt-ad-1652782050143-0'); });

প্রতিকার:
ক) এই রোগ হওয়ার ইতিহাস আছে এমন জমিতে কপি লাগানো থেকে বিরত থাকতে হবে।
খ) সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগ করতে হবে।
গ) ক্যাপটান বা থাইরাম বা কার্বেন্ডাজিম (২ গ্রাম/ কেজি বীজ) দিয়ে বীজ শোধন করতে হবে।
ঘ) রোগের লক্ষণ দেখা দিলে কপার অক্সিক্লোরাইড বা কার্বেন্ডাজিম ২ গ্রাম প্রতি লিটার জলে গুলে আক্রান্ত ও সুস্থ গাছের গোড়া ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে।

[আরও পড়ুন: ইন্টারনেটের যথাযথ ব্যবহারে কৃষিক্ষেত্রে উন্নতির সম্ভাবনা, আগামীর দিশা ই-এগ্রিকালচার]

পাতায় কালো দাগ বা ধসা রোগের কারণ ও লক্ষণ: অল্টারনেরিয়া ব্রেসিকি এবং অল্টারনেরিয়া ব্রেসিকোলা নামক ছত্রাকের আক্রমণের ফলে এই রোগের লক্ষণ দেখা যায়। সাধারণত পুরনো পাতা আক্রান্ত হয় তবে কান্ড এবং পত্রবৃত্তেও লক্ষণ দেখা যায়। প্রাথমিক লক্ষণ হিসাবে হলুদ বলয় বেষ্টিত পাতার উপরে ছোট ছোট গোলাকার বাদামি দাগ দেখা যায় যা পরে আকারে বড় ও কালো হয়ে জুড়ে যায়। ধীরে ধীরে আক্রান্ত পাতা সম্পূর্ণ রূপে বাদামী হয়ে শুকিয়ে যায়। ডাঁটা ও কাণ্ডে এই রোগ হলেও সেগুলি আকারে লম্বাটে হয়। সংক্রমণ তীব্র হলে সমস্ত পাতা ঝরে যেতে পারে।

প্রতিকার:
ক) আগাছা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
খ) সুপারিশ মাত্রায় নাইট্রোজেন প্রয়োগ করতে হবে ও সঠিক সময়ে চাপান দিতে হবে।
গ) ম্যানকোজেব বা ক্যাপটান বা থাইরাম (২ গ্রাম/ কেজি বীজ) দিয়ে বীজ শোধন করতে হবে।
ঘ) সংক্রমণ দেখা দিলে ম্যানকোজেব + কার্বেন্ডাজিম (২.৫ গ্রাম) বা প্রোপিকোনাজোল ২৫% (০.৭৫ মিলি) বা অ্যাজোক্সিস্ট্রোবিন + টেবুকোনাজোল (১ মিলি) প্রতি লিটার জলে গুলে ১৫ অন্তর দুবার স্প্রে করতে হবে।

সাদা মরচে রোগের কারণ ও লক্ষণ: অ্যালবুগো ক্যানডিডা নামক ছত্রাক এই রোগের জন্য দায়ী। পাতার নীচের দিকে ক্রিম রঙের উঁচু দাগ দেখা যায় এবং ওই দাগের বিপরীত দিকে পাতার উপরিভাগে হলদে ছোপ দেখা যায়। সরষে গাছের কাণ্ড ও পুষ্পমঞ্জরীতে ফোস্কার মত আকৃতি সৃষ্টি হয়। ফুলের স্বাভাবিক বিকাশ বিঘ্নিত হয় ও আকৃতি বিকৃত হয়। যার ফলে ফলন মারাত্মক রকম হ্রাস পায়। আক্রান্ত পুষ্পমঞ্জরী আকারে প্রায় ১০ গুণ বেড়ে যায়। ছোট অবস্থায় আক্রান্ত হলে গাছের বৃদ্ধি থমকে যায় ও ফলন হ্রাস পায়।

প্রতিকার:
ক) ফসলের অবশিষ্টাংশ ক্ষেত থেকে দূরে পুড়িয়ে কিংবা পুঁতে ফেলতে হবে।
খ) ৫২ ডিগ্রি তাপমাত্রার জলে ২০ মিনিট ধরে ভিজিয়ে রেখে বীজ শোধন করে নিতে হবে।
গ) ছত্রাকনাশক, যেমন ম্যানকোজেব বা ক্যাপটান বা থাইরাম কিংবা মেটাল্যাক্সিল ২ গ্রাম পরিমাণ প্রতি কেজি বীজে মিশিয়ে শোধন করে নিতে হবে।
ঘ) রোগের লক্ষণ দেখা দিলে মেটাল্যাক্সিল + ম্যানকোজেব (২.৫ গ্রাম) বা কপার অক্সিক্লোরাইড ৫০% (৪ গ্রাম) বা অ্যাজোক্সিস্ট্রোবিন (১ মিলি) বা অ্যাজোক্সিস্ট্রোবিন + টেবুকোনাজোল (১ মিলি) প্রতি লিটার জলে গুলে স্প্রে করতে হবে।

