৯/১১-র দিন ইউএস ক্যাপিটলেও আছড়ে পড়ত বিমান! লাদেনের সঙ্গীদের রুখে দিয়েছিল আমজনতাই
Biswadip Dey
দেখতে দেখতে পঁচিশ বছর। সিকি শতক যেন পেরিয়ে গিয়েছে আলোর বেগে! নতুন সহস্রাব্দের শুরুতেই বিশ্বের মানুষ চমকে উঠে টিভির পর্দায় যে দৃশ্য দেখেছিল তা এতগুলো বছর পেরিয়েও সন্ত্রাসবাদের ভয়াল চেহারাটা এক নিমেষে তুলে ধরে স্মৃতিতে। আর খোদ মার্কিনভূমে তো এখনও রয়ে গিয়েছে সেই জোড়া হামলার দুঃস্মৃতি। কিন্তু সেদিন আরও এক হামলা হতে হতে হয়নি। ফ্লাইট ৯৩-র যাত্রীরা সেদিন অসমসাহসে রুখে দিয়েছিলেন ইউএস ক্যাপিটলের সম্ভাব্য হামলা। না হলে মৃত্যুমিছিল আরও অনেক দীর্ঘ হতে পারত। সন্ত্রাসের দাঁত-নখের সামনে নিজেদের জীবন বিপণ্ণ করে এহেন আত্মত্যাগ আজও ভোলেনি আমেরিকা। ভোলেনি বিশ্ব।
ঠিক কী হয়েছিল সেদিন? সকাল ৭টা ৪০ নাগাদ ওই বিমানে ওঠে আল কায়দার চার জঙ্গি। তাদের মধ্যে ছিল জিয়াদ জারা, যে একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিমান চালক। বাকি তিনজন আহমেদ আলনামি, আহমেদ আল-হাজনাওয়াই ও সইদ আল-ঘামদিও অস্ত্রহীন যুদ্ধে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। সকলেই গিয়ে বসে পড়েছিল প্রথম শ্রেণির আসনগুলিতে। তবে পরে ৯/১১ কমিশনের তরফে জানানো হয় আরও একজন, মহম্মদ আল-কাহতানিরও ওই বিমানে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু অর্ল্যান্ডো বিমানবন্দরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি আগস্টে। তাই তাকে বাদ দিয়েই বাকিরা বিমানে উঠে পড়ে। উদ্দেশ্য, 'সম্ভবত' ইউএস ক্যাপিটলে আক্রমণ। প্রায় ৪২ মিনিট বিলম্ব করে বিমান আকাশে ওড়ে ৮টা ১ মিনিটে।
আরও পড়ুন:
ফ্লাইট ৯৩-র যাত্রীরা সেদিন অসমসাহসে রুখে দিয়েছিলেন ইউএস ক্যাপিটলের সম্ভাব্য হামলা। না হলে মৃত্যুমিছিল আরও অনেক দীর্ঘ হতে পারত। সন্ত্রাসের দাঁত-নখের সামনে নিজেদের জীবন বিপণ্ণ করে এহেন আত্মত্যাগ আজও ভোলেনি আমেরিকা। ভোলেনি বিশ্ব।
আর বিমান আকাশে উড়তে না উড়তেই অপহরণকারীরা ককপিটে ঢুকে পড়ে। সকাল ৯টা ২৮। মাটি থেকে ৩৫ হাজার ফুট উঁচুতে উড়ছে বোয়িং ৭৫৭। হঠাৎই তা একধাক্কায় ৭ হাজার ফুট নিচে নেমে আসে। ককপিট রেকর্ডারে শোনা গিয়েছিল পাইলটদের চিৎকার, ''মে-ডে!'', ''এখান থেকে বেরিয়ে যাও বলছি...''
এদিকে ততক্ষণে গড়পড়তা আলসে রবিবারের সকালটা হয়ে উঠেছে আতঙ্কঘন। টিভির পর্দায় ফুটে উঠেছে সেই দৃশ্য। ওয়ার্ল্ড ট্রেন্ড সেন্টারে আছড়ে পড়েছে বিমান! দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত ডিনা নাম্নী এক মহিলা ফোন করলেন তাঁর স্বামী টম বার্নেটকে। কেননা তাঁর স্বামীরও সেই সময় আকাশপথেই থাকার কথা! বারবার ফোন করলেও টম ফোন ধরছিলেন না। ফলে চড়ছিল আতঙ্কের পারদ। ৯টা ৩০ মিনিট নাগাদ বেজে উঠল ডিনার ফোন। ডিসপ্লে-তে টমের নাম! তিনি দ্রুত ফোন ধরে জানতে চাইলেন, ''তুমি ঠিক আছে?'' জবাব পেলেন, ''না, ঠিক নেই। আমি যে বিমানে আছি তা অপহরণ করা হয়েছে। এইমাত্র এক যাত্রীকে ছুরিও মারা হয়েছে!''
