শুনলে মনে হবে, এ যেন কোনও রোমাঞ্চকর উপন্যাসের গল্প। ১৯৩০ সালের ৩০ জুলাই। শীতের এক বিকেল। উরুগুয়ের রাজধানী মন্তেভিডিওয় উৎসবের প্রস্তুতি। ‘এস্তাদিও সেন্তেনারিও’ স্টেডিয়ামের দিকে ঢল নেমেছে হাজার হাজার মানুষের। কারণ, সেদিনই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ফুটবল ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ (FIFA World Cup) ফাইনাল। উরুগুয়ে বনাম আর্জেন্টিনা। কিন্তু মাঠের বাইরে পরিস্থিতি ছিল একেবারেই অন্যরকম। দুই দেশের সমর্থকদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, অনেকেই নাকি স্টেডিয়ামে এসেছিলেন অস্ত্র নিয়ে। নিরাপত্তা বাহিনীর তল্লাশিতে দর্শকদের কাছ থেকে একের পর এক রিভলভার উদ্ধার হতে থাকে। সংখ্যাটা শেষ পর্যন্ত হাজার ছাড়িয়ে যায়। খেলা শুরুর আগেই যেন শহরের জলহওয়ায় যুদ্ধের আবহ! একপলকের জন্য কি মনে হচ্ছে, এটি বিশ্বকাপের ফাইনাল নাকি বন্দুকবাজদের কোনও গোপন সমাবেশ! তবু সব আশঙ্কা পিছনে ফেলে খেলা শুরু হয়, আর সেই নাটকীয় দিনের সাক্ষী হয়ে ফুটবল ইতিহাসে অমর হয়ে থাকে প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনাল।
মন্তেভিডিওর ঐতিহাসিক স্টেডিয়াম। ছবি সংগৃহীত।
সকালের কুয়াশা তখনও পুরোপুরি সরেনি। ফাইনাল দেখার টানে আর্জেন্টিনার হাজার হাজার সমর্থক রিভার প্লেট নদী পেরিয়ে নৌকায় করে মন্তেভিডিওর দিকে রওনা হন। কিন্তু ঘন কুয়াশার কারণে অনেকেই মাঝপথে আটকে পড়েন। তবু ফাইনালের উন্মাদনায় ভাটা পড়েনি একটুও। হাজার হাজার দর্শক স্টেডিয়ামমুখী। তবে আয়োজকদের মাথাব্যথা ছিল অন্য জায়গায়। উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল, বন্দর ও স্টেডিয়ামের প্রবেশপথে প্রত্যেক দর্শকের উপর চালানো হয় কঠোর তল্লাশি।
কিন্তু এত কড়া তল্লাশির কারণ কী ছিল? বিশ্বকাপ চলাকালীন উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যমে একের পর এক উসকানিমূলক খবর প্রকাশিত হচ্ছিল। খেলোয়াড়দের হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। আর গুজব ছড়িয়েছিল, অনেকেই নাকি পিস্তল ও অন্যান্য অস্ত্র নিয়ে স্টেডিয়ামে ঢুকবেন। এমনিতেই সে সময় উরুগুয়েতে সমাজবিরোধীদের দাপট ছিল যথেষ্ট, ফলে উদ্বেগ বেড়েছিল আরও। তাই ফাইনালের দিন শুরু হয় কঠোর তল্লাশি। তখনই সামনে আসে অবিশ্বাস্য দৃশ্য। একের পর এক দর্শকের কাছ থেকে উদ্ধার হতে থাকে রিভলভার। শেষে হিসাব করে দেখা যায়, প্রায় ১,৬০০টি অস্ত্র বাজেয়াপ্ত! পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত, ম্যাচের বেলজিয়ান রেফারি জন ল্যাঙ্গেনাস নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন। এতটাই ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন, কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি একটি ‘গেটওয়ে বোট’ বা পালানোর নৌকার ব্যবস্থাও দাবি করেছিলেন। কেবল তাই নয়, ম্যাচটি যাতে শান্তিতে সম্পন্ন হয়, সেজন্য মাঠের চারপাশে বেয়নেট লাগানো রাইফেলধারী সশস্ত্র রক্ষীদেরও মোতায়েন করা হয়। এমনকী দুই গোলপোস্টের পিছনেও নিরাপত্তারক্ষীরা দাঁড়িয়ে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত উরুগুয়ে ৪-২ গোলে জিতে প্রথম বিশ্বকাপের শিরোপা ঘরে তোলে। কিন্তু ম্যাচ শেষ হলেও উত্তেজনার শেষ হয়নি; আর্জেন্টিনায় উরুগুয়ের দূতাবাসে হামলা-সহ দুই দেশের মধ্যে তীব্র কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল।
প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের পর উরুগুয়ে দল। ছবি সংগৃহীত।
প্রথম বিশ্বকাপে গল্পের ডালি অনেক। অলিম্পিকে টানা দু’বার সোনা জয়ের কৃতিত্ব এবং স্বাধীনতার শতবর্ষ উদ্যাপনের আবহে আয়োজক হওয়ার অধিকার পেয়েছিল উরুগুয়ে। ফিফা ১৬টি দেশকে আমন্ত্রণ জানালেও শেষ পর্যন্ত অংশ নেয় মাত্র ১৩টি দল। দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সমুদ্রযাত্রার কারণে ইউরোপের অনেক দেশই যেতে রাজি হয়নি। তখন ফিফা সভাপতি জুলে রিমেকে ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নিতে হয়েছিল। তিনি ফ্রান্স, বেলজিয়াম, রোমানিয়া ও যুগোস্লাভিয়াকে রাজি করান। সেই তিনিই বিশ্বকাপের ট্রফি নিজের স্যুটকেসে করে জাহাজে চেপে উরুগুয়ের পথে রওনা দেন। ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও রোমানিয়ার ফুটবলাররা বিখ্যাত ‘কন্তে ভের্দে’ জাহাজে যাত্রা করেন। পথে সেই জাহাজেই ওঠে ব্রাজিল দল। প্রায় দুই সপ্তাহ সমুদ্র পাড়ি দিয়ে তারা পৌঁছায় মন্তেভিডিওতে। কিন্তু নাটক তখনও বাকি। ফাইনালে কোন বল দিয়ে খেলা হবে, তা নিয়েও দুই দলের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয়েছিল। আর ম্যাচ ঘিরে উত্তেজনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, স্টেডিয়ামে তল্লাশি চালিয়ে হাজারো আগ্নেয়াস্ত্র বাজেয়াপ্ত হয়। শুনতে গল্পের মতো লাগলেও এটাই সত্যি।