গোদা শিকড় রোগের কারণ ও লক্ষণ: পাহাড়ি এলাকায় অম্লমাটিতে প্লাজমোডিওফোরা ব্র্যাসিকি নামক প্রোটোজোয়ার আক্রমণের ফলে এই রোগ হয়। শাখা-প্রশাখা সহ সমগ্র শিকড় গোদার মতো মোটা হয়ে যায়। পাতা গুলি ফ্যাকাশে সবুজ থেকে হলুদ হয়ে ঢলে পড়ে। অল্প বয়সী গাছ সহজেই শুকিয়ে মরে যায়। কিন্তু বয়স্ক গাছ আক্রান্ত হলে মরে না। তবে বৃদ্ধি থেমে যায় এবং বাজার যোগ্য ফলন পাওয়া যায় না।

[আরও পড়ুন: শীতের মরশুমে চন্দ্রমল্লিকা চাষে প্রচুর লাভের সুযোগ, ফুলের রোগ দমনে কী পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের?]

প্রতিকার:
ক) রোগ মুক্ত চারা রোপণ করতে হবে।
খ) আক্রান্ত জমিতে ব্যবহৃত হয়েছে এমন যন্ত্রপাতি সুস্থ জমিতে ব্যবহার করার আগে তা জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে।
গ) বীজতলার মাটি শোধন করতে ফরমালিন ২%, ১০ লিটার প্রতি বর্গ মিটার হারে প্রয়োগ করতে হবে।
ঘ) অম্লমাটিতে যেহেতু এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি থাকে, মাটি সংশোধন করতে চারা বসানোর কমপক্ষে একমাস আগে একর প্রতি ১০ কুইন্টাল চুন বা ডলোমাইট মিশিয়ে সেচ দিতে হবে।
ঙ) বসানোর আগে চারার শিকড় কার্বেন্ডাজিম দ্রবণে (৮ গ্রাম/লিটার জলে) ১৫ মিনিট ভেজালে ভাল ফল পাওয়া যায়।
চ) জমিতে রোগের লক্ষণ দেখা দিলে কার্বেন্ডাজিম বা ক্লোরোথ্যালোনিল ২ গ্রাম প্রতি লিটার জলে গুলে আক্রান্ত ও সুস্থ গাছের গোড়া ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে।

অণুখাদ্যের অভাবজনিত সমস্যা:
১) মাথা ও কাণ্ড ফাঁপা তথা পচনবোরন অণুখাদ্যের অভাবে এই সমস্যা দেখা দেয়। বাঁধাকপির পাতা মোটা হয় ও মাথা ফাঁপা হয়। ফুলকপির ফুল বাদামি ও মরচে রঙের হয় ও পচন শুরু হয়। কপির কাণ্ড লম্বালম্বিভাবে চিড়লে ফাঁপা অংশ চোখে পড়ে। এই সমস্যা যাতে না দেখা দেয় সেজন্য জমি তৈরির সময় একর প্রতি ৪ কেজি বোরাক্স জৈবসারের সঙ্গে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। লক্ষণ দেখা দিলে বোরাক্স বা ২০% বোরন (২ গ্রাম ) অথবা অক্টাবোরেট ১ গ্রাম পরিমাণ প্রতি লিটার জলে গুলে পাতায় ১৫ দিন অন্তর দুবার স্প্রে করতে হবে।
২) কাস্তে পাতামলিবডেনাম অণুখাদ্যের অভাবে পত্রফলেকর স্বাভাবিক বৃদ্ধি না হয়ে কেবল মধ্যশিরার বৃদ্ধি হয়, ফলে পাতা কাস্তের আকার ধারণ করে। ফুল কপির ফুল ছোট ও পাতা যুক্ত হয়। জমি তৈরির সময় একর প্রতি ২০০ গ্রাম অ্যামোনিয়াম মলিবডেট জৈবসারের সঙ্গে মিশিয়ে প্রয়োগ করলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। লক্ষণ দেখা দিলে অ্যামোনিয়াম মলিবডেট ০.৫ গ্রাম পরিমাণ প্রতি লিটার জলে গুলে পাতায় স্প্রে করতে হবে।
৩) বাঁধাকপি ফেটে যাওয়ামাটিতে জলের কম বেশি হলে কপি ফেটে যায়। মাটি শুকিয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ জল পেলে কপি ফেটে যায়। ফলে ওই কপি আর বাজারজাত করা যায় না। এই সমস্যা আটকানোর জন্য জমিতে এমন ভাবে সেচ দিতে হবে যাতে মাটির রস সবসময় একই পরিমাণ বজায় থাকে। অনেক সময় বাজারে বিক্রি করার মুখে কপি ফাটা শুরু হয় ও বাজার দর কমে যায়। আবার একই দিনে কপি তুলে বিক্রি করা সম্ভব হয় না। এইসময় জমিতে থাকা কপি দুহাতে ধরে উপরের দিকে এমনভাবে টান দিতে হবে যাতে কপির শিকড় বের হয়ে না আসে অথচ মূল শিকড় ছিঁড়ে যায়। এই অবস্থায় মাঠে কপি কিছু দিন রাখা যাবে। ফাটবে না এবং সতেজও থাকবে।

Advertisement
Next