সকাল ৯টা ২৮। মাটি থেকে ৩৫ হাজার ফুট উঁচুতে উড়ছে বোয়িং ৭৫৭। হঠাৎই তা একধাক্কায় ৭ হাজার ফুট নিচে নেমে আসে। ককপিট রেকর্ডারে শোনা গিয়েছিল পাইলটদের চিৎকার, ''মে-ডে!''
এর ঠিক পরই ইন্টারকমে ভেসে এল ককপিটের ঘোষণা, ''লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলম্যান, ক্যাপ্টেন বলছি। আপনারা দয়া করে আসনে বসুন। এখানে একটা বোমা আছে। সুতরাং বসে থাকুন।'' ধীরে ধীরে আতঙ্কের পারা চড়তে থাকে। ততক্ষণে পরিষ্কার হয়ে যায় জঙ্গিদের উদ্দেশ্য। স্ত্রী ডিনাকে টম বলে ওঠেন, ''এরা বিমানটা ক্র্যাশ করানোর কথা বলছে। হে ভগবান, এটা একটা আত্মঘাতী হামলা!''
আর এখান থেকেই বিষয়টা হয়ে ওঠে অন্যরকম। বিমানের যাত্রীরা সকলেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন জঙ্গিগুলোর উদ্দেশ্য সফল হতে দেওয়া যাবে না। তাঁরা এও বুঝে গিয়েছেন, তাঁদের জীবন আর কিছুক্ষণের! নিশ্চিত মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়েও সেই 'কমন ম্যান' তথা আম নাগরিকরা কিন্তু পিছু হটতে চাননি। বরং ওই পরিস্থিতিতেও মাথা ঠান্ডা রেখে ভাবতে থাকেন কী করে রুখে দেবেন ইউএস ক্যাপিটলের উপরে হামলা! ভাবলে অবাক লাগে। বিভিন্ন পেশা, বয়স ও পটভূমি থেকে আসা মানুষগুলি কোথা থেকে পেলেন এই দৃঢ়তা? তাঁদের মধ্যে কারও কারও হয়তো সামরিক অভিজ্ঞতা ছিল। কেউ কেউ জরুরি সেবা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছিলেন ক্রীড়াবিদ, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থীরাও। সাধারণ সেই মানুষরাই সেদিনে হয়ে উঠলেন 'যোদ্ধা'।
৯টা ৫৭ মিনিটে শুরু হল লড়াই। একদিকে সশস্ত্র জঙ্গিরা। অন্যদিকে নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ। ককপিটের সেই সংগ্রামের চিহ্ন রয়ে গিয়েছে ভয়েস রেকর্ডারে। চিৎকার, জিনিসপত্র পড়ে যাওয়ার শব্দ... যাত্রীরা চাইছিলেন ককপিটে ঢুকে পড়তে! যে কোনও মুহূর্তই হতে পারে জীবনের শেষ মুহূর্ত, তা মাথা রেখেও এমন অসমসাহসী লড়াইকে কুর্নিশ না করে উপায় নেই। অবশেষে পেনসিলভেনিয়ার শ্যাঙ্কসভিলের কাছে একটি মাঠে বিমানটি আছড়ে পড়ে। বিমানে থাকা সব যাত্রীই নিহত হন। কিন্তু সেই সঙ্গেই খতম হয় জঙ্গিরাও। ভেস্তে যায় আরও একটি হামলার পরিকল্পনা।
৯/১১ মানে তাই কেবল টুইন টাওয়ার বা পেন্টাগনের হামলা নয়। তা এই লড়াইয়ের কথাও বলে। বিমানের এক যাত্রী টড বিমারের বাবা ডেভিড বিমার ওই যাত্রীদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, “ঘটনাটি কেবল এই কারণেই ঘটেনি যে, সাধারণ মানুষ সেদিন সৈনিক হয়ে উঠেছিল... বরং আশীর্বাদ হল এই যে, তাঁদের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ ছিল এবং তাঁরা তা করেছিলেন। এটাই প্রমাণ করে দেয় বীরত্ব কোনও বিরল গুণ নয়। বরং তা আমাদের সকলের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।” এখানে মনে পড়ে যেতেই পারে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের 'দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি' উপন্যাসের সেই অমর পঙক্তি- 'ম্যান ইজ নট মেড ফর ডিফিট। আ ম্যান ক্যান বি ডেসট্রয়েড বাট নট ডিফিটেড।'